Ajker Patrika

এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনে নিহতের দাবি ও শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যগুলোর সত্যতা কতটুকু

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনে নিহতের দাবি ও শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যগুলোর সত্যতা কতটুকু
শিক্ষাথীদের আন্দোলনকে ঘিরে প্রচারিত দাবি। ছবি: স্ক্রিনশট

টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ঢাকা, বরিশাল, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। কোথাও কোথাও মহাসড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক বিভ্রান্তিকর দাবি, ভুয়া ফটোকার্ড, পুরোনো ঘটনার ভিডিও এবং মূলধারার গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে—যা জনমনে ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। সারাদেশে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে ঘিরে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এমন কিছু আলোচিত দাবির সত্যতা যাচাই করেছে আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক টিম।

আন্দোলনে একাধিক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার দাবি

শিক্ষার্থী নিহতের দাবিতে ছড়ানো পোস্ট ও ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট
শিক্ষার্থী নিহতের দাবিতে ছড়ানো পোস্ট ও ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট

গতকাল ১৪ জুলাইয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিএনপি, ছাত্রদল ও পুলিশের হামলায় বিভিন্ন স্থানে একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। কোনো কোনো পোস্টে ঢাকায় ৯ জন নিহত হওয়ার দাবি করা হচ্ছে। আবার কোথাও সায়েন্সল্যাবের সামনে ২ জন ছাত্রকে গুলি করে হত্যা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ছাত্রদলের হামলায় ১ জন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার খবর ছড়ানো হচ্ছে।

ফেসবুকে ‘Md. Adnan’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে রাস্তায় রক্ত এবং গুলির খোসা পড়ে থাকার একটি ছবি পোস্ট করে দাবি করা হয়—‘শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ২ জন নিহত, আহত ১৩ জন। ১৪/০৭/২০২৬।’ এ ছাড়া ‘ফরিদপুরে আন্দোলনরত এইচএসসি ২৬ ব্যাচের ওপর গুলি চালায় পুলিশ, এবং গুরুতর আহত হয় এক শিক্ষার্থী’—শীর্ষক দাবিতে জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’-র একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এই পোস্টগুলো নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করেছে।

প্রচারিত দাবির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে অনুসন্ধানে দেশের কোনো মূলধারার গণমাধ্যম কিংবা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে সারা দেশে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ এবং বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও দেশজুড়ে আলোচিত দাবিতে কোনো নিহতের খবর পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া রাস্তায় রক্তের মধ্যে গুলির খোসা পড়ে থাকা ছবিটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার নয়। এটি মূলত গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে একটি কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে এক শ্রমিক নিহতের ঘটনা। সেই পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ছবিকে সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনের দাবি করে প্রচার করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রথম আলোর নামে প্রচারিত ফটোকার্ডটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রথম আলোর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান চালিয়ে এমন কোনো তথ্য ও ফটোকার্ডের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মূলত, প্রথম আলোর নামে প্রচারিত ফটোকার্ডটি ভুয়া। অর্থাৎ, ১৪ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিএনপি, ছাত্রদল কিংবা পুলিশের হামলায় একাধিক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার দাবিগুলো সম্পূর্ণ বানোয়াট।

অটোপাশের দাবি ও পুলিশের লাঠিপেটার দৃশ্য

শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন ও অটোপাশের দাবিতে ছড়ানো ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট
শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন ও অটোপাশের দাবিতে ছড়ানো ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

ফেসবুকে একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, এই পরীক্ষার্থীরা মূলত পরীক্ষা না দিয়ে অটোপাশ পাওয়ার জন্য আন্দোলন করছে। একই সঙ্গে ফেসবুকে আরও একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে—পুলিশ বাস থেকে কিছু তরুণকে নামিয়ে বেধড়ক লাঠিপেটা করছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বর্বরোচিত নির্যাতনের দৃশ্য।

আলোচিত ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে অটোপাশের দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটির কিছু কি-ফ্রেম নিয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় গণমাধ্যম দেশ টিভির ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট শেয়ার করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ওই ভিডিও থেকে জানা যায়, ভিডিওটি সেই সময় অটোপাশের দাবিতে সচিবালয়ে বিক্ষোভরত এইচএসসি শিক্ষার্থীদের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এইচএসসি ও সমমানের স্থগিত পরীক্ষা বাতিলের জন্য আন্দোলনে নেমেছিল শিক্ষার্থীরা।

অন্যদিকে, পুলিশ কর্তৃক বাস থেকে নামিয়ে লাঠিপেটার ভিডিওটি মূলত ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি সংঘর্ষের পুরোনো ফুটেজ। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক আন্দোলনের সঙ্গে ওই ভিডিও দুটির কোনো সম্পর্ক নেই।

শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে প্রচারিত ফটোকার্ড

শিক্ষামন্ত্রীর নামে ছড়ানো ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট
শিক্ষামন্ত্রীর নামে ছড়ানো ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট

শুধু পুরোনো ভিডিও কিংবা আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর বানোয়াট তথ্যই নয়, বরং এর প্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে উদ্ধৃত করে একাধিক ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। এসব ফটোকার্ডে দাবি করা হচ্ছে—তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সময় বুকসমান পানি পাড়ি দিয়ে পড়াশোনা করতাম। আর এখন হাঁটুপানি পাড়ি দিয়ে পরীক্ষা দিতেই এত বাহানা!’, ‘যারা পকেটে করে নকল নিয়ে গিয়েছিল, পথে কোমরসমান পানি পেরোতে গিয়ে যাদের নকল ভিজে গেছে, তারাই এখন আমার পদত্যাগের দাবি তুলছে।’ এবং ‘অটোপাস করে আসা শিক্ষার্থীরা, যারা ফেল করার ভয়ে পরীক্ষা দিতে চাও না, তারা মাদ্রাসায় চলে যাও।’ একই সঙ্গে অপর এক পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, তীব্র আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন পদত্যাগ করেছেন।

দাবিগুলোর সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফটোকার্ডগুলোর কোনোটির পক্ষেই কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া শিক্ষামন্ত্রীর এমন কোনো বক্তব্যের অস্তিত্বও গণমাধ্যম কিংবা বিশ্বস্তসূত্রে পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই তাঁর নামে মনগড়া মন্তব্য যুক্ত করে বিভিন্ন স্যাটায়ার পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে এসব ফটোকার্ড প্রচার করা হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন পদত্যাগ করেছেন দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত দাবিটিরও কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং গতকাল ১৪ জুলাই সংসদে শিক্ষামন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে উচ্চমাধ্যমিকের পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা আবার নেওয়া হবে বলে জানান। পাশাপাশি আজ ১৫ জুলাইও পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের পুনঃপরীক্ষার সুযোগ এবং পদার্থবিজ্ঞানের ভুল প্রশ্নে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার কথা বলেন। অর্থাৎ, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি ও তাঁর নামে ছড়ানো ফটোকার্ডগুলো বানোয়াট।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যান্যদের নামে প্রচারিত ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যান্যদের নামে প্রচারিত ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট

এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবীর রিজভী ও একাধিক ছাত্রদল নেতার নামেও মনগড়া ও বানোয়াট ফটোকার্ড ছড়ানো হয়েছে।

সিদ্ধান্ত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচারিত দাবিগুলো বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর এবং প্রেক্ষাপটহীন। ২০২৪ সালের সচিবালয় ঘেরাও, ২০২৫ সালের ঢাকা কলেজ-সিটি কলেজ সংঘর্ষ এবং নীলফামারীর পুরোনো শ্রমিক আন্দোলনের ছবি ও ভিডিওকে সাম্প্রতিক এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নামে ভুয়া মন্তব্য ও পদত্যাগের বানোয়াট তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত