বাংলা ভাষা সম্পর্কে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এবং পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের মনোভাব ১৯৪৭ সালেই জানা হয়ে গিয়েছিল সবার। দুজনের কেউই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনেননি। ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এসে যখন রেসকোর্স ময়দানে বক্তব্য দিলেন, তখন বোঝা গেল, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।মূলত উর্দুকে হটিয়ে দিয়ে শুধু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার কোনো পরিকল্পনা বাঙালি ছাত্র-শিক্ষক ও রাজনীতিকদের ছিল না। পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা—এটাই ছিল তাঁদের দাবি।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্ভবত বাঙালি উর্দুভাষী এলিট বা অভিজাতদের সঙ্গেই ভাষা প্রসঙ্গে কথা বলেছিলেন। এই শ্রেণির মানুষেরা বাড়িতে উর্দু ভাষায়ই কথা বলতেন। তাই তারা পূর্ববঙ্গের ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে কিছু না বলে এই আন্দোলন কমিউনিস্ট এবং ভারতের সৃষ্টি বলে প্রচার চালিয়েছিলেন। জিন্নাহ সম্ভবত তাতেই বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। ২৪ মার্চ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণেও জিন্নাহ ভাষা প্রসঙ্গে ২১ মার্চ রেসকোর্সে দেওয়া ভাষণেরই পুনরাবৃত্তি করেন। ২৬ মার্চ দৈনিক আজাদে এ বিষয়ে তার যে বক্তব্য ছাপা হয়, তা ছিল এ রকম:‘সম্প্রতি বিশেষ করিয়া আপনাদের প্রদেশের উপরেই দূরভীসন্ধিমূলক আক্রমণ আরম্ভ হইয়াছে।
আমাদের দুশমনেরা পাকিস্তানকে দুর্বল করার আশায় প্রাদেশিকতা প্রচারে তৎপর হইয়া উঠিয়াছে এবং এইভাবে আপনাদের প্রদেশকে পুনরায় ভারত ডমিয়নে অন্তর্ভুক্ত করার পথ সুগম করিয়া দিতেছে। দুঃখের সহিত বলিতে হইতেছে যে, এই শত্রু দলের ভিতরে এখন পর্যন্ত কতকগুলি মুছলমান রহিয়াছে।...এইসব পঞ্চম বাহিনীর সম্পর্কে আমি আপনাদিগকে সাবধান করিয়া দিতেছি। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে আমার মতামত পুনরায় ব্যক্ত করিব।
এই প্রদেশের সরকারি ভাষা হিসাবে ব্যবহারের জন্য এই প্রদেশবাসী তাহাদের ইচ্ছামত যেকোন ভাষা গ্রহণ করিতে পারেন এবং প্রশ্নটি প্রদেশবাসীর অভিরুচি অনুযায়ী তাহারাই স্থির করিবেন। জনসাধারণের আস্থাভাজন প্রতিনিধিগণ শান্ত ও সুস্থ মনে বিচার-বিবেচনা করিয়া যাহা স্থির করিবেন তাহাই হইবে। তবে একটি মাত্র রাষ্ট্রভাষা থাকিতে পারে এবং উহা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে আদান-প্রদানের ভাষা হইবে এবং সে ভাষা উর্দু ভিন্ন অপর কোন ভাষা হওয়া উচিত নয়।’
ছাত্রদের মধ্যে থেকে তখন কয়েকজন ‘নো নো’ বলে চিৎকার করে উঠেছিলেন। জিন্নাহ কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিলেন, এরপর শান্তভাবে তার বক্তব্য শেষ করেছিলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় জিন্নাহ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, কামরুদ্দীন আহমদ, আবুল কাশেম, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ প্রমুখ। সে বৈঠকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল। সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিরা জিন্নাহর কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেছিলেন। ২২ মার্চ তমদ্দুন মজলিস যে বিবৃতিটা দিয়েছিল, তাতে বলা ছিল যে ‘কায়েদে আজম’-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তারা তাকে ভাষা প্রসঙ্গটি বোঝাতে সক্ষম হবেন। কিন্তু ওই বৈঠকে তমদ্দুন মজলিসের আবুল কাশেম উপস্থিত থাকলেও তিনি জিন্নাহর অগণতান্ত্রিক বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ করেননি।
এরপর জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। কিন্তু সেই প্রতিনিধিদলে অমুসলিম ছাত্রনেতাদের উপস্থিতির কারণে তিনি মুখ খুলতে চাননি। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট তিনি যে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন, তা থেকে সরে এসেছেন। অর্থাৎ পাকিস্তানকে তত দিনে একটি ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ হিসেবেই বিবেচনা করতে শুরু করেছেন জিন্নাহ স্বয়ং।










