প্রবীণ জীবনে প্রবেশ করে অনেকেই সম্মান-মর্যাদা আশা করেন। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের কাছে অগ্রাধিকার চান। সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে আগ্রহী হন।
সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে এগিয়ে আসেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লাব, সংঘসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে অংশগ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করেন; বিশেষ করে যাঁরা একসময় চাকরিবাকরি করেছেন, তাঁদের মধ্যে সামাজিক কাজকর্মে অংশগ্রহণের আগ্রহ বেশি দেখা যায়। ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অনেকেই আগে থেকে সামাজিক কাজে অংশ নেন।
মানুষ সম্মানিত হতে চায়, এটা সহজাত প্রবৃত্তি। সম্মানিত লোকেরা বেশি বেশি প্রশংসিত হন। প্রশংসা শোনার জন্য মানুষের আকুলতা সবচেয়ে বেশি। প্রশংসিত হওয়ার জন্য কাজ করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। প্রশংসা এবং নিন্দা দুইই একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। যিনি প্রশংসিত হন, তিনি আবার নিন্দিত হতে পারেন। প্রবাদ আছে, যেমন কর্ম, তেমন ফল।
যিনি খাদ্যে-ওষুধে ভেজাল দিয়েছেন, ওজনে কম দিয়েছেন, বিচার বিক্রি করেছেন, কালোবাজারি করেছেন, নিম্নমানের পণ্যকে উচ্চমানের বলে চালিয়েছেন, অবৈধ মজুতদারি করেছেন, আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভার ইনভয়েসিং করেছেন, সুযোগ বুঝে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন, তিনি প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে অসম্মানিত ব্যক্তি।
যিনি চাকরিতে যোগ দিয়ে দায়িত্ব পালনে শিথিলতা প্রদর্শন করেছেন, অফিস চলাকালে চেয়ারে বসে গালগল্প করেছেন, ঘুষ নিয়েছেন, দুর্নীতি করেছেন, সেবাপ্রার্থীকে অহেতুক হয়রানি করে অসম্মানিত করেছেন, তিনি সব সময়ই একজন ঘৃণিত ব্যক্তি।
যিনি পরিবারের সদস্যদের প্রতি অসদাচরণ করেছেন, ঠকিয়েছেন, সম্পদের বিলিবণ্টনে অসাধুতার পরিচয় দিয়েছেন, পিতা-মাতা, ভাই-বোনকে বঞ্চিত করেছেন, আত্মীয়স্বজনকে অবহেলা, অসম্মান করেছেন, তিনি কোনো অবস্থাতেই সম্মান আশা করতে পারেন না।
যিনি সমাজ উন্নয়নে কাজ করবেন বলে এনজিও গড়ে তুলেছেন, বেকার যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানে ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি যদি প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসন কেন্দ্র বানিয়ে ফেলেন, তবে তাঁর সম্মানিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। যিনি জনগণের সহায়-সম্পদ বুদ্ধি খাটিয়ে কৌশলে নিজের দখলে রেখেছেন, তিনিও সম্মান আশা করতে পারেন না। যিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনে জনগণের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেননি, তাঁর সম্মান পাওয়া কঠিন।
বড় বড় স্থাপনা নির্মাণে যাঁরা অবৈধভাবে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছেন, তাঁরা কোনোমতেই সম্মানিত হবেন না। যিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত ছিলেন, তিনি দায়িত্ব পালনে শিথিলতা প্রদর্শন করে জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি করেছেন। ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে আখের গুছিয়ে নিয়েছেন, এমন ব্যক্তি কীভাবে সম্মানিত হবেন?
যিনি শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের প্রতি সঠিক আচরণ করেননি, রাগ-অনুরাগের বশবর্তী হয়ে নম্বর কম-বেশি করেছেন, ক্লাস ঠিকমতো করাননি, গবেষণার নামে নকল করেছেন, ছাত্রীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন, কিংবা প্রস্তাব দিয়েছেন, দায়িত্ব পালনে শিথিলতা দেখিয়েছেন, তিনি সম্মান আশা করতে পারেন না।
যিনি আইন পেশায় যুক্ত থেকে মক্কেলের জন্য সঠিকভাবে কোর্টে লড়াই করেননি, শিথিলতা প্রদর্শন করেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে বিচার বিলম্বিত করার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন, বিপক্ষ শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, মামলা দুর্বল করে দিয়েছেন, তিনি কীভাবে সম্মানিত হবেন?
যিনি চিকিৎসা পেশায় থাকার সময় রোগীকে সঠিকভাবে চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন, ওষুধ কোম্পানি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিকের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন, রোগীর সঙ্গে অন্যায় আচরণ ও দুর্ব্যবহার করেছেন, তিনি সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন।
যিনি পিতা-মাতা হিসেবে সন্তানের প্রতি সঠিক আচরণ করেননি, অতিরিক্ত কঠোরতা-শিথিলতা দেখিয়েছেন, সন্তানকে ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করতে চেয়েছেন, কাজের অজুহাতে সন্তানকে মানসম্মত সময় দেননি, সন্তানের চাহিদাগুলোকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখেননি, কাউকে বেশি আবার কাউকে কম গুরুত্ব দিয়েছেন, সন্তানের কল্যাণ বিবেচনায় নেননি, তিনি সম্মান পাবেন কি না, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
যিনি সন্তান হিসেবে পিতা-মাতাকে সেবা-যত্ন করেননি, ভরণপোষণ দেননি, চিকিৎসায় সহায়তা করেননি, খোঁজখবর রাখেননি, সামর্থ্য থাকার পরও টাকাপয়সা দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্য করেছেন, তিনি কোনোভাবে সম্মান পেতে পারেন না।
যিনি কবি, লেখক, সাহিত্যিক হিসেবে কাজ করার সময় জুলুম, নির্যাতন, নিপীড়ন, অবিচারকে কলমে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন, তিনি কীভাবে সম্মান আশা করতে পারেন?
যিনি গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে কাজ করার সময়ে নিরপেক্ষভাবে সত্য প্রকাশে কুণ্ঠিত ছিলেন, বিভিন্ন রকমের অনৈতিক কাজে যুক্ত ছিলেন, সুবিধা নিয়েছেন, তিনি কীভাবে সম্মানিত হবেন?
পৃথিবী শুধু দাতাকে স্মরণ করে, গ্রহীতাকে নয়। মানুষের কাছে তাঁর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি, যিনি নেন সবচেয়ে কম, দেন বেশি! যাঁরা সমাজ পরিবর্তনে, দেশ সৃষ্টিতে, ভাষার দাবিতে, গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁরা আমাদের কাছে প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি। আর যাঁরা ভোগবিলাস, বাড়ি-গাড়ি, সহায়-সম্পদ নিয়ে বেশি ব্যস্ত, তাঁদের মানুষ শ্রদ্ধার চোখে দেখেন না। শুধু গ্রহণকারী ব্যক্তি সমাজের চোখে, মানুষের কাছে শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র হতে পারে না।
লেখক: প্রবীণ বিষয়ে লেখক, গবেষক ও সংগঠক










