Ajker Patrika

শিক্ষায় ৬ হাজার কোটির প্রকল্প

রাহুল শর্মা, ঢাকা
শিক্ষায় ৬ হাজার কোটির প্রকল্প

মাধ্যমিক, মাদ্রাসা, কারিগরি ও প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে প্রায় ৫ লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া আইসিটি ও টেকনোলজি ল্যাব স্থাপন এবং আধুনিক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৫ হাজারের বেশি শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ ও সংস্কার করা হবে।

প্রস্তাবিত ‘নেক্সটজেন সেকেন্ডারি এডুকেশন প্রোগ্রাম’ প্রকল্পের আওতায় এসব কাজ করা হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নের এই বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৫৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরে ৩ হাজার ৩৯৭ কোটির কিছু বেশি, মাদ্রাসা ও কারিগরি স্তরে ২ হাজার ৩৭৩ কোটি এবং প্রাথমিক স্তরে ২৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পৃথক প্রাথমিক খসড়া প্রকল্প প্রস্তাব থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করবে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর। তবে প্রকল্প প্রস্তাবগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পগুলো অনুমোদন পেলে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় ধরনের অগ্রগতি হবে। কেননা, এ প্রকল্পের আওতায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। আর নতুন ভবন নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান শ্রেণিকক্ষ ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ ও সংস্কার করে ‘সক্রিয়’ শ্রেণিকক্ষে রূপান্তর করা হবে, যা এ প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য দিক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল গত বুধবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে বর্তমান সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শ্রেণিকক্ষ সংস্কার এবং অ্যাক্টিভ লার্নিং ক্লাসরুম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘এ প্রকল্পে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য দেশে কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে শিক্ষা লাভের পর কেউ বেকার না থাকে।’

সরকারের বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২৫ অনুযায়ী, দেশে ২৪ হাজার ১৪৭টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৬৮ জন। ৯ হাজার ২৯৬টি মাদ্রাসায় শিক্ষক ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৫ জন। আর ২ হাজার ৭৪৮টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন ৩২ হাজার ৮৬৪ জন। তিন স্তর মিলিয়ে শিক্ষকসংখ্যা ৬ লাখ ১০ হাজার ৬০৭ জন। পরিকল্পনা অনুযায়ী এর প্রায় ৮২ শতাংশ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

মাউশির তৈরি করা প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দুর্যোগ-সহনশীল শিক্ষণ-শিখন পরিবেশ উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ছাড়া শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) ড. সরদার মো. কেরামত আলী বলেন, ‘প্রকল্প প্রস্তাবগুলো বর্তমানে অনুমোদনের নানা ধাপে রয়েছে। বলা যায়, প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন এখনো চূড়ান্ত নয়।’

মাউশির খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরের ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৩ জন শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসকের জন্য দেশীয় ও বিদেশি পেশাগত উন্নয়ন প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে।

এরপর পৃষ্ঠা ২ কলাম ৪

এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫৩ কোটি ৬০ লাখ ২৮ হাজার ৪০০ টাকা। অন্যদিকে, মাদ্রাসা ও কারিগরি স্তরে অন্তত ১ লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এ খাতে ব্যয় হবে ১০০ কোটি টাকার বেশি। এর বাইরে বিভিন্ন স্তরে আরও ৩০ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসকদের বিভিন্ন ধাপে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রকল্প প্রস্তাবগুলোতে।

প্রস্তাবে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট ২ হাজার ৮৫টি শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ ও রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচিত ৪৯৫টি মাদ্রাসায় ১ হাজার ৪৮৫টি এবং ২০০টি এসএসসি (ভোকেশনাল) বিদ্যালয়ে ৬০০টি শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ ও রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি ৬৯৫টি স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ ও ৬৯৫টি আইসিটি ল্যাব স্থাপন করা হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানাগার ও ডিজিটাল সুবিধাসম্পন্ন শিক্ষকদের কমনরুম গড়ে তোলা হবে। কারিগরি শিক্ষার ১৪টি ট্রেডের জন্য তৈরি করা হবে ৫৭৬টি ডিজিটাল শিক্ষা কনটেন্ট।

আরও বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরে ৩ হাজার শ্রেণিকক্ষ ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের পাশাপাশি ৫ হাজার ২৫০টি শ্রেণিকক্ষকে জলবায়ু-সহনশীল মাল্টিমিডিয়া ও সক্রিয় শিখন উপযোগী শ্রেণিকক্ষে রূপান্তর করা হবে। এ ছাড়া ১ হাজার ৫০টি নির্বাচিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আইসিটি ল্যাব, ১ হাজার ৫০টি টেকনোলজি ল্যাব ও ১ হাজার ৫০টি ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং আসবাব সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

আর প্রাথমিক স্তরে সমন্বিত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালুর উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে প্রকল্প প্রস্তাবে। বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষার্থীদের দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থাভিত্তিক (জিআইএস) পরিবীক্ষণ কার্যক্রম সমন্বিত করা সম্ভব হবে।

শিক্ষাবিদেরা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের এসব উদ্যোগের পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তবে প্রশিক্ষণ যেন নামমাত্র না হয় এবং সব কার্যক্রম সুস্পষ্ট নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

জানতে চাইলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এ প্রশিক্ষণ যেন নামকাওয়াস্তে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর অন্যান্য উন্নয়নও হতে হবে পরিকল্পিত। অর্থাৎ সব কার্যক্রমই সুস্পষ্ট নীতিমালার আওতায় করতে হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত