জলবায়ু রক্ষাকারী গাছের লাখো বীজ ছড়িয়ে দিচ্ছে ড্রোন

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ম্যানগ্রোভ বন। উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমানো এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণের সক্ষমতার কারণে এই বনকে বলা হচ্ছে ‘জলবায়ুর নায়ক’। এবার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধারে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আবুধাবি।
ম্যানগ্রোভ মূলত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের উপকূলীয় জোয়ার-ভাটার এলাকায় জন্মানো একধরনের বৃক্ষ ও গুল্ম। লবণাক্ত পানি, অক্সিজেনস্বল্প কাদা এবং জোয়ার-ভাটার পরিবর্তনশীল পরিবেশেও টিকে থাকার বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে এসব উদ্ভিদের। বিশ্বে ম্যানগ্রোভের ৫০ টির বেশি প্রকৃত প্রজাতি রয়েছে।
ম্যানগ্রোভ বন সামুদ্রিক ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩৪০টি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই বনের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি ঝড়ের ঢেউয়ের তীব্রতা কমানো, জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা হ্রাস এবং উপকূলীয় ভূমিক্ষয় প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ম্যানগ্রোভের শিকড়।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও এর অবদান উল্লেখযোগ্য। সাধারণ স্থলভাগের বনের তুলনায় চার গুণের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ও সংরক্ষণ করতে পারে ম্যানগ্রোভ। ম্যানগ্রোভ অ্যালায়েন্সের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এসব বন প্রায় ২১ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড জমা করে রেখেছে।
আবুধাবি পরিবেশ সংস্থার সামুদ্রিক বিজ্ঞানী আমনা আলমানসুরি বলেন, জলবায়ু সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে ম্যানগ্রোভকে প্রকৃতির নায়ক বলা যায়।
১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে আবুধাবিতে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ শুরু হয়। তেলনির্ভর অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে দ্রুত নগরায়ণের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ম্যানগ্রোভ বন কমে গিয়েছিল। তৎকালীন শাসক শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান বন সংরক্ষণ ও নতুন করে গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু করেন।
ম্যানগ্রোভ অ্যালায়েন্সের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বিশ্বে ম্যানগ্রোভের পরিমাণ ৩৫ শতাংশ কমে যায়। তবে আবুধাবিতে ১৯৮৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ম্যানগ্রোভের বিস্তার বেড়েছে ৯২ শতাংশ। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৭ হাজার ৬০০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে।
এই বন সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হচ্ছে বিশেষভাবে তৈরি ড্রোন। ২০২৩ সালে আবুধাবি ম্যানগ্রোভ ইনিশিয়েটিভ ছয় মিলিয়নের বেশি বীজ ছড়িয়ে দেয় ড্রোনের মাধ্যমে। প্রতিটি ড্রোন একসঙ্গে প্রায় ছয় হাজার বীজ বহন করতে পারে। দুর্গম ও জোয়ার-ভাটাপ্রবণ এলাকায় মানুষের সরাসরি প্রবেশ ছাড়াই বীজ ছড়িয়ে দেওয়ায় প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতিও কম হয়।
তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ম্যানগ্রোভের জন্য বড় হুমকি। অতিরিক্ত পানিতে গাছ ডুবে যেতে পারে, আবার পর্যাপ্ত পানি না থাকলেও স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এ কারণে বিদ্যমান বন সংরক্ষণের পাশাপাশি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও উপযুক্ত জলীয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে নতুন গবেষণা শুরু হয়েছে।
২০৩০ সালের মধ্যে ১০ কোটি ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে ইউএইর। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের মতে, শুধু বনভূমির আয়তন বাড়ানো নয়, দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও টেকসই ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।









