Ajker Patrika

খাবার কিনতে ঋণ করতে হচ্ছে আর্জেন্টাইনদের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
খাবার কিনতে ঋণ করতে হচ্ছে আর্জেন্টাইনদের
আর্জেন্টিনার প্রায় অর্ধেক মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙছেন। ছবি: উইকিমিডিয়া

আর্জেন্টিনার বৃহত্তর বুয়েনস আইরেসের ফ্লোরেন্সিও ভারেলার বাসিন্দা ৪৩ বছর বয়সী দিয়েগো নাকাসিও। একটি হার্ডওয়্যারের দোকানের সেলসম্যান তিনি। নাকাসিও বলছিলেন, ‘মাসের কত তারিখ, তা বোঝার জন্য এখন আর ক্যালেন্ডারের দরকার হয় না। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করি, তাও মাসের ১৫ তারিখ হওয়ার আগেই বেতন শেষ হয়ে যায়।’

এরপর শুরু হয় টিকে থাকার লড়াই। পরের মাসের বেতন না আসা পর্যন্ত খুঁজতে হয় বাড়তি আয়ের পথ, এমনকি বিক্রি করতে হয় ঘরের জিনিসপত্রও। নাকাসিও জানান, খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মাসকাবারি খরচ চালাতে গিয়ে ঋণ নিতে হয়, এমনকি ক্রেডিট কার্ডও ব্যবহার করতে হয়।

আল জাজিরাকে নাকাসিও বলেন, ‘আগে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি আমি। গত ২৫ বছর কঠোর পরিশ্রম করেছি আমরা। চাকরির আয় দিয়ে একটি বাড়ি তৈরি করেছি, একটি গাড়ি কিনেছি। ১৭ বছর বয়সী ছেলেকে একটি সুন্দর জীবন দিতে পেরেছি। কিন্তু এখন আগের চেয়ে ভালো চাকরি থাকা সত্ত্বেও পুরো মাসের খাবারের খরচও মেটাতে পারছি না।’

নাকাসিও আরও বলেন, ‘ঋণ করে বেঁচে থাকা খুব বিপজ্জনক একটা চক্রে ফেলে দেয়। একবার পেমেন্টে পিছিয়ে পড়লে যেন নিজের লেজের পেছনে ছোটার মতো অবস্থা হয়। আমার পরিচিতদের অনেকেই এখন তীব্র মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এ চক্র থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই, মনে হচ্ছে।’

নাকাসিওর এই অবস্থাই এখন আর্জেন্টিনার অতি সাধারণ চিত্র। সর্বশেষ সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে আর্জেন্টিনা গ্রান্দে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় অর্ধেক মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙছেন, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বিক্রি করছেন অথবা ব্যাংক ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছেন। আরেকটি গবেষণা সংস্থা, ফুন্দাসিওন পেনসার-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ আর্জেন্টাইন সংসার চালাতে বিভিন্ন কার্যক্রম বা সেবা কমিয়ে দিয়েছেন।

প্রতিবেদনের সহলেখক আর্জেন্টিনা গ্রান্দে ইনস্টিটিউটের সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক ভায়োলেটা ক্যারেরা পেরেইরা বলেন, ‘পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মানুষ এখন বাড়ি বা গাড়ি কেনার জন্য নয়, বরং খাবার কেনার জন্য ঋণ নিচ্ছে।’

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ক্ষমতা গ্রহণের পর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এক কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করেন। সরকারি ব্যয়ে ব্যাপক কাটছাঁট করে রাজস্ব ভারসাম্য রক্ষা এবং মার্কিন ডলারের রিজার্ভ বাড়ানোই ছিল তাঁর লক্ষ্য। মিলেইর দাবি, তাঁর এই পরিকল্পনায় অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং লাখ-লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাঁর এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে। আর্জেন্টিনার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় থাকা সত্ত্বেও সংস্থাটি ২০২৬ ও ২০২৭ সালে চার শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য তুলে ধরছে এক ভিন্ন ও ধূসর চিত্র।

সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেলেও প্রবৃদ্ধি সমানভাবে হয়নি। ২০২৫ সালের নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং ও কৃষি খাতে উন্নতি হলেও উৎপাদন ও বাণিজ্য খাতে ধস নেমেছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে বহু কারখানা ও দোকান। স্বাধীন খুচরা খাদ্য বিক্রেতাদের হিসাব অনুযায়ী, খাদ্যদ্রব্য ভোগের পরিমাণ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

এছাড়া রয়েছে মুদ্রাস্ফীতি—যা নিয়ন্ত্রণে রাখা আর্জেন্টিনার জন্য অত্যাবশ্যক, কারণ বিদেশি ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

মিলেই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে রয়েছে, বেতন স্থবির রাখা এবং সস্তা আমদানির জন্য বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে এবং হাজার হাজার কারখানা ও ছোট ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে।

সমালোচকদের মতে, মুদ্রাস্ফীতির সরকারি হিসাব বাস্তব মূল্যবৃদ্ধির প্রতিফলন নয়। আর্জেন্টিনায় মুদ্রাস্ফীতি পরিমাপের যে পণ্যঝুড়ি ব্যবহৃত হয়, তা ২০০৪ সালে তৈরি এবং বর্তমান ভোগব্যয়ের ধরণ প্রতিফলিত করে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মূল্যবৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে অনেক বেশি এবং বাস্তব খরচের বড় অংশ হলেও তা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

ক্যারেরা পেরেইরা বলেন, ‘এই দ্রুত পরিবর্তন সমাজে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে সম্পত্তি বা বিলাসবহুল যানবাহনের বিক্রি বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পাতে খাবার ও ওষুধের পরিমাণ কমছে। ফলে কেউ আগের চেয়ে বেশি কিনতে পারছেন, আবার কেউ খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছেন।’

সাধারণ আর্জেন্টাইনদের কাছে মাস চালানো এখন একটি অলিম্পিক গেমসের বাধা ডিঙানোর মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাধিক কঠিন কাজ সামলানো, পুরোনো পোশাকসহ ব্যবহৃত জিনিস বিক্রি, আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার, উচ্চসুদের অনানুষ্ঠানিক ঋণ এবং সস্তা পণ্য খোঁজা—সবই দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

শিক্ষক এবং ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী ৪৩ বছর বয়সী ভেরোনিকা মালফিতানো জানান, সরকারি ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্তে তাঁর বেতন এক-চতুর্থাংশ কমে গেছে। তিনি বলেন, ‘এখন খাবার কেনাটাও একটা বড় কাজ হয়ে গেছে। আমরা আত্মীয়রা বা সহকর্মীরা মিলে পাইকারি দরে খাবার কিনি। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করি বা ছোট ঋণ নিই। এই মাসে প্রথমবারের মতো শুধু ন্যূনতম কিস্তি পরিশোধ করেছি, আগে কখনো এমন করিনি। খুব চাপের মধ্যে আছি। যাদের চিনি, সবাই একই অবস্থায় আছে।’

মালফিতানো যে সত্যি বলছে, তা সরকারি তথ্যও প্রমাণ করছে। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আর্জেন্টিনার সুপারমার্কেটগুলোতে প্রায় অর্ধেক কেনাকাটা এখন ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে হচ্ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে ঋণ গ্রহণ ও খেলাপি হওয়ার হার। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এখন প্রায় ১১ শতাংশ ব্যক্তিগত ঋণ অনাদায়ী অবস্থায় আছে, ২০১০ সালে তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ হার।

৪৯ বছর বয়সী গৃহিণী গ্রিসেলদা কুইপিলদোর বলেন, স্বামী, দুই মেয়ে ও দুই নাতি-নাতনিকে নিয়ে সংসার চালান তিনি। পরিবারের একাধিক সদস্য কাজ করলেও মাসের ১৮ তারিখের মধ্যেই টাকা ফুরিয়ে যায় এবং ঋণ নিতে শুরু করতে হয়।

তিনি বলেন, ‘মাসের শুরুতে আমরা ঋণ আর বিল মেটাই। তারপর টাকা শেষ হয়ে গেলে আবার ধার করা শুরু করি। এটি একটি অন্তহীন দুষ্টচক্র। এখান থেকে বের হওয়া খুব কঠিন। পরিচিত ও অপরিচিত, সবার কাছ থেকেই ধার নিতে হচ্ছে। আগে এমন ছিল না।’

মোভিদা সিউদাদের সদস্য ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক লুসিয়া ক্যাভালেরো বলেন, আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘদিনের হলেও এর প্রভাব এখন ঘরে ঘরে তীব্র হয়ে উঠেছে। অনিবন্ধিত মহাজনদের দৌরাত্ম্য পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।

তিনি আরও বলেন, ‘ঋণ দীর্ঘদিন ধরেই গুরুতর সমস্যা ছিল, এখন তা সংকটে রূপ নিয়েছে। অনেকের সামনে আর কোনো বিকল্পও নেই।’

এ পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক দল নিম্নআয়ের মানুষের ঋণ একত্রিত করে কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবসহ একটি বিল উত্থাপন করেছে। তবে ক্যাভালেরো মনে করেন, এটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী সমাধান নয়।

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক মহল যে মানুষের ঋণ সমস্যাকে স্বীকার করছে, এটি ভালো বিষয়। তবে এ প্রস্তাবও ঋণ নিয়ে ঋণ শোধের যুক্তিই অনুসরণ করছে। সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু গভীর কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। যেমন ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করা হয়, তেমনি পরিবারগুলোকেও সহায়তা দিতে হবে। টেকসই সমাধান হলো, ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়ানো, যাতে খাবার কিনতেই মানুষকে ঋণ করতে না হয়।’

এত প্রতিকূলতার মধ্যেও নাকাসিও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন কারণ তাঁর অন্তত মাথা গোঁজার নিজস্ব ঠাঁই আছে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমাদের অন্তত নিজস্ব বাড়ি আছে। ভাড়া দিতে হলে কী করতাম জানি না। এভাবে আর চলতে পারে না। আমি শুধু চাই পরিস্থিতির পরিবর্তন হোক।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

কলকাতায় গায়কসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৬ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার

নিজের হাতে এক মন্ত্রণালয় ও দুই বিভাগ রাখলেন তারেক রহমান

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ফিরল অলিখিত রেওয়াজ

ইরানে মোসাদের তৎপরতা যেভাবে ঠেকাচ্ছে চীন

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টনের প্রজ্ঞাপন জারি, কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত