স্বপ্ন ছিল যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার। সেই স্বপ্নপূরণে একে একে ই-মেইল করেছেন ছয় শতাধিক অধ্যাপককে। অপেক্ষা করেছেন, হয়েছেন প্রত্যাখ্যানও। তবু হাল ছাড়েননি। অবশেষে ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের ফল পেয়েছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ৪৫তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম সাদ। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন মিসিসিপিতে পলিমার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে সম্পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডির সুযোগ পেয়েছেন তিনি। পাশাপাশি পেয়েছেন গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজের সুযোগ।
বুটেক্সে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা
বুটেক্সে পড়াশোনার সময় শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না সাদ; আবাসিক জীবন, সাংগঠনিক দায়িত্ব ও সহশিক্ষা কার্যক্রম তাঁকে বাস্তব জীবনের নানা পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষ করে তুলেছে। বুটেক্স ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ক্লাবের সহসভাপতি, ডিবেটিং ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক, ক্যারিয়ার ক্লাবের ম্যানেজার অব প্রোগ্রাম এবং হাল্ট প্রাইজের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর অব কমিউনিকেশন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। যুক্ত ছিলেন টেক্সটাইল-বিষয়ক অনলাইন গণমাধ্যম বুননের কার্যক্রমেও।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ‘টেক্সটাইল টুডে’র উদ্ভাবন শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেছেন। এর মাধ্যমে টেক্সটাইল শিল্প সম্পর্কেও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন তাঁর জন্য হয়ে ওঠে পড়াশোনা, নেতৃত্ব ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের এক সমন্বিত ক্ষেত্র।
তৃতীয় বর্ষ থেকে প্রস্তুতি
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে থাকতে বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করেন সাদ। গবেষণার প্রতি আগ্রহ থেকে চতুর্থ বর্ষে একাডেমিক প্রকল্প, গবেষণাপত্র প্রকাশের কাজ এবং আইইএলটিএস প্রস্তুতি একসঙ্গে চালিয়ে যান। এ সময় কার্বন ন্যানোটিউব নিয়ে তাঁর একটি গবেষণাপত্র স্বনামধন্য কিউ১ জার্নালে প্রকাশিত হয়। আইইএলটিএস পরীক্ষায় অর্জন করেন ৭.৫ ব্যান্ড স্কোর। পরবর্তী সময়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদনে এসব অভিজ্ঞতা তাঁর প্রোফাইলকে সমৃদ্ধ করে।
৬০০ ই-মেইলের পর সাফল্য
স্নাতক শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডির সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন সাদ। নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপক নির্বাচন করেন। এরপর ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন ছয় শতাধিক অধ্যাপকের সঙ্গে। দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ায় অনেক জায়গা থেকে সাড়া পাননি। কোথাও আবার অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
অবশেষে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন মিসিসিপিতে পলিমার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে সম্পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডির সুযোগ পান তিনি। গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজের সুযোগও মিলেছে তাঁর।
পূর্ণ অর্থায়নে পড়াশোনা
এই সুযোগের আওতায় সাদের টিউশন ফি মওকুফ করা হয়েছে, পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের জন্য দেওয়া হবে মাসিক সম্মানী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিমার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগটি গবেষণার জন্য সুপরিচিত। বহুজাতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থার সঙ্গে বিভাগটির যোগাযোগ রয়েছে। ফলে ইন্ডাস্ট্রি-স্পনসরড গবেষণা, যৌথ প্রকল্প ও ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে শিল্পক্ষেত্রের বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজের সুযোগ পাবেন শিক্ষার্থীরা।
শুধু সিজিপিএ নয়, গবেষণাও জরুরি
সাদের মতে, বিদেশে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডির সুযোগ পেতে শুধু সিজিপিএ কিংবা আইইএলটিএস স্কোর যথেষ্ট নয়। গবেষণার অভিজ্ঞতা, মানসম্মত গবেষণাপত্র, শক্তিশালী স্টেটমেন্ট অব পারপাস (এসওপি) এবং ভালো রেকমেন্ডেশন লেটারও প্রয়োজন। যে অধ্যাপকের অধীনে গবেষণা করতে আগ্রহী, তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা নেওয়া উচিত।
তাঁর বিভাগে আবেদনের জন্য একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, তিনটি রেকমেন্ডেশন লেটার, স্টেটমেন্ট অব পারপাস এবং আইইএলটিএস বা টোফেল স্কোর প্রয়োজন হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি স্নাতক থেকে পিএইচডিতে আবেদনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম জিপিএ ২.৭৫ এবং আইইএলটিএস স্কোর ৬.০ থাকতে হয়।
নতুনদের জন্য পরামর্শ
সাদের এই পথচলায় পরিবারের মানসিক সমর্থন ও শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা ছিল বড় প্রেরণা। দীর্ঘ আবেদনপ্রক্রিয়া, প্রত্যাখ্যান এবং অর্থায়নের অনিশ্চয়তা সামলেও তিনি লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন।
বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী টেক্সটাইল শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, শেষ বর্ষের আগেই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং মানসম্মত গবেষণাপত্র প্রকাশের চেষ্টা করা। পাশাপাশি ভালো সিজিপিএ বজায় রাখা, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বাড়ানো এবং আইইএলটিএসে ৭.০ বা তার বেশি স্কোরের লক্ষ্য রাখা উচিত।
পলিমার সায়েন্স ও ম্যাটেরিয়াল সায়েন্সের মতো আন্তবিষয়ক গবেষণাক্ষেত্র সম্পর্কে জানার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও কারিগরি দক্ষতা অর্জন করতে হবে। নিজের গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে মিল রেখে অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা সহকারী, শিক্ষকতা সহকারী ও ফেলোশিপের সুযোগ খুঁজতে হবে। শিক্ষকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে গবেষণাভিত্তিক যোগাযোগ গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন সাদ।
ছয় শতাধিক ই-মেইল, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং নানা অনিশ্চয়তা পেরিয়ে সাদের এই অর্জন প্রমাণ করে, সঠিক প্রস্তুতি, ধৈর্য ও নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা থাকলে স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।










