বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ী বাস তাঁর। বেঁচে থাকলে আজ ৩ সেপ্টেম্বর ১০০ বছর বয়সে পা রাখতেন উত্তমকুমার। জন্মশতবর্ষ পেরিয়েও তাঁর ব্যক্তিত্ব, অভিনয়ক্ষমতা, সংগ্রাম, প্রভাব, সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা—সবই এখনো বাঙালির নিত্যদিনের চর্চার বিষয়।

ভবানীপুরের মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। ছোটবেলায় থিয়েটার দেখে অভিনয়ের প্রতি ভালো লাগা, লুকিয়ে রিহার্সাল দেখা, পরে যুক্ত হয়ে যাওয়া পাড়া আর স্কুলের নাটকের সঙ্গে এবং এভাবে অভিনয়ের প্রেমে বিভোর হয়ে যাওয়া সেই ছিপছিপে গড়নের ছেলেটি নেহাতই ঝোঁকের মাথায় ঢুকে পড়েছিলেন চলচ্চিত্রে। তখন তাঁর বাচনভঙ্গিতে সামান্য জড়তাও ছিল। সেই ত্রুটি কাটিয়ে ওঠার জন্য দিনের পর দিন পরিশ্রম। এক ছিমছাম ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ছেলে চোখে কল্পনার রঙিন চশমা লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে স্টুডিও পাড়ায়—এটা ব্যতিক্রম কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু উত্তমকুমারের মধ্যে যেটা স্বতন্ত্র ব্যাপার ছিল, সেটা হলো তাঁর লেগে থাকা, দিনের পর দিন নিজেকে তৈরি করে নেওয়া এবং লক্ষ্যে একলব্যের মতো একাগ্র থাকা।
একসময় উত্তমকুমার টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়া চষে বেড়িয়েছেন একটু সুযোগের আশায়। এই অধ্যবসায়ের তাৎক্ষণিক ফল প্রথম দিকের যে সিনেমাগুলো, তার প্রায় সব কটাতেই তিনি ব্যর্থ হন। ব্যর্থতা দিয়েই শুরু হয়েছিল তাঁর পথচলা। সিনেমায় উত্তমের প্রথম আত্মপ্রকাশ ১৯৪৮ সালে—‘দৃষ্টিদান’ সিনেমায়। এতে তিনি নায়ক নন, ছিলেন পার্শ্বচরিত্রে। সিনেমা ফ্লপ হয়। পরের বছর পর্দায় নায়ক হিসেবে দেখা দেন ‘কামনা’ সিনেমা দিয়ে। সেটিও ব্যর্থ। ‘মর্যাদা’ সিনেমায় নাম পাল্টে অরূপ কুমার নামে অভিনয় করেন। কিন্তু নাম বদলালেও ভাগ্য বদলায়নি।
‘সহযাত্রী’, ‘ওরে যাত্রী’, ‘নষ্টনীড়’, ‘সঞ্জীবনী’—টানা ফ্লপের কারণে তাঁকে একটা সময়ে প্রযোজকেরা নিতেই চাইতেন না। তাঁর নামের পাশে বসে গিয়েছিল ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ তকমা। কিন্তু কোনো দিনই ধৈর্য হারাননি। তাঁর মূলধন ছিল ধৈর্য আর বিনয়। পরিচালক সুকুমার দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, উত্তমকুমারের স্বভাবে কোনো দিনই বিরক্তি বা ঔদ্ধত্য দেখা যায়নি। বরং সবার সঙ্গে এমন মধুর ও আন্তরিক ব্যবহার করতেন, দারোয়ান কিংবা প্রোডাকশন বয় থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি পর্যন্ত তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতেন। অভিনয়ের সময় তিনি ছিলেন ছাত্রের মতো। অভিনয় শেখার প্রতি ছিল অবিচল নিষ্ঠা।
১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ দিয়ে আলোর দেখা পান উত্তম। ১৯৫৪ সালে ‘চাঁপাডাঙ্গার বউ’, ‘সদানন্দের মেলা’, ‘ওরা থাকে ওধারে’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘কল্যাণী’সহ তাঁর একগুচ্ছ সিনেমা মুক্তি পায়। এ বছর থেকেই উত্তমকুমারের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরতে শুরু করে। পঞ্চাশের দশকে বাংলা সিনেমা গ্ল্যামারের প্রতিযোগিতায় হিন্দির কাছে নিশ্চিতভাবে হেরে যাচ্ছিল। দর্শকদের ভালো লাগাকে মুগ্ধতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তখনকার বাংলা সিনেমার ছিল না। ঠিক এই পটভূমিতে আসে অগ্রদূতের পরিচালনায় ‘অগ্নিপরীক্ষা’। নায়ক উত্তমকুমার, নায়িকা সুচিত্রা সেন। প্রায় ম্যাজিকের মতো ফল পাওয়া যায় এই সিনেমা থেকে। নায়ক থেকে মহানায়কের শীর্ষ আসনটিতে উত্তরণের সঠিক যাত্রারম্ভ হয় অগ্নিপরীক্ষা থেকে। বাঙালি দর্শক তাঁদের আইডিয়াল একজন রোমান্টিক হিরোকে খুঁজে পান উত্তমকুমারের মধ্যে।
পঞ্চাশের দশকের প্রায় মধ্যভাগ থেকে দর্শক, প্রযোজক, পরিবেশক ও পরিচালকদের দৃষ্টি কেড়ে নিতে লাগলেন উত্তমকুমার। বক্স অফিসের নিশ্চিত গ্যারান্টি হয়ে উঠলেন। এই দশকে মুক্তি পায় ‘গৃহপ্রবেশ’, ‘মন্ত্রশক্তি’, ‘মরণের পরে’, ‘রাইকমল’, ‘শাপমোচন’, ‘সবার উপরে’, ‘সাগরিকা’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘চিরকুমার সভা’, ‘একটি রাত’, ‘শ্যামলী’, ‘ত্রিযামা’, ‘শিল্পী’, ‘নবজন্ম’, ‘পৃথিবী আমারে চায়’, ‘তাসের দেশ’, ‘হারানো সুর’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘বিচারক’সহ কালজয়ী সব সিনেমা।
প্রায় একই রকম অবস্থা ষাটের দশকেও। ভালো-মন্দ-মাঝারি সব মিলিয়ে তিনিই সর্বোচ্চ সিনেমার মুখ্য ভূমিকায়। শুধু রোমান্টিক নায়কের ভূমিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, মদ্যপ জমিদার থেকে ছিঁচকে চোর—বহু ভূমিকাতেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। এই দশকেই উত্তমকুমারের জীবনে আরও একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ও ‘চিড়িয়াখানা’ সিনেমায় অভিনয় করেন। তাঁর অভিনয়ের ব্যপ্তি ও বিশালতা যে কত দূর যেতে পারে, তা প্রমাণ করে দেয় এই দুটি সিনেমা। ষাটের দশকের সাফল্যের পর সত্তরের দশকেও অবস্থা অপরিবর্তিত থাকে। একটানা সাফল্যের জয়রথটা সাময়িকভাবে কখনো যে একটু থমকে দাঁড়ায়নি, এমন নয়। কিন্তু সেই থামাটা পথের ওপর দাগ না ফেলতেই জয়রথ আবার গতি পেয়েছে।
১৯৮০ সালে আচমকা তাঁর প্রস্থান স্তব্ধ করে দিয়েছিল বাংলা সিনেমাকে। কিন্তু সময় কিংবা মৃত্যু—কোনোটিই বাঙালির হৃদয় থেকে উত্তমকুমারকে দূরে সরাতে পারেনি। জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়েও তাঁর সেই চিরচেনা জাদুকরি হাসি, নিখুঁত বাচনভঙ্গি আর রোমান্টিক রাজকীয় আবেদন বিন্দুমাত্র মলিন হয়নি। সিনেমা হলের রুপালি পর্দা থেকে হালের ওটিটি—আজও মধ্যবিত্ত বাঙালির আবেগ, ভালোবাসা আর নস্টালজিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি। জন্মশতবর্ষ পেরিয়েও মহানায়কের সিংহাসনে উত্তমকুমার একা, অপরাজিত ও চিরভাস্বর।
জন্ম
প্রথম অভিনয়
চাকরি
গান শেখা
প্রথম সিনেমা
বিয়ে
প্রথম নায়ক
প্রথম হিট সিনেমা
চাকরি ত্যাগ
সুচিত্রার সঙ্গে শুরু
প্রথম পেশাদার মঞ্চ
প্রথম প্লেব্যাক
প্রথম প্রযোজনা
প্রথম রঙিন সিনেমা
পিতৃবিয়োগ
প্রথম পরিচালনা
প্রথম সংগীত পরিচালনা
প্রথম বিদেশ যাত্রা
প্রথম হিন্দি সিনেমা
জাতীয় পুরস্কার
নাগরিক সংবর্ধনা
তথ্যচিত্রে কণ্ঠ
মৃত্যু
উকিল চরিত্রে

তত দিনে উত্তমকুমার বাংলা ইন্ডাস্ট্রির একচ্ছত্র নায়ক। যে সিনেমাই মুক্তি পাচ্ছে, ঢেউয়ের মতো দর্শকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে প্রেক্ষাগৃহে। সেই আবহে ১৯৫৬ সালে এল দেবকী বসু পরিচালিত ‘নবজন্ম’। এতে নতুন চমক নিয়ে এলেন মহানায়ক। সেই প্রথম দেখা গেল, সাতটি বৈষ্ণব পদাবলি নচিকেতা ঘোষের সুরে নিজেই গেয়েছেন উত্তম। গানগুলো ভা
৩ ঘণ্টা আগে
১৯৫৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমায় প্রথমবার পর্দায় একসঙ্গে অভিনয় করেন উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন। উত্তম কিংবা সুচিত্রা কেউই প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেননি। তবে দুজনের অভিনয় নজর কাড়ে সবার। ১৯৫৪-তে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ সিনেমায় জনপ্রিয়তা পায় উত্তম-সুচিত্রা জুটি। সময়ের পরিক্রমায় তাঁরা হয়ে ওঠেন কালজয়ী
৩ ঘণ্টা আগে
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমায় প্রথমবার বড় পর্দায় একসঙ্গে কাজ করেন শরিফুল রাজ ও সাবিলা নূর। আবারও প্রেক্ষাগৃহে ফিরছে এই জুটি। প্রথম সিনেমায় দুজন অপরিচিত মানুষের চরিত্রে অভিনয় করলেও এবার তাঁরা হাজির হচ্ছেন দম্পতির চরিত্রে। ‘কানাভুলা প্যারাডক্স’ নামের সিনেমাটি নির্মিত হচ্ছে...
১ দিন আগে
সম্প্রতি সাদিকা পারভীন পপির একটি বক্তব্যকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। সেই বক্তব্যের বিষয়বস্তু পরিষ্কার করে পপি জানালেন, এর সঙ্গে সিনেমা ছাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। গল্প ভালো লাগলে তিনি সিনেমা প্রযোজনায় নামবেন, এমনকি সময়-সুযোগ পেলে অভিনয়ও করবেন।
১ দিন আগে