Ajker Patrika

রাশিয়ায় আতঙ্ক ছড়ানো ‘নিউমোনিক প্লেগ’ কী, কতটা ভয়ংকর

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১: ৩৫
রাশিয়ায় আতঙ্ক ছড়ানো ‘নিউমোনিক প্লেগ’ কী, কতটা ভয়ংকর
সাইবেরিয়ার ইরকুটস্ক রিসার্চ অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউটে গবেষণারত কর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়ায় প্লেগ ও বিপজ্জনক জীবাণু নিয়ে গবেষণারত একটি প্রতিষ্ঠানের ২৮ বছর বয়সী এক নারী গবেষকের নিউমোনিয়ায় মৃত্যু হয়েছে। তাঁর অসুস্থতার কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই ঘটনায় সাইবেরিয়ার ইরকুটস্ক রিসার্চ অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউটের আরও কয়েকজনকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে প্লেগের সবচেয়ে ভয়ংকর ধরন হিসেবে পরিচিত নিউমোনিক প্লেগ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রাশিয়ার সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘রসপোত্রেবনাদজোর’ অবশ্য ওই গবেষকের মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর কাজের সরাসরি সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, তারা রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য, কী ধরনের পরীক্ষা চলছে এবং আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যের জন্য কোনো ঝুঁকি আছে কি না, তা যাচাই করছে। সংস্থাটি বলেছে, প্রাথমিক ও অনানুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী রাশিয়ায় আতঙ্ক ছড়ালেও এখন পর্যন্ত তা সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি হয়ে ওঠেনি।

নিউমোনিক প্লেগ কী

নিউমোনিক প্লেগ হলো ‘ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস’ (Yersinia pestis) নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হওয়া বিরল কিন্তু অত্যন্ত প্রাণঘাতী ফুসফুসের সংক্রমণ। প্লেগের অন্যান্য ধরনও রয়েছে। সবচেয়ে পরিচিত হলো বুবোনিক প্লেগ, যা সাধারণত সংক্রমিত মাছির কামড় বা ত্বকের ক্ষত দিয়ে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে হয়। এতে শরীরের লসিকা গ্রন্থি ফুলে যায় ও তীব্র ব্যথা হয়।

অন্যদিকে সেপ্টিসেমিক প্লেগ রক্তে সংক্রমণ ঘটিয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে। সংক্রমিত মাংস খাওয়ার মাধ্যমে গলাতেও প্লেগের সংক্রমণ হতে পারে, যাকে ফ্যারিঞ্জিয়াল প্লেগ বলা হয়।

এর মধ্যে নিউমোনিক প্লেগকে সবচেয়ে বিপজ্জনক মনে করা হয়। কারণ এটি সরাসরি একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে শ্বাসতন্ত্রের ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে অন্যরা সংক্রমিত হতে পারেন। সংক্রমিত প্রাণীর শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণ থেকেও জীবাণু ছড়াতে পারে।

লক্ষণ কতটা দ্রুত দেখা দেয়

নিউমোনিক প্লেগে জীবাণু ফুসফুসে গিয়ে গুরুতর নিউমোনিয়া সৃষ্টি করতে পারে। সংক্রমণের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই উপসর্গ দেখা দিতে পারে। জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, বমি ও ডায়রিয়ার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসা না করা হলে রোগটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী হতে পারে। তবে দ্রুত শনাক্ত করা গেলে অ্যান্টিবায়োটিকে চিকিৎসা সম্ভব। সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। সিপ্রোফ্লক্সাসিন, লেভোফ্লক্সাসিন, মক্সিফ্লক্সাসিন, জেন্টামাইসিন ও স্ট্রেপ্টোমাইসিনের মতো ওষুধ ব্যবহৃত হয়। সংক্রমণের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু হলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

প্লেগ কি এখনো আছে

চতুর্দশ শতকের ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর কথা ইতিহাসে বহুল পরিচিত। ওই মহামারিতে ইউরোপে পাঁচ কোটির বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের ফলে প্লেগ এখন অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও রোগটি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়নি। ওশেনিয়া ছাড়া প্রায় সব মহাদেশেই এর অস্তিত্ব রয়েছে। ১৯৯০-এর দশক থেকে মানুষের প্লেগ সংক্রমণের অধিকাংশ ঘটনা আফ্রিকায় ঘটেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নিউমোনিক প্লেগে সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে অ্যারিজোনায়। আক্রান্ত তরুণটি অসুস্থ বিড়ালের সংস্পর্শে কাজ করতেন বলে ধারণা করা হয়।

বিশ্ববাসীর কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সাধারণ মানুষের জন্য বর্তমানে ঝুঁকি কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউমোনিক প্লেগে আক্রান্ত ব্যক্তি খুব দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে তাঁর স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা ও ভ্রমণ করাও কঠিন হয়ে যায়, যা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

তবে আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং তাঁর শরীরের তরলের সংস্পর্শে সতর্ক থাকা জরুরি। রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণে রাখা এবং প্রয়োজনে অসুস্থ হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লেগ ভয়ংকর হলেও দ্রুত শনাক্ত করা গেলে এর চিকিৎসা কার্যকর। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কের চেয়ে দ্রুত শনাক্তকরণ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং যথাযথ চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত