
বিশ্বজুড়ে টুনা মাছের বাজারের বার্ষিক মূল্য ৪ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। আর বিশ্বের মোট উৎপাদিত টুনা মাছের অর্ধেকের বেশি জোগান দেয় প্রশান্ত মহাসাগর ও এর দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো।
এই মহাসাগরীয় অঞ্চলের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত ৩৩টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত রাষ্ট্র কিরিবাতি। দেশটির সরকারি আয়ের ৭০ শতাংশেরও বেশি আসে বিদেশি জাহাজ কোম্পানিগুলোর কাছে টুনা মাছ ধরার লাইসেন্স বিক্রি করে। বিশ্বের আর কোনো দেশে মৎস্য আহরণ থেকে আয়ের এমন উচ্চ হার দেখা যায় না।
কিরিবাতির স্থলভাগের আয়তন খুবই নগণ্য। সব কটি দ্বীপ একত্র করলে এর আয়তন হবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের সমান। তবে দেশটির নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চল বা এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের (ইইজেড) আওতাধীন সমুদ্রসীমা বিশাল।

গিলবার্ট, ফিনিক্স ও লাইন দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরে থাকা কিরিবাতির মোট সমুদ্রসীমার আয়তন ৩৪ লাখ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। সামগ্রিকভাবে এই আয়তন ভারতের চেয়েও বড়। সামুদ্রিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে স্কিপজ্যাক, ইয়োলোফিন ও বিগ আই নামে তিন প্রজাতির টুনা মাছ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।
যে সমুদ্র কিরিবাতির সংস্কৃতি, জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, সেই সমুদ্রই এখন দেশটির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় টুনা মাছের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। আর এতেই হুমকির মুখে পড়েছে কিরিবাতির অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, সমুদ্রের পানি উষ্ণ হতে থাকায় টুনা মাছ স্থায়ীভাবে কিরিবাতির সমুদ্রসীমা ছেড়ে পূর্ব দিকে শীতল পানির সন্ধানে চলে যেতে পারে। তেমনটি হলে বিদেশি জাহাজ কোম্পানিগুলোর কাছে লাইসেন্স বিক্রির চাহিদা কমে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশটির অর্থনীতিতে।
কিরিবাতির সমুদ্রসীমায় মাছ ধরতে হলে বিদেশি জাহাজগুলোকে প্রথমে সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। এরপর নির্ধারিত ফি পরিশোধের পাশাপাশি মাছ ধরার পরিমাণ ও তার হিসাব দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়। লাইসেন্স গ্রহণকারীদের মধ্যে জাপান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোই প্রধান।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মাছ ধরার লাইসেন্স বিক্রি করে ১৩৭ মিলিয়ন (১৩ কোটি ৭০ লাখ) ডলার আয় করেছে কিরিবাতি। দেশটির মৎস্য ও সামুদ্রিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রিবেতা আবেতা এই আয়কে দেশটির ‘আর্থিক লাইফলাইন’ বা টিকে থাকার প্রধান উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি আরও জানান, ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সরকারের মোট আয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এসেছে এই লাইসেন্স থেকে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, এটি কিরিবাতির মোট জিডিপির প্রায় দুই-পঞ্চমাংশের সমান।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কিরিবাতির মৎস্য খাত নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ সাইমন ডিফি বলেন, ‘পরের বার আপনি যখন সুপারমার্কেটে টুনা মাছের ক্যান দেখবেন, মনে রাখবেন সেখানে থাকা প্রতি ১০টি ক্যানের ৫টিই আসছে কিরিবাতিসহ পশ্চিম মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে।’
ডিফি জানান, এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দুই অংশীদার হলো কিরিবাতি ও পাপুয়া নিউগিনি। তবে পাপুয়া নিউগিনির স্থলভাগ ও অন্যান্য সম্পদ থাকায় তারা অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ পায়, যা কিরিবাতির নেই।

তিনি বলেন, ‘নারকেল গাছে চড়া ছাড়া কিরিবাতির সর্বোচ্চ উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২ মিটার। সেখানে মাছ ছাড়া আর কোনো পানি, জমি বা সম্পদ নেই।’
ডিফি আরও বলেন, টুনা মাছ পানির তাপমাত্রার সামান্য তারতম্যের প্রতিও অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় টুনা মাছ শীতল এলাকার দিকে চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই অভিবাসন হবে পূর্ব দিকে, যা কিরিবাতিসহ অনেক দ্বীপ রাষ্ট্র থেকে দূরে।
রিবেতা আবেতা বলেন, আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর লাইসেন্স কেনার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসার এই ঝুঁকি দেশের রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে।
আঞ্চলিক উন্নয়ন সংস্থা ‘প্যাসিফিক কমিউনিটি’র গত নভেম্বরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, টুনা মাছের এই স্থানান্তরের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় থাকবে কিরিবাতি।
কিরিবাতির মৎস্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্য মডেল অনুযায়ী, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশটি লাইসেন্স ফি বাবদ বছরে ১ কোটি ডলারের বেশি আয় হারাবে। তবে নির্গমন কমানো সম্ভব হলে মাছের সংখ্যায় কোনো পরিবর্তনের আশঙ্কা নেই।
অবশ্য প্যাসিফিক কমিউনিটির মতে, গ্যাস নির্গমন কম হোক বা বেশি, দুই ক্ষেত্রেই স্থানীয় জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। লাইন আইল্যান্ডস বা লাইন দ্বীপপুঞ্জ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেখানে মাছের প্রাপ্যতা দুই-তৃতীয়াংশ কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে কিরিবাতির ১ লাখ ৩০ হাজার জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে রাজধানী তারাওয়াতে দ্রুত নগরায়ণের ফলে সীমিত জমি ও সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সতর্ক করেছে যে, মাছের সরবরাহ কমায় মানুষ আমদানি করা খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে এবং পুষ্টির মান কমছে, কারণ ঐতিহাসিকভাবেই মাছ ছিল এসব দ্বীপবাসীর প্রোটিনের প্রধান উৎস।
প্যাসিফিক কমিউনিটির তথ্যমতে, কিরিবাতির একজন মানুষ বছরে গড়ে ১০০ কেজি মাছ খান। যেখানে জাপানে এই হার ২২ কেজি আর যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৯ কেজি।
এই সংকট মোকাবিলায় নতুন কিছু উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গত বছর জাতিসংঘের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) প্রশান্ত মহাসাগরীয় ১৪টি দেশের জন্য ১৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
জিসিএফ-এর এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক হেমন্ত মন্ডল বলেন, ‘এই প্রকল্প সঠিক তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করছে।’
এর লক্ষ্য হলো একটি শক্তিশালী সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে কিরিবাতির মতো দেশগুলো টুনা মাছের গতিবিধি এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব আগে থেকেই আঁচ করতে পারে। এ ছাড়া উপকূলীয় মাছের পরিমাণ কমে গেলেও যেন খাদ্য নিরাপত্তা ও রাজস্ব আয় বজায় থাকে, সেই প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
মৎস্য মন্ত্রণালয় জানায়, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কিরিবাতির মানুষের জন্য প্রতি বছর প্রায় ৪০ লাখ পুষ্টিকর মাছের মিল নিশ্চিত করা যাবে।
কিরিবাতি সরকার বলছে, তারা এখন শুধু লাইসেন্স বিক্রির ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব টুনা প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ক্যানিং ফ্যাক্টরি সম্প্রসারণ করছে। সচিব রিবেতা আবেতা জানান, রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে তারা মিল্কফিশ, স্ন্যাপার ও সামুদ্রিক শসার চাষ শুরু করেছেন।
এ ছাড়া নীল অর্থনীতির বাইরে পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অফশোর সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
আবেতা বলেন, ‘কিরিবাতি এখনো আশাবাদী হওয়ার মতো কৌশলগত সুযোগ দেখছে।’
তবে এই আশার মাঝেও জলবায়ু পরিবর্তন কিরিবাতি এবং এর বিশাল জলসীমার জন্য এক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতকাল বিকেলের পর আজ ভোরে বেশ ঝড়-বৃষ্টি দেখল ঢাকা। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আজ সোমবার ঢাকায় বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ সময় তাপমাত্রাও সামান্য কমতে পারে।
৪ ঘণ্টা আগে
কয়েক দিনের অস্বস্তিদায়ক ভ্যাপসা গরমের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে জনজীবনে। রাজধানীসহ অনেক এলাকায় আজ রোববার বিকেল থেকেই দমকা হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হচ্ছে, ফলে অনেকাংশে কমেছে তাপমাত্রা। সেই সঙ্গে তৈরি হয়েছে কালবৈশাখী ঝড়ের আশঙ্কা...
২০ ঘণ্টা আগে
টানা কয়েক দিনের তীব্র খরতাপের পর স্বস্তির সংবাদ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আজ রোববার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে তারা। একই সঙ্গে পরবর্তী চার দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির প্রবণতা বজায় থাকবে বলে জানিয়েছে তারা।
১ দিন আগে
কর্কট ক্রান্তি বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও পাবনা অঞ্চলের ওপর দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। প্রতিবছরের এই সময় (এপ্রিল-মে) মাসে উত্তর গোলার্ধের এই অঞ্চলে সূর্য কিরণ বেশ কাছ থেকে এসে পড়ে। এর উত্তাপও বেশি থাকে। ফলে এসব অঞ্চলে তাপপ্রবাহ বয়ে যায়।
২ দিন আগে