Ajker Patrika

ওমর আলী সৌন্দর্য চেতনায় নিমগ্ন কবি

আহমেদ শমসের
ওমর আলী  সৌন্দর্য চেতনায় নিমগ্ন কবি

কবি ওমর আলী। নামটি হয়তো এখন বহুল উচ্চারিত নয়, কিন্তু একসময় তাঁর নাম বাংলাদেশের আলোচিত কবিদের সঙ্গেই উচ্চারিত হতো। কোনো বিশেষ ঘরানা বা রাজনৈতিক মতবাদের কারণে গোষ্ঠীবদ্ধ ছিলেন না। তিনি কবিতা দিয়েই পাঠককে আকৃষ্ট করতে পারতেন। তাঁকে স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের কবি বলা হয়ে থাকে। তাঁর মন ও মনন জুড়ে ছিল কবিতা। ৭৬ বছরের জীবনে তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ৪১টি। এর মধ্যে ৩৮টি কবিতার বই। এ ছাড়া একটি ছড়া ও দুটি উপন্যাস লিখেছেন।

ষাটের দশকের এ কবি মূলত প্রেম ও রোমান্টিকতা, নিসর্গ ও সৌন্দর্য চেতনায় নিমগ্ন ছিলেন। তিনি রোমান্টিক প্রেমের ও সৌন্দর্যচেতনার কবি হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। কাব্যের অনুষঙ্গ হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন নারী, নিসর্গ ও গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে। তার কবিতায় উপমা ও উৎপ্রেক্ষা অসাধারণ ও বিচিত্রতায় পরিপূর্ণ, যা শিল্প মাধুর্যে ভরপুর।

তিনি ‘এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি’ কাব্যটি রচনার জন্য ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং কাব্য সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।কবি ওমর আলীর জন্ম ১৯৩৯ সালের ২০ অক্টোবর, পাবনা জেলার সদর উপজেলার চরশিবরামপুর গ্রামে মাতুলালয়ে। ২০১৫ সালের ৩ ডিসেম্বর ৭৬ বছর বয়সে কবির জীবনাবসান ঘটে।

ওমর আলী শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। প্রথমে চরঘোষপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে পাবনা শহরের গোপালচন্দ্র ইনস্টিটিউশনে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এখানে তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর ঢাকার আরমানিটোলার হাম্মাদিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং এ স্কুল থেকে ১৯৫৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ১৯৬২ সালে উচ্চমাধ্যমিক, পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে বিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবার ১৯৭৫ সালে বাংলা সাহিত্যে এমএ পাস করেন।

কর্মজীবনে তিনি একসময় ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকার বার্তা বিভাগে সহসম্পাদক পদে কর্মরত ছিলেন। এই চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা শেষে ১৯৯৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন।তাঁর কবিতায় মানব-মানবীর ভালোবাসার বর্ণনা শিল্প মাধুর্যে ফুটে উঠেছে।

‘সেই নারী তুমি’ কবিতায় অকপটে বলেন-
তুমি সেই নারী, যাকে পৃথিবীর একটি পুরুষ
ভালোবেসে ডেকেছিল, এসো, তুমি প্রিয়তমা হবে।’

জন্মভূমির প্রতি ওমর আলীর ভালোবাসা অকৃত্রিম। মনেপ্রাণে তিনি জন্মভূমিকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই অপার সৌন্দর্যের দেশকে তিনি ব্যাকুলভাবে ভালোবেসেছেন। তিনি ভালোবেসেছেন আকাশ, নদী, বালুচর। এ দেশের সবুজ-শ্যামল রূপ, যা কবির মনকে আকুল করে। কবি টুনটুনি, দোয়েল পাখি দেখে অবাক হন। তিনি মনটাকে উজাড় করে দেখেন আর ভাবেন, আমন ধানের খেতে হাঁসগুলো কীভাবে যাওয়া-আসা করে! কীভাবে তারা খেলে! কীভাবে সাঁতার কাটে! কীভাবে বাঁশের ঝাড়ে সন্ধ্যার সময় পাখিরা কিচিরমিচির করে। কী অপরূপ দৃশ্যে সন্ধ্যা নেমে আসে।

 জন্মভূমির প্রতি কবির গভীর টান ফুটে উঠেছে তাঁর ‘জন্মভূমি’ কবিতায় :
ভালোবাসি জন্মভূমি তোমায় আমি ভালোবাসি
মন ভুলানো আকাশ নদী এবং সবুজ রূপের রাশি।
এতো তোমার পাখির কণ্ঠ এতো তোমার ফুলের সুবাস
এতো তোমার গাছগাছালি চির সবুজ রয় বারো মাস।

ছোট্ট পাখি উড়ার স্বপ্ন দেখে, নীড় খোঁজে, অনেক দূরে যেতে চায়। মানুষও তেমনি। তার সামনে অপার সম্ভাবনা। স্বপ্ন দেখে। তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। কবি ওমর আলীও মানুষের জীবন-দর্শন নিয়ে লিখেছেন, ঘেঁটে দেখেছেন, নেড়েচেড়ে দেখেছেন, দেখেছেন মানুষের জীবনপথের অলিগলি। সত্যের সন্ধান করেছেন। সৃষ্টিকে ভালোবেসেছেন। জীবনের রূপ-রসকে নন্দনতত্ত্বে প্রকাশ করেছেন। তাই তো তিনি কালোত্তীর্ণ জীবন-দর্শনের কবি।

লেখক: সাংবাদিক 

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত