Ajker Patrika

ভারতের অন্তঃসারশূন্য বিবৃতি

মিহির শর্মা
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৮: ২১
ভারতের অন্তঃসারশূন্য বিবৃতি

দুই মাস আগে ভারত ও কানাডার মধ্যে সম্পর্কের খুব দ্রুত অবনতি হয়। কারণ, ওই সময় কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো অভিযোগ করেছিলেন, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় একজন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীকে হত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং এ ব্যাপারে তাঁর দেশের তদন্তকারীদের কাছে ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ’ রয়েছে। এখন এমনটাই মনে হচ্ছে—ভারতীয় গোয়েন্দারা আসলেই যদি ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে, তাহলে তারা তা একবার করেনি। হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এই সময়ে আরেকজন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীকে (গুরুপতওয়ান্ত পান্নুন) হত্যার জন্য একই ধরনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আর এ কারণে তারা ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’।

কানাডার এই গুরুতর অভিযোগের জবাবে ভারতের প্রতিক্রিয়ায় অবজ্ঞার চেয়ে বেশি কিছু ছিল। ভারতীয় সংবাদপত্রে ট্রুডোকে দুর্বল এবং অজনপ্রিয় বলে সমালোচনা করা হয়েছিল এবং এই ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে তাঁর এসব অভিযোগের কারণ রাজনৈতিক। এ ছাড়া ভারতের সরকারি কর্মকর্তারা কানাডাকে সুসংগঠিত অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ এবং মানব পাচারের একটি ‘যূথবদ্ধ ষড়যন্ত্রী’ বলে অভিযোগ করেছিলেন। এবার যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগকেও একইভাবে অবজ্ঞা করা যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

অবশ্য সন্ত্রাস-সম্পর্কিত বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল হিসেবে চিত্রিত করা অনেক কঠিন। তবু ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াটি অনেকটা অভিযোগ মেনে নিয়েও অস্বীকার করার মতো। ভারত সরকারিভাবে বলছে: বিদেশের মাটিতে হত্যাকাণ্ড ‘আমাদের নীতি নয়’। কানাডাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছিল যে: লক্ষ্য স্থির করে খুন করা ‘ভারত সরকারের নীতি নয়’। যদি নয়াদিল্লিকে এভাবে একাধিকবার ‘বিদেশের মাটিতে হত্যাকাণ্ড ঘটানো তার নীতি নয়’ বলতে হয়, তাহলে আমার সত্যিই ভয় এই ভেবে, কেউ কেউ সন্দেহ করতে শুরু করবে যে এটিই আসলে ভারতের নীতি।

ভারতে অনেকের অনানুষ্ঠানিক কিন্তু আন্তরিক প্রতিক্রিয়া হলো: বিশ্বের বাকি অংশ ড্রোন পাঠিয়ে ও বোমা মেরে আত্মঘাতী হামলাকারীদের বের করে, আমাদেরও তাই করা উচিত। অন্যান্য উদার গণতান্ত্রিক দেশের আইনের শাসনকে সম্মান করা উচিত, এমন ধারণা ভারতে শোনা যায় না; বরং আমরা একটি জাতি হিসেবে এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে যদি প্রয়োজন হয় তবে বিশ্বজুড়ে যাকেই বিপজ্জনক বলে মনে করি, তাদের নিকেশ করে দিতে পারলেই আমাদের সন্তুষ্টি।

আমরা যেহেতু এটি করতে পারি, তার মানে এমন নয় যে আমাদের এটা করা উচিত। এমনকি যারা ভারত ও পশ্চিমের মধ্যে ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’-এর ধারণাকে উপহাস করেন, তাঁদেরও বুঝতে হবে যে এই ধরনের হত্যাকাণ্ডে অনেক কিছুই হারাতে হয়—সদিচ্ছা হারিয়ে যায় এবং জনমনে তা আগুন ধরিয়ে দেয়। 

কোনো দেশই তার মাটিতে অন্য কোনো দেশ ছায়া বা প্রক্সি যুদ্ধ চালালে খুশি হয় না। ভারত নিজেই অতীতে বিভিন্ন ঘটনায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তা বিবেচনা করুন। ২০০২ সালে নয়াদিল্লিতে ইসরায়েলি কূটনীতিকদের ওপর হামলার পরে ইরানকে ব্যাপকভাবে দোষারোপ করা হয়েছিল। পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে ভারত সরকার ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে সম্মান করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাই আজও ভারত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনে কিন্তু ইরানের কাছ থেকে কেনে না। 

এ ছাড়া পশ্চিমে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কীভাবে ভারতের জাতীয় স্বার্থের একটি বড় কারণ হতে পারে? সর্বশেষ কথিত চক্রান্তের লক্ষ্য, গুরুপতওয়ান্ত সিং পান্নুন, একটি অত্যন্ত সহানুভূতিহীন চরিত্র: শিখদের এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে ভ্রমণ না করার জন্য সতর্ক করে দেওয়া তাঁর বক্তব্য ভারতে ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। তিনি বলেছেন, ১৯ নভেম্বর এয়ার ইন্ডিয়ায় ভ্রমণ শিখদের জন্য ‘প্রাণঘাতী’ হতে পারে। ১৯৮৫ সালে ভ্যাঙ্কুভারভিত্তিক খালিস্তানি সন্ত্রাসীরা এয়ার ইন্ডিয়া ১৮২ বিমানে বোমা হামলা চালায়। টরন্টো থেকে লন্ডনে যাওয়ার পথে এই হামলায় ফ্লাইটের ৩২৯ জন আরোহী নিহত হন, যা ৯/১১ হামলার আগে সবচেয়ে ভয়ংকর বিমান হামলা। এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে পান্নুন স্পষ্টতই ভয় দেখান।

কিন্তু ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে খালিস্তান নামের একটি পৃথক শিখ রাজ্য প্রতিষ্ঠার সহিংস আন্দোলন অনেকটাই মৃত। বিদেশে এর কয়েকজন অকার্যকর অনুসারীকে এভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অর্থ এটি তাদের দমন করার চেয়ে আবার জাগিয়ে তোলার আশঙ্কাই বেশি। খালিস্তানি হুমকির তাৎপর্য সম্পর্কে সরকার যদি সত্যিই কিছু জেনে থাকে, তবে অবশ্যই তারা তা জনগণকে জানায় না।

আসুন, আমরা এই আশা করি যে ভারতের বিবৃতিটি সত্য। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড চালানো ভারতের নীতি নয়। এমনকি কয়েক মাস আগে যদিও এটি ঠিক তা ছিল না। পশ্চিমে বিচ্ছিন্নতাকামী শিখ সমর্থকদের হত্যার লক্ষ্য বানানোর কোনো সুস্পষ্ট ও বাস্তব যুক্তি নেই। এতে এই সব গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে চড়া মূল্য দিতে হবে। কিছু ভারতীয় এই ভেবে গর্বিত হতে পারেন—আমরা অন্যের দেশের মাটিতে দাপট দেখাতে পারি। কিন্তু অবশ্যই আমাদের অনেক বেশিসংখ্যক গর্বিত হবেন, যদি আমরা তা দেখানোর কোনো দরকার বোধ না করি। 

ব্লুমবার্গে প্রকাশিত লেখাটি ইংরেজি থেকে অনূদিত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নির্বাচনের পর কী করবেন ড. ইউনূস, জানাল প্রেস উইং

বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের নতুন ব্যাখ্যা দিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন

৪০০ টাকায় ২০ এমবিপিএস ইন্টারনেট দেবে বিটিসিএল, সাশ্রয়ী আরও ৮ প্যাকেজ ঘোষণা

৫১ বছর পর মার্কিন আকাশে ডুমসডে প্লেন, পারমাণবিক যুদ্ধের শঙ্কায় কাঁপছে সোশ্যাল মিডিয়া

নিজের চরকায় তেল দাও—মামদানিকে ভারতের তিরস্কার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত