Ajker Patrika

অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের পারকিনসনসের ঝুঁকি অর্ধেক কম: অক্সফোর্ডের গবেষক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের পারকিনসনসের ঝুঁকি অর্ধেক কম: অক্সফোর্ডের গবেষক

ধূমপান অসুস্থতা ও অকালমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। তবুও দেখা যায়, অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কম। কিছু গবেষণায় এমনই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি করেছেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা। বিশ্লেষণধর্মী সংবাদের প্ল্যাটফর্ম দ্য কনভারসেশন এই বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

এই আশ্চর্যজনক যোগসূত্রটি প্রথমবার সামনে আসে ৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে। সে সময় যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা লক্ষ্য করেন যে সামগ্রিকভাবে ধূমপায়ীদের মৃত্যুর হার অনেক বেশি হলেও, পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হয়ে তাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা কম ছিল। এর পর থেকে পরিচালিত অনেক গবেষণাতেই একই ধরণ বা চিত্র পাওয়া গেছে।

ধূমপানের সঙ্গে পারকিনসন্সের কম ঝুঁকির যোগসূত্রটি কেন বিদ্যমান, তা এখনো অস্পষ্ট। গবেষকরা বেশ কিছু ব্যাখ্যা প্রস্তাব করলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যায়নি। সিগারেটের ধোঁয়ায় হাজার হাজার রাসায়নিক ও গ্যাস থাকে, তাই গবেষকরা ক্লু বা সূত্রের সন্ধানে সেগুলোর মধ্য থেকে অনেক উপাদান পরীক্ষা করে দেখেছেন। নিকোটিন বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে কারণ এটি মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে; তবে পারকিনসন্স রোগীদের ওপর নিকোটিনের ট্রায়াল চালিয়ে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে এটি রোগটিকে ধীরগতি করে। ধূমপায়ীদের মধ্যে পারকিনসন্সের ঝুঁকি কমায় এমন অনু বা মলিকিউলটির অনুসন্ধান এখনো অব্যাহত রয়েছে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণা নতুন প্রমাণ হাজির করেছে যে, এই ক্ষেত্রে কার্বন মনোক্সাইড (CO) ভূমিকা পালন করতে পারে। ল্যাবরেটরি ও প্রাণীদের ওপর করা গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, কম মাত্রার কার্বন মনোক্সাইড মস্তিষ্ককে রক্ষা করতে পারে। তবে এ পর্যন্ত মানুষের ওপর এত বড় পরিসরে কোনো গবেষণা করা হয়নি, যেখানে মানুষের শরীর থেকে নিঃসৃত কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাপের সঙ্গে তাদের পরবর্তীতে পারকিনসন্স হওয়া বা না হওয়ার তথ্যের সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে।

কার্বন মনোক্সাইডের সঙ্গে রোগের সম্পর্ক পরীক্ষা করতে আমরা ‘চীন কাদুরি বায়োব্যাঙ্ক’-এর ডেটা বা তথ্য ব্যবহার করেছি, যা পুরো চীনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বৈচিত্র্যময় পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের একটি বিশাল দল। গবেষণার শুরুতে চীনের গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদের শ্বাস-প্রশ্বাসে কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণ মেপেছিলেন, যা সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের সংস্পর্শে আসার একটি নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। এরপর তারা দীর্ঘ সময় ধরে অংশগ্রহণকারীদের পর্যবেক্ষণ করেন এবং পারকিনসন্সসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য রেকর্ড করেন।

পূর্ববর্তী গবেষণার সঙ্গে মিল রেখে গবেষকেরা দেখতে পান যে, নিয়মিত ধূমপায়ীদের পারকিনসন্স হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ কম। আরও দেখা গেছে যে, ধূমপায়ীদের প্রশ্বাসে নির্গত কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা বেশি ছিল। তবে যা সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল তা হলো, যারা কখনো ধূমপান করেননি তাদের মধ্যেও যাদের প্রশ্বাসে নির্গত কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা বেশি ছিল, তাদের পারকিনসন্স হওয়ার ঝুঁকি কম দেখা গেছে। তবে অধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে নির্গত কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা ডিমেনশিয়ার মতো অন্যান্য নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার বা ধূমপানজনিত অন্যান্য রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না।

এই গবেষণাটি ধূমপানের নিজস্ব কোনো প্রতিরক্ষামূলক প্রভাব রয়েছে—এমন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এর বদলে এটি ইঙ্গিত দেয় যে ধূমপায়ীদের মধ্যে পারকিনসন্সের কম ঝুঁকি দেখার পেছনে কার্বন মনোক্সাইড ভূমিকা রাখতে পারে এবং ধূমপান ছাড়াও কার্বন মনোক্সাইডের নিজস্ব একটি পারকিনসন্স প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা থাকতে পারে। সুতরাং, এই ফলাফল ধূমপান শুরু করা বা ধূমপান ত্যাগ করাকে বিলম্বিত করাকে সমর্থন বা যুক্তিযুক্ত করে না, কারণ স্বাস্থ্যের ওপর ধূমপানের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত।

কিছু মানুষের প্রশ্বাসে কেন বেশি কার্বন মনোক্সাইড থাকে?

এমন কিছু মানুষ যারা কখনো ধূমপান করেননি, তাদের প্রশ্বাসেও কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা বেশি থাকতে পারে এবং এটি তাদের চারপাশের পরিবেশ থেকে আসতে পারে। কাঠ, কয়লা বা পেট্রোলের মতো কার্বনযুক্ত জ্বালানি সম্পূর্ণভাবে না পুড়লে কার্বন মনোক্সাইড নির্গত হয়। তাই দূষিত বাইরের বাতাস কিংবা রান্নাবান্না বা ঘর গরম করার জন্য কঠিন জ্বালানি পোড়ানো হয় এমন ঘরের ভেতরের বাতাসে শ্বাস নিলে মানুষের প্রশ্বাসে কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। অন্যের চাওয়া বা পরোক্ষ ধূমপানের ধোঁয়া বাতাসে নেওয়াও একই কাজ করতে পারে।

বিশ্লেষণে এই বিষয়গুলোকে হিসাবের মধ্যে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন গবেষকেরা। তা সত্ত্বেও, যাদের প্রশ্বাসে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা বেশি ছিল, তাদের পারকিনসন্স রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। অন্য কথায়, অঞ্চল, ঋতু, কঠিন জ্বালানির ব্যবহার এবং পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে আসার প্রভাবগুলো বাদ দিয়ে হিসাব করার পরও প্রশ্বাসে কার্বন মনোক্সাইডের উচ্চ মাত্রা এবং পারকিনসন্সের কম ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক অপরিবর্তিত ছিল। তবে আমাদের এই গবেষণা থেকে এটি বলা সম্ভব নয় যে কার্বন মনোক্সাইডের অন্য উৎসগুলো কোথা থেকে এসেছিল।

নিঃশ্বাসের সঙ্গে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড শরীরের ভেতর থেকেও আসতে পারে। কোষগুলো সবসময়ই সামান্য পরিমাণে কার্বন মনোক্সাইড তৈরি করে। উচ্চ মাত্রায় কার্বন মনোক্সাইড বিষাক্ত হলেও, এই কম মাত্রায় এটি শরীরে একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এটি কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে, প্রদাহ প্রশমিত করতে পারে এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে। এই প্রভাবগুলো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে যে কেন উচ্চ মাত্রার কার্বন মনোক্সাইড থাকা মানুষের পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি কম থাকে।

এমন একটি গবেষণা—যা কেবল মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে এবং কোনো হস্তক্ষেপ বা পরিবর্তন করে না—তা এটি প্রমাণ করতে পারে না যে কার্বন মনোক্সাইড পারকিনসন্স থেকে রক্ষা করে। কার্বন মনোক্সাইড কেবল কার রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কম তার একটি নির্দেশকও হতে পারে, মূল কারণ না-ও হতে পারে। তা সত্ত্বেও, এই ফলাফলগুলো কার্বন মনোক্সাইড মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকে পারকিনসন্স থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে—এমন ধারণাকে সমর্থন জোগায়।

পারকিনসন্সের চিকিৎসা হিসেবে কার্বন মনোক্সাইড ব্যবহার করা যেতে পারে কিনা তা খুঁজে বের করার জন্য মানুষের ওপর বড় ও সঠিকভাবে পরিকল্পিত ট্রায়াল প্রয়োজন। পারকিনসন্স আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর কম মাত্রার কার্বন মনোক্সাইডের একটি পরীক্ষা ইতোমধ্যেই চলমান রয়েছে। কার্বন মনোক্সাইড কীভাবে এই রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এটি ভবিষ্যতে কোনো দিন পারকিনসন্সের চিকিৎসা বা প্রতিরোধের জন্য ব্যবহার করা যাবে কিনা তা বোঝার ক্ষেত্রে এর ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

দ্য কনভারসেশনে নিবন্ধটি লিখেছেন ইউনিভার্সিট অব অক্সফোর্ডের নিউরোডিজেনারেটিভ ডিজঅর্ডারের ওপর ডিফিল প্রার্থী ক্লারা বুয়েনো লোপেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত