হলিউডের চলচ্চিত্র ব্যবসার ধরন কয়েক বছর ধরেই পরিবর্তনের পথে হাঁটছিল। করোনা মহামারি সেই ধীর চলনকে দৌড়ে বদলে দিয়েছে। অবস্থা এমন যে হলিউডের চলচ্চিত্র ব্যবসার ব্যাটন এখন ক্রমেই চলে যাচ্ছে স্ট্রিমিং জায়ান্টদের হাতে।
এত দিন হলিউডের ব্যবসা আবর্তিত হতো বড় স্টুডিও ও বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহের মালিকদের মধ্যে। এখন তাতে ঢুকে গেছে নেটফ্লিক্স, ডিজনি প্লাস, অ্যাপল, আমাজন প্রাইম ইত্যাদি। করোনার আগপর্যন্ত স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোকে ঠেকানোর জোরচেষ্টা চালিয়েছেন হলিউডের ব্যবসায়িরা। এমনকি নেটফ্লিক্সের তৈরি ছবিকে অস্কার প্রতিযোগিতায় বিবেচনার বাইরে রাখার চেষ্টাও করা হয়েছে। প্রেক্ষাগৃহে ন্যূনতম সময় ধরে ছবি প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়েছে। তবে করোনা বদলে দিয়েছে প্রেক্ষাপট। এখন উল্টো প্রেক্ষাগৃহের ব্যবসা ধরে রাখতেই স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর দ্বারস্থ হতে হচ্ছে প্রদর্শকদের।
করোনাকালে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো বিনোদনজগতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। করোনা আসার আগেই নেটফ্লিক্স ক্রমান্বয়ে বিনিয়োগ বাড়িয়ে যাচ্ছিল। দেখাদেখি এ জগতে আসে আমাজন, ডিজনি, অ্যাপলসহ অনেকে। করোনার ‘নতুন স্বাভাবিক’ ধারণা এসব প্রতিষ্ঠানকে স্ট্রিমিংয়ে বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছে।
ফলে কনটেন্ট তৈরিতে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর ধারেকাছে যেতে পারছে না আগের ব্যবসায়িক মডেলের পান্ডারা। একদিকে তাদের কনটেন্টের খরায় ভুগতে হচ্ছে, অন্যদিকে গুনতে হচ্ছে লোকসান। যেমন, জেমস বন্ডের নতুন ছবি শুধু প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিতে চেয়ে প্রযোজক প্রতিষ্ঠান এমজিএম-কে লোকসান গুনতে হচ্ছে। শুধু টিকিট বেচে বিশ্বজুড়ে ৭৩০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে ‘নো টাইম টু ডাই’; তারপরও লাভের মুখ দেখছে না। কারণ, ২৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তৈরি ছবিটির প্রচারে খরচ হয়েছে আরও ১০০ মিলিয়ন ডলার। করোনায় মুক্তি পিছিয়ে যাওয়ায় খরচের খাতা ভারী হয়ে মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ৯০০ মিলিয়ন ডলারে।
অন্যদিকে, হালের ‘ডিউন’ বা ‘ব্ল্যাক উইডো’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পাশাপাশি ওয়ার্নার মিডিয়া ও ডিজনির স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মেও মুক্তি পেয়েছে। ফলে সহজেই ব্যয় পুষিয়ে নিতে পারছে। কারণ, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আয়ে বাঁধাধরা কোনো সময় নেই। আবার দর্শকদের মধ্যেও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের জন্য তৈরি ছবি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখার চল চালু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায় নেটফ্লিক্সের সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র ‘রেড নোটিশ’-এর কথা। ছবিটি চলতি মাসেই নেটফ্লিক্সের পাশাপাশি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত নেটফ্লিক্সের তৈরি সবচেয়ে বড় বাজেটের ছবি। কিন্তু স্ট্রিমিংয়ে দেখার সুযোগ থাকায় এর প্রেক্ষাগৃহকেন্দ্রিক ব্যবসায় ধস নামেনি। উল্টো সিনেমার্কের মতো হলিউডের বড় প্রেক্ষাগৃহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, নেটফ্লিক্সের ছবি টিকিট কেটেও মানুষ দেখছে এবং তাঁরা সন্তুষ্ট।
অর্থাৎ, স্ট্রিমিংয়ের ছবি প্রেক্ষাগৃহে চলবে না—এমন ধারণা এখন আর বাজারে চলছে না। ফলে, বদলে যাচ্ছে হলিউড ইন্ডাস্ট্রির ক্ষমতা চর্চার চেনা সমীকরণ। বড় তারকা ও এএমসির মতো প্রেক্ষাগৃহ চেইনগুলোর প্রভাব কমতে শুরু করেছে। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট কলাকুশলীরাও এখন নেটফ্লিক্স–ডিজনির কল্যাণে কাজ পাচ্ছেন, অর্থকড়িও ভালোই। ফলে বড় স্টুডিওগুলো আর নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকতে পারছে না।
নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছেন, হলিউডের চলচ্চিত্র ব্যবসায় একটি বিশাল পরিবর্তন ঘটছে ক্রমান্বয়ে। শেষমেশ নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের হাতে চলে যায় কি না, তাই এখন দেখার।
তথ্যসূত্র: হলিউড রিপোর্টার, দ্য ইকোনমিস্ট, ভ্যারাইটি, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স ও কোয়ার্টজ ডটকম










