Ajker Patrika

না, আমাদের আর দেখা হয়নি

সেলিম জাহান
আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৩, ০৯: ৩৩
না, আমাদের  আর দেখা হয়নি

১৯৭৫ সালের ১২ আগস্ট সন্ধ্যায় ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা, ওর সঙ্গে আমার শেষ ছবিও ওই দিনই। আমার এমএ পরীক্ষা চলছে তখন। অন্য সব পত্রের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে, বাকি আছে শুধু অর্থমিতির, যে বিষয়টি অঙ্কে ঠাসা। অতএব দিনরাত পরিশ্রম চলছিল বিষয়টি ঝালিয়ে নেওয়ার। অন্য সবকিছুকেই নীলডাউন করিয়ে রাখা হয়েছিল আমার সলিমুল্লাহ ছাত্রাবাসের ৪৮ নম্বর কক্ষের সামনে। আনন্দ, আড্ডা সব বন্ধ—মন কেন্দ্রীভূত শুধু ওই অর্থমিতি বিষয়টির ওপরে।

কিন্তু অন্য একটি ঘটনা ছিল। ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তহল বিতর্ক প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব সলিমুল্লাহ হল এবং সূর্য সেন হলের মধ্যে। আফতাব ভাই (প্রয়াত অধ্যাপক আফতাব আহমেদ) নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সূর্য সেন হলের এবং আমি সলিমুল্লাহ হলের। সামনের অর্থমিতির পরীক্ষা নিয়ে তখন আমার শিরেসংক্রান্তি, সুতরাং পরিষ্কার বলে দিলাম, চূড়ান্ত পর্বে বিতর্কে আমি অংশগ্রহণ করতেই পারব না, নেতৃত্ব দেওয়া তো দূর অস্ত! আমি প্রস্তাব দিলাম, দলের অন্য এক সদস্যকে দলনেতা করে অন্য আরেকজনকে দলে অন্তর্ভুক্ত করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

না, এত সহজে নিস্তার পাইনি এবং তার মূলে আমার সতীর্থ বন্ধু শেখ কামাল, সলিমুল্লাহ হলের অনাবাসিক ছাত্র ছিল সে। হলের ছাত্রদের উপর্যুপরি অনুরোধে ১২ আগস্ট বিকেলের দিকে সে আমার ঘরে অবস্থান নিল। উদ্দেশ্য, আমাকে পাহারা দিয়ে নিশ্চিত করা যে আমি পালাতে পারব না এবং ওই বিতর্কে আমি অংশ নেবই।

আজ প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে স্মৃতির আরশিতে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের আলোকোজ্জ্বল মিলনায়তন। করতালি, আনন্দ-চিৎকার আর উল্লাসে ফেটে পড়ছে মিলনায়তন। সবে ঘোষিত হয়েছে যে এক তীব্রতম প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরে সলিমুল্লাহ হল দ্বিতীয় আন্তহল বিতর্ক প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে সূর্য সেন হলকে হারিয়ে শিরোপা অর্জন করেছে। আমার সহ-বিতার্কিকেরা দলনেতা হিসেবে আমার হাত আঁকড়ে ধরেছে যুদ্ধ জয়ের গর্বে, আনন্দে, তৃপ্তিতে।

পুরস্কার প্রদানের পালাটির কথাও ভুলিনি। বিজয়ী দলের দলনেতা হিসেবে শিরোপা গ্রহণ করছি জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল মালেক উকিলের কাছ থেকে। পাশে সহাস্যে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল মতিন চৌধুরী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

পুরস্কার বিতরণ শেষে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মঞ্চ থেকে নেমে গেলে যেন বাঁধ ভেঙে গেল। তুমুল আনন্দ-নৃত্যে, গানে, উচ্চকণ্ঠ ধ্বনিতে ফেটে পড়ল সারা মিলনায়তন। তার নেতৃত্বে শেখ কামাল। সলিমুল্লাহ হলের একদল ছাত্র ততক্ষণে হইহই করতে করতে মঞ্চ দখল করে নিয়েছে। তাদের আনন্দ-চিৎকারে কান পাতা দায়, তাদের উদ্দাম নৃত্যে মিলনায়তন মঞ্চ টলটলায়মান। হঠাৎ অনুভব করলাম, আমি আর মঞ্চভূমিতে দাঁড়িয়ে নেই—উঠে গেছি একজনের কাঁধে—খুব সম্ভবত শক্তিমান সাদুর কাঁধে।

আমার ডান হাতে তখন কাঠ আর তামার তৈরি ভারী বিজয়-শিরোপা। তাই নিয়ে সাদুর কাঁধে আমি টলটলায়মান। বাঁ হাতে চেষ্টা করছি ওকে ধরে রাখতে। আমার অবস্থা দেখে মঞ্চের একেবারে পাশ ঘেঁষে ছুটে আসে কামাল। আমার হাত থেকে তুলে নেয় ওই ভারী শিরোপা তার বাঁ হাতে। ডান হাত উঁচু করে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে আমার ডান হাত, যেন আমার ভারসাম্য রক্ষিত হয়, যেন আমি পড়ে না যাই। ঠিক সে সময়েই ঝলকে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান চিত্রগ্রাহক প্রয়াত আজমল হকের (আমাদের সতীর্থ রোকেয়া মীনাক্ষী হকের বাবা) ক্যামেরা—তৈরি হয় ইতিহাস।

ওই তো ছবিতে হাস্যোজ্জ্বল শেখ কামাল। বাঁ হাতে তার আমাদের বিজয়-শিরোপাটি, ডান হাতে সে ধরে আছে আমার ডান হাত। কামাল দাঁড়িয়ে আছে মঞ্চের সামনে নিচে, আমি আসীন একজনের কাঁধে মঞ্চের ওপরে। মঞ্চ আর তার আশপাশে আনন্দে উদ্বেলিত সলিমুল্লাহ হলের ছাত্ররা।

আহা! এ ছবি তোলার ৪৮ ঘণ্টা পরেই তো কামালের জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে নৃশংস আততায়ীদের হাতে। খুব সম্ভবত এটাই ওর জীবনের শেষ ছবি। এ ছবি তো অমূল্য!
মনে আছে, সে রাতে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র থেকে কামাল আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন—চারদিকে সাজ সাজ রব। অপরাজেয় বাংলার স্থাপত্যে ঝাড়-পোঁছ চলছে, রং দেওয়া হচ্ছে, ঝাঁ ঝাঁ বাতি তার চারদিকে।

‘চল, চল, হামিদ ভাইয়ের তাজমহল দেখে আসি’, বলেছিল কামাল। ওই এক ঠাট্টা ছিল আমাদের। অপরাজেয় বাংলার স্থাপত্যের প্রতি সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ম. হামিদের নিবিড় টানের কারণেই আমরা এ নিয়ে হামিদ ভাইকে খ্যাপাতে চেষ্টা করতাম। হামিদ ভাই মিষ্টি হাসতেন। ১৬ আগস্ট আমার অর্থমিতি পরীক্ষা। আমি গাঁইগুঁই করছি দেখে কামাল লোভ দেখাল, ‘চল, চা খাওয়াব তোকে।’

না, ফেরাতে পারিনি ওকে। ও ছাড়ার পাত্র ছিল না, যেতেই হয়েছিল ওর সঙ্গে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে। হামিদ ভাইকে পেয়েছিলাম সেখানে, আর ভাগ্যক্রমে মিলে গিয়েছিল এক চা-ওয়ালা। দু-এক কথার পরে হামিদ ভাই তাঁর তদারকি-কর্মে ফেরত গিয়েছিলেন। কামাল আর আমি কিছু এলোমেলো গল্প করেছিলাম। একপর্যায়ে আমি উঠে পড়লাম। পরীক্ষা প্রস্তুতির তাড়া ছিল আমার। যখন চলে আসি, তখন কামাল আমার হাত ধরেছিল আনন্দের উদ্বেলতায়, বন্ধুত্বের উষ্ণতায়, সখ্যের মমত্বে। 

পরিষ্কার মনে আছে, বিদায় মুহূর্তে ও বলেছিল, ‘দেখা হবে।’

না, আর দেখা হয়নি আমাদের। কোনো দিন আর হবে না। সেদিন ১২ আগস্ট যখন ঝাপসা চোখে ছবিটির দিকে তাকিয়েছি, তখন মনে হয়েছে, সে রাতে কামালের এক হাত আমার ভার তুলে নিয়েছিল, অন্য হাত আমাকে ধরে রেখেছিল যেন আমি ভারসাম্য না হারাই, যেন আমি পড়ে না যাই। কিন্তু মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মাথায়, ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে হত্যাকারীর গুলি যখন ওর দিকে ছুটে গিয়েছে, ঝাঁঝরা করে দিয়েছে ওকে; ও যখন পড়ে গিয়েছিল, তখন তো ওকে আমি ধরতে পারিনি, ওকে তো আমি রক্ষা করতে পারিনি, ওকে আমি বাঁচাতে পারিনি।

কামাল, এ দুঃখ আমি কোথায় রাখি? এ লজ্জা আমি কী করে ঢাকি? পৃথিবীর কোন অন্ধকার গহ্বরে আমি লুকোব?

লেখক: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর ও দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত