Ajker Patrika

মহামারির নাম যখন প্রশ্নপত্র ফাঁস!

শরিফুল হাসান
আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২১, ১৩: ৪০
মহামারির নাম যখন প্রশ্নপত্র ফাঁস!

সরকারি নিয়োগের পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে আনা উচিত। পিএসসি যেমন এখন একটা বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে নন ক্যাডারের বিভিন্ন পদেও নিয়োগ দেয়, তেমনি সারা বছরে কয়েকটি পরীক্ষা হতে পারে পিএসসির মাধ্যমেই। 

কোভিডের মহামারি কমে আসার পর কয়েক মাস ধরে বন্ধ থাকা নিয়োগ পরীক্ষাগুলো ফের শুরু হয়েছে। একটা চাকরির আশায় রোজ শুক্র-শনিবার দেশের নানা প্রান্ত থেকে তরুণেরা পরীক্ষা দিতে ছুটে আসছেন ঢাকায়। ৬ নভেম্বরও ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির আওতাধীন পাঁচ ব্যাংকের অফিসার (ক্যাশ) পদের পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন লাখখানেক প্রার্থী। হঠাৎ ডাকা ধর্মঘটের মধ্যে বহু কষ্টে ঢাকায় এসে পরীক্ষা দেওয়ার পরপরই তাঁরা জানতে পারেন, এই নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।

ওই দিন বেলা ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত এই পরীক্ষা ছিল। প্রার্থীদের দাবি, পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ১০০টি প্রশ্নের প্রিন্ট করা উত্তরপত্র ফেসবুকে পাওয়া গেছে। বেশ কয়েকজন সেটা ইনবক্সেও পাঠিয়েছেন আমাকে। এর মধ্যে একজন নাম গোপন রাখার শর্তে যে স্ক্রিনশট পাঠালেন তাতে দেখা গেল, পরীক্ষা বিকেলে হলেও হাতে লেখা উত্তরপত্রটি কাউকে পাঠানো হয়েছে দুপুর ১২টার পরপরই। বুঝতে বাকি রইল না যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ততক্ষণে শত শত ছেলেমেয়ের মেসেজ পেতে শুরু করেছি।

আমার ধারণা ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের এ বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে খবর হবে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, গণমাধ্যমেই খবরটি নেই। পরদিন রোববার ২০-২৫ জন তরুণ বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানালেন। বরাবরের মতোই কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করল।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই অস্বীকারের চার দিনের মাথায় ১১ নভেম্বর রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তিতে অনিবার্য কারণে পরীক্ষা বাতিলের কথা জানানো হলো। অবশ্য না জানিয়ে উপায় কী? এর আগের দিন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ যে রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দিয়েছে, কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এ ঘটনায় জালিয়াতি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের অনুসন্ধানে পুরো বিষয়টিই উঠে এসেছে।

এবারের এই নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র করার দায়িত্ব ছিল আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের। অতীতে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁসের একাধিক অভিযোগ ছিল। গোয়েন্দা পুলিশ প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি টেকনিশিয়ান মোক্তারুজ্জামানকেও গ্রেপ্তার করেছে। তিনি ওই পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তরপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। এর আগেও চক্রটি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর ফাঁস করেছে। পরীক্ষার পাঁচ-ছয় ঘণ্টা আগে তারা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কয়েক হাজার পরীক্ষার্থীকে প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহ করেছে। এ জন্য একেকজন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে নিয়োগ পাওয়ার আগপর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। প্রায়ই বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে এবং ঘটনার তদন্ত না করেই নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষগুলো বলে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। জানি না কী দৈবশক্তিতে তারা এত দ্রুত নিশ্চিত হয়ে যায় যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। অবশ্য উল্টোও হতে পারে। যে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সর্বত্রই প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়মিত বিষয়, সেখানে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকেই হয়তো তাঁরা স্বাভাবিক মনে করেন। আর বরাবরই তাই কর্তৃপক্ষ ঘটনাগুলো অস্বীকার করে।

আমার বেশ মনে আছে অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা। ২০১৭ সালের ১৯ মে সকাল-বিকেল দুই বেলায় এই পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকালে পরীক্ষা শুরুর আগেই ব্যাপক হারে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি পরীক্ষার আগে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রটি আমি সেই সময়ে প্রথম আলোর নিউজে তুলে দেওয়ার পরেও সেই পরীক্ষা বাতিল করতে চাইছিল না কর্তৃপক্ষ।

এর আগে ওই বছরেরই ২১ এপ্রিল জনতা ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা পদের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়। অনুসন্ধান করে জানতে পারি, পরীক্ষা শুরুর আগের রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্নপত্র পেয়েছিলেন এমন কয়েকজন বিষয়টা স্বীকারও করেন। কিন্তু এই পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলে, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় কিন্তু পরীক্ষা তো বাতিল হয় না। কাজেই এই পরীক্ষাও বাতিল হবে না।

এর আগে কৃষি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তোলেন পরীক্ষার্থীরা। সেটিও বাতিল হয়নি। কিন্তু কেন এগুলো বাতিল হয় না?

কারণটা অর্থনৈতিক। পিএসসি ছাড়া বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর মেধা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশে কোনো কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ফলে বেশির ভাগ নিয়োগ পরীক্ষা হয় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে। আউটসোর্স মানে, নিয়োগ পরীক্ষাগুলো নেবে আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, কোনো বিভাগ বা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এ জন্য দরপত্র ডাকে। একেকটি পরীক্ষা নেওয়ার জন্য দেড় থেকে দুই কোটি টাকা পায় বিভাগগুলো। আর সে কারণেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তারা স্বীকার করতে চায় না।

অবশ্য শুধু ব্যাংক নয়, সরকারি নানা নিয়োগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিয়মিত ঘটনা। সিআইডিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নানা সময়ে এসব চক্রের অনেককেই গ্রেপ্তারও করেছে; যেখানে সরকারি অনেক কর্মকর্তা এবং ব্যাংকারসহ অনেকের তথ্য এসেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ডিজিটাল জালিয়াতি করে চক্রটি কোটি টাকা আয় করেছে। সর্বশেষ পুলিশ এমন একজন ব্যাংক কর্মকর্তাকে আটক করেছে, যার বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁসের তথ্য পেয়েছিলাম প্রায় এক দশক আগে। একাধিকবার তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। কয়েক শ কোটি টাকার নাকি মালিক তিনি। এই চক্রের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া প্রশ্নে সরকারের নানা দপ্তরে চাকরি পেয়েছেন অনেক তরুণ। অন্যদিকে হতাশায় ডুবেছে তারুণ্য।

চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন, লেখাপড়া শেষ করে পরিবারের কাছে টাকা চাওয়া কষ্টের। একেকটি পরীক্ষার জন্য আবেদন ফি হিসেবে কখনো ৫০০, ৭০০ বা ১০০০ টাকা করে নেওয়া হয়। এই সব পরীক্ষা হয় আবার ঢাকায়। ফলে দুর্ভোগের শেষ নেই। কিন্তু এত কষ্টের পর যদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা শোনা যায়, তাহলে তরুণেরা যাবেন কোথায়?

এই মুহূর্তে দুটো সমাধানের কথা মাথায় আসছে। ব্যাংক বা সরকারি নানা নিয়োগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠলেও বিসিএসের প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা এখন আর শোনা যায় না। কী করে সেটা সম্ভব হলো? আমি নিজে এ ঘটনার সাক্ষী। পিএসসি বিসিএসের আট থেকে দশ সেট প্রশ্নপত্র করে। পরীক্ষার আগমুহূর্তে লটারি করে সিদ্ধান্ত হয় কোন প্রশ্নে পরীক্ষা হবে। সব নিয়োগ পরীক্ষায় একই কাজ করা যেতে পারে।

আরেকটি বিষয় হলো, সরকারি নিয়োগের পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে আনা উচিত। পিএসসি যেমন এখন একটা বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে নন-ক্যাডারের বিভিন্ন পদেও নিয়োগ দেয়, তেমনি সারা বছরে কয়েকটি পরীক্ষা হতে পারে পিএসসির মাধ্যমেই। সব ধরনের ব্যাংকের জন্য একটা, কারিগরি পদের জন্য একটা, সাধারণ পদের জন্য একটা—এমন করে বছরে পাঁচ থেকে দশটা পরীক্ষা হতে পারে। সাধারণ নবম গ্রেডের কর্মকর্তা পদ দিয়ে সরকারি চাকরি শুরু হয়। কাজেই সরকারের বিভিন্ন বিভাগ কয়েকটি ভাগে ভাগ করে পাঁচ থেকে দশটি পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগ ও অপেক্ষমাণ তালিকা প্রকাশ করে রাখা যেতে পারে।

আবার শুধু কর্মকর্তা পদ নয়, কর্মচারী বা নিচের দিকের পদেও স্বচ্ছভাবে নিয়োগ হওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে বছরে পদের ধরন অনুযায়ী জাতীয়ভাবে পাঁচ থেকে দশটা নিয়োগ পরীক্ষা হতে পারে। এরপর অপেক্ষমাণ তালিকা বা প্যানেল করে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। তাতে দুর্ভোগ কমবে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকিও কমবে।

আরেকটি বিষয়। যেকোনো ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেই কাউকে না কাউকে দায় নিতে হবে। এই যে বারবার অস্বীকারের সংস্কৃতি, সে কারণেই প্রশ্নপত্র বেশি ফাঁস হয়। কাজেই যেকোনো প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে সেই পরীক্ষা বাতিল করতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান সেই প্রশ্নপত্র করেছিল তাদেরও কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে। দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও দায় নিতে হবে। ফৌজদারি অপরাধে বিচার হতে হবে।

আর শুধু নিয়োগ পরীক্ষা নয়, মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে যেকোনো ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতেই হবে। একটা দেশের তরুণ প্রজন্মকে সুস্থভাবে বাঁচাতে হলে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধের কোনো বিকল্প নেই। আর সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহামারির বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হতে হবে সবাইকে।

শরিফুল হাসান: কলামিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত