Ajker Patrika

বাংলাদেশ ব্যাংক

বিক্ষোভে মনসুরের বিদায়, ব্যবসায়ী হলেন গভর্নর

  • আহসান মনসুরের উপদেষ্টাকে হেনস্তা।
  • মনসুরের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল।
  • ৪ বছরের জন্য গভর্নর হলেন মোস্তাকুর রহমান।
  • এটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিবর্তন: অর্থমন্ত্রী
বিশেষ প্রতিনিধি ও  নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২: ৩২
বিক্ষোভে মনসুরের বিদায়, ব্যবসায়ী হলেন গভর্নর
মো. মোস্তাকুর রহমান

গভর্নরের বিরুদ্ধে কর্মকর্তারা ‘স্বৈরাচারী আচরণ’ বন্ধের হুমকি দেওয়ার পরপরই গতকাল বুধবার ড. আহসান এইচ মনসুরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করেছে সরকার। তবে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে দপ্তর থেকে বের হয়ে চলে যান আহসান মনসুর। একই দিনে সরকার নতুন গভর্নর হিসেবে মো. মোস্তাকুর রহমানকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দিয়েছে।

গতকাল দুপুরে ‘সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে’, এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর হঠাৎ করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ত্যাগ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতেই নিয়োগ পাওয়া গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। চলে যাওয়ার সময় নতুন গভর্নর নিয়োগ ও তাঁর পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করিনি, তবে খবরে শুনেছি।’ এর বাইরে আর কিছু বলেননি তিনি।

সূত্র জানায়, সকালে নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে কার্যালয়ে আসেন আহসান এইচ মনসুর। এর মধ্যেই তাঁর অপসারণের খবর বিভিন্ন মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

এ খবর শোনার পর তিনি সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কথা না বলে তাৎক্ষণিকভাবে অফিস ত্যাগ করেন। তাঁর এই আকস্মিক প্রস্থান ঘিরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কিছুটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ৯ আগস্ট পদত্যাগ করেন। এরপর ১৩ আগস্ট আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়।

গতকাল গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের ‘স্বৈরাচারী আচরণ’ বন্ধের দাবিতে সর্বস্তরের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ব্যাংক ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের ব্যানারে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। তাঁরা দাবি না মানলে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে কলমবিরতির হুঁশিয়ারি দেন। এ সময় আন্দোলনকারীরা তিন কর্মকর্তার শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার, বদলির আদেশ বাতিলসহ একাধিক দাবি পূরণ না হলে আজ বৃহস্পতিবার থেকে কলমবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তাঁদের এই হুমকির ঘণ্টাখানেক পরই গভর্নর বেরিয়ে যান। বিকেলে তাঁর চুক্তি বাতিল করে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয় সরকার।

প্রতিবাদ সভায় অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘গভর্নর বিভিন্ন স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিয়েছেন। তার তীব্র নিন্দা জানাই। আমাদের তিনজনকে শোকজ নোটিশ দিয়েছেন। এর জবাব দেওয়ার আগেই বদলি করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি সমাধানের জন্য তাঁর কাছে গেলেও দেখা করেন না। তাই আমরা আমাদের শোকজ নোটিশ, বদলি প্রত্যাহারসহ অন্যান্য দাবিদাওয়া আজকের (গতকাল) মধ্যে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা চেয়েছি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু পেয়েছি স্বৈরশাসন। এই স্বৈরশাসনে আমরা থাকতে চাই না। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে ভরে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য কোনো কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে দেখি না। উনি ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে মনোবল ভেঙে দিচ্ছেন।’

এদিকে গভর্নর বের হয়ে যাওয়ার পর তাঁর উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকেও কার্যত ধাওয়া করে গাড়িতে তুলে দেন আন্দোলনরত কর্মকর্তারা।

কর্মকর্তাদের ‘মব সৃষ্টি’-সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নতুন সরকারের সময়ে এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয়, যা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে। কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা ও সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও ডেপুটি হেড অব বিএফআইইউ মফিজুর রহমান খান চৌধুরী বলেন, ‘সাত-আট মাস ধরে ন্যায্য দাবি উত্থাপন করেছি গভর্নরের কাছে। কিন্তু তিনি তা মানেননি। আজ তাই এই প্রতিবাদ সভার আয়োজন করতে হয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলন করে গভর্নরের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করা বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে।

গতকাল শোকজের পর বদলির আদেশ পাওয়া নীল দলের সাধারণ সম্পাদক এবং এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণের বদলি প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর গভর্নরের পিএস কামরুল ইসলামকে প্রধান কার্যালয় থেকে সদরঘাট অফিসে বদলি করা হয়। এ ছাড়া আরও চার পরিচালকের দপ্তরে রদবদল হয়েছে।

জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনের পরপরই আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা গভর্নরকে ‘স্বৈরাচারী’ আখ্যা দিয়ে দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগসহ একাধিক ইস্যুতে প্রশ্ন তোলেন।

নতুন গভর্নরের পরিচিতি

চার বছরের জন্য নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মোস্তাকুর রহমান বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্য এবং হেরা সোয়েটার্স নামে একটি পোশাক কারখানার মালিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।

মোস্তাকুর রহমান একজন অভিজ্ঞ কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএমএ) এবং সফল উদ্যোক্তা। পেশাগত জীবনে তাঁর ৩৩ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি মূলত করপোরেট ফাইন্যান্স, রপ্তানি অর্থনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক শাসন এবং আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ।

ব্যাংকিং, শিল্প অর্থায়ন এবং রপ্তানি অর্থ ব্যবস্থাপনায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রীর ব্যাখ্যা

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে নতুন গভর্নর নিয়োগের সিদ্ধান্ত ‘স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিবর্তন’। তাঁর ভাষায়, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই পরিবর্তন আসবে এবং তা চলমান থাকবে।

সচিবালয়ে সাংবাদিকেরা অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে জানতে চান, কোন বিবেচনায় গভর্নর পরিবর্তন করা হলো। জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিবেচনার তো কিছু নেই। একটি নতুন সরকার এসেছে। নতুন সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকার আছে। পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকেই হয়নি, আরও অনেক জায়গায় হচ্ছে এবং হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের কর্মসূচি ও নীতিগত দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য যেখানে প্রয়োজন, সেখানে পরিবর্তন আনা হবে। প্রয়োজনে আরও অনেক ক্ষেত্রেই এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত