Ajker Patrika

সৌদিতে ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রের ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের ‘উড়ন্ত মস্তিষ্ক’, এর কাজ কী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
সৌদিতে ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রের ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের ‘উড়ন্ত মস্তিষ্ক’, এর কাজ কী
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ই–৩ সেন্ট্রি বিমান। ছবি: সংগৃহীত

ইরান গত ২৭ মার্চ সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম বা এডব্লিউএসিএসস বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিনকে এ তথ্য জানিয়েছে।

এই হামলায় ১০ জনের বেশি সেনাসদস্য আহত হয়েছেন, যার মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য বিমানের মধ্যে রয়েছে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার। এই ঘটনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড।

এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন একটি স্যাটেলাইট ইমেজ পর্যালোচনা করে দেখেছে, প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসে একটি ই-৩ বিমানের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি দেখা যাচ্ছে। রানওয়ের সাইনেজ ও বিমানের চিহ্ন দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এটি সৌদি ঘাঁটিতে অবস্থানরত ই-৩ বিমানগুলোর একটি। যদি বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তাহলে এই পুরোনো বিমানের ক্ষতির পরিমাণ এতটাই বেশি যে এটি আর মেরামতযোগ্য নাও হতে পারে।

ওপেন-সোর্স ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, ঘটনার আগে ওই ঘাঁটিতে ছয়টি ই-৩ বিমান মোতায়েন ছিল। এর আগে এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন জানিয়েছিল, ২৭ মার্চের ইরানি হামলায় একটি ইউএস এয়ার ফোর্স ই-৩ এবং কয়েকটি স্ট্র্যাটোট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এডব্লিউএসিএস বড় বড় সংঘাতে যুদ্ধক্ষেত্র পরিচালনায় এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী এডব্লিউএসিএস ব্যবহার করছে কমান্ড ও কন্ট্রোল, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও রিকনাইস্যান্সের কাজে। অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম, কসোভো যুদ্ধ, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ এবং ইসলামিক স্টেটবিরোধী অভিযান অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভে এগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

২০২৬ সালের এই সময়ে ডলারের মান অনুযায়ী প্রতিটি ই–৩ বিমানের মূল্য ৫৩৭ থেকে ৫৯৬ মিলিয়ন ডলার। পুরো মার্কিন বিমানবাহিনীর ইনভেন্টরিতে মাত্র ১৬টি এমন বিমান অবশিষ্ট আছে। ইরানে চলমান যুদ্ধের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে ৬টি ই–৩ এডব্লুএসিএস বিমান মোতায়েন করা হয়েছিল—যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট বহরের প্রায় ৪০ শতাংশ। এর ফলে আলাস্কা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

ই–৩ এডব্লুএসিএস হলো মার্কিন বিমান অভিযানের ‘উড়ন্ত মস্তিষ্ক।’ এর ঘূর্ণমান রাডার ডোম ভূপৃষ্ঠ থেকে স্ট্রাটোস্ফিয়ার পর্যন্ত ২৫০ মাইল এলাকা জুড়ে হুমকি শনাক্ত করতে পারে। এটি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিটি ফাইটার, ট্যাংকার, বোম্বার এবং গোয়েন্দা বিমানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। এই যুদ্ধে, এডব্লুএসিএস ইরানের শাহেদ ড্রোন ট্র্যাক করছে, এফ–৩৫ স্ট্রাইক প্যাকেজ পরিচালনা করছে এবং ইন্টারসেপ্টর নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার দেখভাল করছে।

তবে ই-৩ এখন পুরোনো হয়ে পড়ছে এবং এর সক্ষমতা বড় প্রতিপক্ষদের তুলনায় পিছিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে কম সক্ষম বিমানের অবসরের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ই-৩ বহর এখন ১৬ টিতে নেমে এসেছে। ২০২৪ অর্থবছরে এই বিমানের মিশন-সক্ষমতার হার ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ, অর্থাৎ যেকোনো সময়ে অর্ধেকের কিছু বেশি বিমান উড্ডয়ন ও মিশন পরিচালনায় সক্ষম ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতিমধ্যে সীমিত হয়ে আসা এডব্লিউএসিএস বহর থেকে একটি বিমান হারানো—বিশেষ করে চলমান অভিযানে সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত একটি—যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধক্ষেত্র পরিচালনার সক্ষমতায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর সাবেক এফ-১৬ পাইলট এবং মিচেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যারোস্পেস স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক হিদার পেনি বলেন, ‘এই ই-৩ হারানো অত্যন্ত সমস্যাজনক। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশসীমা সমন্বয়, বিমানের গতিপথ নির্ধারণ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং পুরো বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় মারাত্মক কার্যক্রমে এই ব্যাটল ম্যানেজারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, এই ই-৩ হারানোর ফলে বিমানবাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে সচেতনতা ও ব্যবস্থাপনায় ফাঁক তৈরি হতে পারে, যা ইরানি বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে সুযোগ হারানোর কারণ হতে পারে। স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও প্রতিরক্ষা নীতি বিশেষজ্ঞ কেলি গ্রিয়াকো বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদে এটি যুদ্ধের জন্য একটি বড় ক্ষতি। এর প্রভাব পড়বে। কভারেজে ফাঁক তৈরি হবে।’

হিদার পেনি আরও বলেন, যুদ্ধবিমান চালকরা বিশেষভাবে এডব্লিউএসিএস-এর সরবরাহ করা যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্রের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর ভাষায়, ‘ই-৩ এবং ব্যাটল ম্যানেজারদের মূল্য হলো তারা পুরো চিত্রটি দেখতে পারে। তারা যেন দাবার মাস্টার, আর যুদ্ধবিমান চালকেরা যেন বিশপ।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই এডব্লিউএসিএস হারানোর ফলে বাকি অল্পসংখ্যক ই-৩ বিমানের ওপর চাপ আরও বাড়বে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্র ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে। সংঘাত শেষে যুক্তরাষ্ট্র একটি আরও সীমিত ও চাপে থাকা ই-৩ বহরের মুখোমুখি হবে। পেন্টাগনের নেতৃত্ব ই-৩-এর সম্ভাব্য বিকল্প ই-৭ ওয়েজটেইল কেনার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। তারা এর বদলে মহাকাশভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করার পক্ষে মত দিয়েছে।

হিদার পেনি বলেন, ‘আমরা ব্যাটল ম্যানেজমেন্ট ক্ষেত্রটিতে খুব বেশি ঝুঁকি নিয়েছি—মানবসম্পদ এবং বিমান, উভয় ক্ষেত্রেই। মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা অসাধারণ হবে, কিন্তু তা এখনো বাস্তবে নেই। সংঘাতের সময় আমরা নিজেরা সময় নির্ধারণ করতে পারি না, তাই ভবিষ্যতের অনিশ্চিত সক্ষমতার জন্য অপেক্ষা করা যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ই-৩-এর পরিবর্তে ই-৭ অত্যন্ত জরুরি। এই ই-৩ হারানোর ফলে যে চাপ তৈরি হবে—ক্যারিয়ার ক্ষেত্র, সক্ষমতা, ব্যাটল ম্যানেজার এবং পুরো বাহিনীর কার্যকারিতায়—তা স্পষ্ট করে যে ই-৭ কেনা ও সরবরাহ দ্রুততর করা জরুরি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

যুক্তরাষ্ট্রে ‘ভয়ংকর অপরাধে’ গ্রেপ্তার ১০ বাংলাদেশির ছবিসহ পরিচয় প্রকাশ

প্রকাশ্যে আইসক্রিম বিক্রেতার শিরশ্ছেদ, মুণ্ডু বাড়িতে নিয়ে গেলেন খুনি

বিসিএসে নিয়োগের সব ধাপ হবে সফটওয়্যারে

জোড়া লাল কার্ডের ম্যাচে ভারতকে রুখে দিল বাংলাদেশ

বেরোবিতে ছাত্রীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় ঢাবি ছাত্র, থানায় নিয়ে মুচলেকা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত