Ajker Patrika

নির্বাচনকালীন সরকার: আলোচনা শুধু আওয়ামী লীগে , বিএনপি বলছে চাপ

রেজা করিম ও তানিম আহমেদ, ঢাকা
নির্বাচনকালীন সরকার: আলোচনা শুধু আওয়ামী লীগে , বিএনপি বলছে চাপ

রাজনৈতিক আলোচনায় হঠাৎ ঢুকে পড়ে বড় জায়গা করে নিয়েছে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের পরদিন এ নিয়ে কথা বললেন প্রধানমন্ত্রীও। তবে বিষয়টি নিয়ে সরকারের দিক থেকে যতটা কথা বলা হচ্ছে, সেই পরিমাণে সাড়া মিলছে না বিএনপির দিক থেকে। তারা বলছে, সরকার চাপে পড়ে এসব কথাবার্তা বলছে। তাই তারা এটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাদের চিন্তায় শুধুই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার। সংসদের অন্য দলগুলোও এ নিয়ে নীরব আছে।

নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে সংবিধানে নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। সেখানে বলা আছে, নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সরকারের কর্তব্য হবে ইসিকে সহায়তা করা। নির্বাচনের সময় সরকারের আকার ছোট করা বা কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিকে নিয়ে সরকার গঠনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এমনকি টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। তবে সরকারের আকার ছোট বা বড় করার এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে। এটা তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা। তিনি যেকোনো সময় তা করতে পারেন। তিনি চাইলে সেটা এখন যেমন করতে পারেন, নির্বাচনের আগেও করতে পারেন। এতে সংবিধানের কোনো ব্যত্যয় হবে না।

জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর শেষে ফিরে গত সোমবার সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি বলেন, ‘পার্লামেন্টে যারা আছে, তাদের মধ্যে কেউ যদি ইচ্ছা প্রকাশ করে যে নির্বাচনকালীন সরকারে তারা আসতে চায়, আমরা নিতে রাজি আছি।’ তবে বিএনপির মতো সংসদে যারা নেই, নির্বাচনকালীন সরকারের চিন্তায় তারা নেই।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তাঁদের দেওয়া বক্তব্য খোলাসা করেছেন শেখ হাসিনা। গত দুটো নির্বাচনের সময় ছোট আকারের নির্বাচনকালীন সরকার ছিল। সেখানে বিভিন্ন দলের প্রতিনিধি ছিলেন। এবারও তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সেই প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁরা এও বলছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে নির্বাচনকালীন সরকারে দলটির প্রতিনিধি রাখার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটা তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। এবার সেটা হওয়ার সম্ভাবনা কম।

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আলাপ-আলোচনার সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল অনেক নেতা। দলটির সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, ‘নির্বাচন এখনো অনেক দূরে। এ নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা হতে পারে। পর্দার অন্তরালেও সংলাপ হতে পারে। যদি সেখানে বিএনপি একমত হয়, তখন তাদের নির্বাচনকালীন সরকারে দেখা গেলেও যেতে পারে। তবে এটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান গতকাল মঙ্গলবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা তো বারবার বলেছি, সংবিধান মোতাবেক আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ সদস্যদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সংসদীয় রীতি আছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেও প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আগামী নির্বাচনেও এই ধরনের হতে পারে।’

বিএনপিকে নির্বাচনকালীন সরকারে রাখার জন্য আওয়ামী লীগ কোনো প্রস্তাব দেবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ফারুক খান বলেন, ‘বিএনপি যদি নির্বাচনকালীন সরকারে থাকতে চায়, তাদের উচিত হবে নির্বাচন কমিশনের কাছে যাওয়া। তারা সেখানে গিয়ে কোনো প্রস্তাব দিলে সেটা নিশ্চয়ই আমাদের কাছে আসবে। তখন আমরা ভেবে দেখব।’

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ক্ষমতাসীনদের এসব কথাবার্তায় কান না দিয়ে নিজেদের পথেই হাঁটছে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, তাঁরা সরকারকে সরানোর জন্য আন্দোলন করছেন। কাজেই নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ক্ষমতাসীনেরা কী বলছে না-বলছে, সেটা এই মুহূর্তে বিএনপির কাছে গুরুত্ব বহন করে না। এই সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না, এটাই শেষ কথা।

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগ কী করে না-করে, সেটা কোনো ব্যাপার না। আমরা একটা নিরপেক্ষ সরকার চাই। নির্বাচন হতে হবে একটা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।’ সংসদ থেকে বিএনপির সংসদ সদস্যদের পদত্যাগ করার সিদ্ধান্তও সঠিক ছিল বলে মনে করেন তিনি।

নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বলেন, বর্তমান সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নানা দিক থেকে চাপে রয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তিন দেশ সফরেও কোনো কিছু অর্জন হয়নি। যে কারণে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে নানা কিছু বলছে ক্ষমতাসীনেরা। জনগণের দাবিকে পাশ কাটাতে চাইছে তারা। তাদের ধারণা, এতে বিএনপির মনোবল ভাঙবে, চলমান আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হবে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাবকে ‘অবান্তর’ আখ্যা’ দিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘বিএনপি আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদকে উচ্ছেদ করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সেই পরিবেশ তৈরি করতে এবারও যা যা করা দরকার, তা-ই করবে বিএনপি।’

আর নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) ভাবনা জানতে চাইলে দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে আমরা প্রস্তাব ঠিক করতে পারব।’

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার কী হবে, সেটা সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। সেটা জানালেই আমরা মতামত দেব।’

বিষয়টি নিয়ে এখনো কিছু ভাবেননি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একাংশের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার। তিনি বলেন, ‘আগে সংসদে এটি নিয়ে আলোচনা হোক। তখন এটা নিয়ে চিন্তা করব।’

মতামত চাইলে বিকল্পধারার মহাসচিব আবদুল মান্নান বলেন, ‘এটা তো উনি (প্রধানমন্ত্রী) মাত্রই বললেন। এটার ওপর তিনি কী অ্যাকশন নেন, ওখানে আমাদের কী অপশন দেন, সেটা দেখতে হবে। তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’

প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে নতুন কেউ যুক্ত হবে বলে মনে করেন না জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক বশির আহমেদ। তিনি গতকাল বলেন, ‘এ বক্তব্যের মাধ্যমে সংসদে যেসব দল আছে, তাদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বাড়বে। কিন্তু বিএনপিসহ বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে আশ্বস্ত হবে বলে মনে করি না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত