Ajker Patrika

অশুভ সময়ের নান্দনিক চিত্রায়ন ‘কালবেলা’

আশিকুর রিমেল, ঢাকা
আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২১, ১১: ৪৭
অশুভ সময়ের নান্দনিক চিত্রায়ন ‘কালবেলা’

‘…সত্যি কি কেউ বিশ্বাস করবে না, আমি পালাতে পেরেছিলাম? কী ভুল? কী ভুল!’ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পরিস্থিতিতে গর্ভধারণ করা নারী সানজিদা নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন এভাবেই। যুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে বিদ্যমান ধ্যানধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বগত এ প্রশ্নের উত্তরের সিদ্ধান্ত নেন নিজেই। নিজেকে দাঁড় করান একটি সিদ্ধান্তে। সন্তানকে সামনে ধরে বলেন, ‘যারা তোর জন্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাদের কাউকে দরকার নেই, আমি একাই তোর বাবা-মা।’ ক্ষোভ জড়ানো এই উদ্ধৃতি যেন স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের প্রতীক হয়ে সমহিমায় বলীয়ান হয়ে ওঠে।

এই দৃশ্য উঠে এসেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমির ওপর নির্মিত ‘কালবেলা’ ছবিতে। যুদ্ধকালীন একজন উচ্চশিক্ষিত নারীর সাহসিকতার বয়ান ‘কালবেলা’। প্রয়াত নির্মাতা সাইদুল আনাম টুটুলের রেখে যাওয়া ছবিটি গত শুক্রবার দেশের তিনটি হলে মুক্তি পেয়েছে।

এই চলচ্চিত্রের কাজ শেষ হওয়ার কিছুদিন আগে ২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নির্মাতা সাইদুল আনাম। তাঁর সেই অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন সহধর্মিণী মোবাশ্বেরা খানম।

‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ সম্পাদক হিসেবে ১৯৭৯ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান নির্মাতা টুটুল। চলচ্চিত্রের সঙ্গেই কেটেছে তাঁর পুরো জীবন। মহান মুক্তিযুদ্ধে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অংশ নেন তিনি। দুঃসময় নিজে পার করেছেন, দেখেছেন সে সময়ের ভয়াবহতা। নির্মাণের জন্য বেছে নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের একটি বাস্তব গল্প।

সানজিদা ‘কালবেলা’ ছবির প্রধান চরিত্র। নিজের জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। সেই সংকটময় মুহূর্তে তাঁর সম্ভ্রমহানির চেষ্টায় মত্ত ছিল এই দেশেরই মানুষ। পাকিস্তানি সেনাদের কবল থেকে রক্ষা পেলেও এদেশে তাদের দোসরদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। সানজিদার চোখ দিয়ে সেই ভয়াবহ সময়ের চিত্র ‘কালবেলা’য় দেখিয়েছেন নির্মাতা।

‘কালবেলা’ ছবির গল্পে খুলনা পাইওনিয়র জুটমিলের কর্মকর্তা মতিনের স্ত্রী সানজিদা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন দুজনই। বিয়ের পর আরও অনেকের মতো স্বপ্ন বুনতে থাকে সানজিদাও। একদিন পাটকল থেকে মতিনকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। এখান থেকে ‘কালবেলা’ মোড় নেয় সদ্যবিবাহিত এক নারীর সংগ্রামের গল্পে।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়। বিজয় আসে। শহীদ হওয়া স্বামীর অবর্তমানে স্বাধীন দেশে প্রশ্ন ওঠে সেই সন্তান নিয়ে। নির্দেশকের চোখে দেখানো সানজিদা চরিত্রটির সংকট ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশকে ভাবিয়ে তোলে। যুদ্ধশিশু সম্পর্কে স্বাধীন বাংলাদেশের সামাজিক ধ্যানধারণা, বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

কালবেলা মানে অশুভ সময়। দুঃসময়ে স্বপ্নই যেন একমাত্র ভরসা। প্রেম ও প্রণয়, দৃশ্যত স্বাধীনতার সঙ্গে মানসিকতার বন্দিত্বের বিষয়টি পাশাপাশি আলোড়িত করবে দর্শকদের। একটি অশুভ সময়ের চিত্র নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করেছেন নির্মাতা টুটুল তাঁর ‘কালবেলা’য়।

‘কালবেলা’ ছবির সানজিদা চরিত্রে অভিনয় করছেন তাহ্‌মিনা অথৈ। আর তার স্বামী মতিন চরিত্রে আছেন শিশির। ছবির অধিকাংশ কলাকুশলীই বিভিন্ন থিয়েটারের কর্মী। ১০ ডিসেম্বর মুক্তি পাওয়ার পর থেকে দর্শকদের প্রশংসা পাচ্ছে ‘কালবেলা’। তবে নির্মাতার কাছ থেকে প্রতিক্রিয়ার ঘরটা শূন্যই রয়ে গেল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত