Ajker Patrika

লিবিয়ায় ‘গুপ্তহত্যার’ শিকার মুয়াম্মার গাদ্দাফির পুত্র সাইফ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০: ৩০
লিবিয়ায় ‘গুপ্তহত্যার’ শিকার মুয়াম্মার গাদ্দাফির পুত্র সাইফ
সাইফ আল–ইসলাম গাদ্দাফি। ছবি: এএফপি

লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির সবচেয়ে আলোচিত ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জিনতানে নিহত হয়েছেন। নিহত হওয়ার সময় সাইফ আল-ইসলামের বয়স ছিল ৫৩ বছর। তিনি গাদ্দাফির দ্বিতীয় ছেলে। ২০১১ সাল থেকে তিনি জিনতানেই অবস্থান করছিলেন—প্রথমে কারাগারে, ২০১৭ সালের পর মুক্ত অবস্থায়। এ সময় তিনি রাজনীতিতে ফেরার পরিকল্পনা করছিলেন।

সাইফ আল-গাদ্দাফির রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওসমান এবং আইনজীবী খালেদ এল-জাইদি গতকাল মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তাঁর রাজনৈতিক দলের এক বিবৃতিতে বলা হয়, চার মুখোশধারী ব্যক্তি জিনতানে সাইফের বাড়িতে ঢুকে তাঁকে হত্যা করে। তারা এটিকে ‘গুপ্তহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

২০১১ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে বহু মানুষের কাছে সাইফ আল-ইসলাম ছিলেন তাঁর বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি এবং লিবিয়ার দ্বিতীয় সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি। আরব বসন্তের বিক্ষোভের পর লিবিয়ায় যে সহিংসতা শুরু হয় এবং দেশটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, সেই সময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বাবার শাসনের বিরোধীদের ওপর নির্যাতন ও চরম সহিংসতার বহু অভিযোগ ছিল। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তাঁর বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

২০১১ সালের মার্চে জাতিসংঘ গাদ্দাফির বাহিনীর হাত থেকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় ‘সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেওয়ার অনুমোদন দিলে ন্যাটো লিবিয়ায় বোমাবর্ষণ শুরু করে। ২০১১ সালের জুনে সাইফ আল-ইসলাম ঘোষণা দেন, তাঁর বাবা নির্বাচন দিতে রাজি এবং নির্বাচনে না জিতলে ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন। তবে ন্যাটো এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং লিবিয়ায় বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখে।

ওই বছর জুনের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) সাইফ আল-ইসলামের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। অবশেষে ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর সিরতে শহরে তাঁর বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফি এবং ভাই মুতাসসিম নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলায়।

২০১৪ সালে জিনতানে বন্দী থাকা অবস্থায় ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ত্রিপোলির আদালতে বিচার কার্যক্রমে হাজির হন সাইফ আল-ইসলাম। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে ত্রিপোলির আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে ২০১৭ সালে জিনতান নিয়ন্ত্রণকারী মিলিশিয়া বাহিনী আবু বকর আস-সিদ্দিক ব্যাটালিয়ন তাঁকে মুক্তি দেয়। এটি লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় কর্তৃপক্ষ ঘোষিত এক সাধারণ ক্ষমার অংশ ছিল, যাদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

এরপর বহু বছর তিনি প্রকাশ্যে আর আসেননি এবং আইসিসির কাছে তখনো তিনি পলাতক। ২০২১ সালের জুলাইয়ে তিনি নিউইয়র্ক টাইমসকে একটি বিরল সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি লিবিয়ার কর্তৃপক্ষকে অভিযুক্ত করে বলেন, তারা ‘নির্বাচনকে ভয় পায়।’ নিজের দীর্ঘদিন আড়ালে থাকার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, তিনি ‘১০ বছর ধরে লিবিয়ার জনগণ থেকে দূরে ছিলেন। তিনি আরও বলেন, ‘আপনাকে ধীরে ধীরে ফিরে আসতে হবে। একদম ধীরে। স্ট্রিপটিজের মতো।’

২০২১ সালের নভেম্বর মাসে বহু বছরের মধ্যে প্রথমবার তিনি প্রকাশ্যে আসেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সাবহায় তিনি লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে আবেদন জমা দেন। এর মাধ্যমে তিনি তাঁর বাবার সমর্থকদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন।

শুরুতে তাঁকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করা হলেও পরে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। তবে লিবিয়ার অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হয়নি। সে সময় দেশটিতে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসন ক্ষমতার জন্য লড়াই করছিল।

পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ও সাবলীল বক্তা সাইফ আল-ইসলাম দমনমূলক লিবীয় সরকারের একটি প্রগতিশীল মুখ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতেন। তিনি ২০০৮ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে পিএইচডি করেন। তাঁর গবেষণাপত্রে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারে সিভিল সোসাইটির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। ২০০০ সাল থেকে ২০১১ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগপর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে লিবিয়ার সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।

পরে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস সমালোচিত হয় লিবীয় সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কারণে। বিশেষ করে সাইফ আল-ইসলামকে শিক্ষার্থী হিসেবে গ্রহণ এবং তাঁর ডক্টরেট অনুষ্ঠানের দিন গাদ্দাফি ইন্টারন্যাশনাল চ্যারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন থেকে ২৪ লাখ ডলারের অনুদান চুক্তি গ্রহণের জন্য প্রতিষ্ঠানটি নিন্দার মুখে পড়ে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন প্রভাবশালী আলোচক হিসেবে সাইফ আল-ইসলামের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে লিবিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি লকারবি বিমান হামলা, বার্লিনের নাইটক্লাব হামলা এবং সাহারা মরুভূমির ওপর বিস্ফোরিত ইউটিএ ফ্লাইট ৭৭২-এর ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এ ছাড়া তিনি ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে লিবিয়ায় শিশুদের এইচআইভি সংক্রমণের অভিযোগে অভিযুক্ত ছয় চিকিৎসকের মুক্তি নিশ্চিত করেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন ছিলেন বুলগেরিয়ান। ১৯৯৯ সালে তাঁরা গ্রেপ্তার হন এবং আট বছর কারাবন্দী থাকার পর মুক্তি পান। মুক্তির পর তাঁরা অভিযোগ করেন, কারাবন্দী অবস্থায় তাঁদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল।

সাইফ আল-ইসলামের আরও কয়েকটি প্রস্তাব ছিল। এর মধ্যে ‘ইসরাতিন’ নামে একটি প্রস্তাব উল্লেখযোগ্য, যেখানে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের স্থায়ী সমাধানে একটি ধর্মনিরপেক্ষ এক রাষ্ট্রভিত্তিক কাঠামোর কথা বলা হয়। তিনি ফিলিপাইনের সরকার ও মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের নেতাদের মধ্যে শান্তি আলোচনারও আয়োজন করেন। এর ফল হিসেবে ২০০১ সালে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত