Ajker Patrika

জ্বালানি সংকট এখন ইতিহাসের ৩ বৃহত্তম সংকটের সম্মিলিত আকারের চেয়েও বড়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
জ্বালানি সংকট এখন ইতিহাসের ৩ বৃহত্তম সংকটের সম্মিলিত আকারের চেয়েও বড়
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার পর ভেনেজুয়েলায় বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে

ইরানে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ১৯৭০-এর দশকের দুই দফা তেল সংকট এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের সম্মিলিত প্রভাবের সমতুল্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বেশিও। এমন সতর্কবার্তাই দিয়েছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

আইইএ-এর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেন, এই সংকটের প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ, এটি ‘বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণরসধারা’ হিসেবে বিবেচিত পেট্রোকেমিক্যাল, সার, সালফার এবং হিলিয়ামের মতো খাতের সরবরাহ ব্যাহত করছে।

আজ সোমবার অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিরোল বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে জ্বালানি বাজারে যে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে, তা শুরুতে বিশ্বনেতারা পুরোপুরি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি।

এই পরিস্থিতির কারণেই গত সপ্তাহে আইইএ হস্তক্ষেপ করে। তারা চাহিদা কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে বাড়ি থেকে কাজের সংখ্যা বাড়ানো, মহাসড়কে সাময়িকভাবে গতিসীমা কমানো এবং বিমান ভ্রমণ হ্রাসের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায়। বিরোল সতর্ক করেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ৪০টি জ্বালানি স্থাপনা মারাত্মক বা অত্যন্ত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হবে না।

তিনি বলেন, ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের দুই সংকটে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমে গিয়েছিল। আর রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস হারিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সংকট—যা ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের বোমাবর্ষণের মাধ্যমে শুরু হয়েছে—ইতোমধ্যেই প্রতিদিন ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল এবং প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাসের ঘাটতি সৃষ্টি করেছে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের সঙ্গে বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের বিরোল বলেন, ‘বর্তমান অবস্থায় এই সংকট দুইটি তেল সংকট এবং একটি গ্যাস সংকট—সব একসঙ্গে।’

এর আগে, ১১ মার্চ আইইএ তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে কৌশলগত মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ে। ২০২৬ সালের শুরুতে বৈশ্বিক তেলের বাজারে উদ্বৃত্ত ছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়, তা ঘাটতি ও বৈশ্বিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে আল্টিমেটাম দেন। তিনি সতর্ক করেন, তা না হলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে। এই সময়সীমা সোমবার গভীর রাতে শেষ হওয়ার কথা। বিরোল বলেন, প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই সমস্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হলো হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া।’

ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, তারা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জ্বালানি ও লবণমুক্তকরণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করবে। ট্রাম্প ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে প্রণালিতে সহায়তা না করার জন্য সমালোচনা করেছেন। রোববার জাপান জানায়, যুদ্ধবিরতি হলে তারা মাইন অপসারণে সামরিক বাহিনী পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

বিরোল জানান, তিনি এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার নেতাদের সঙ্গে আরও জরুরি তেল মজুত ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন। প্রথম ধাপে মোট মজুতের মাত্র ২০ শতাংশ ছাড়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে আমরা আরও তেল বাজারে দিতে পারি, অপরিশোধিত তেল ও পণ্য—দুটিই। এতে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হবে, কিন্তু এটি চূড়ান্ত সমাধান নয়। কেবল অর্থনীতির ওপর চাপ কিছুটা কমাবে।’

কী পরিস্থিতিতে নতুন করে তেল ছাড়া হবে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব, বাজার বিশ্লেষণ করব এবং সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করব।’

দেশগুলো যদি নিজেদের জ্বালানি মজুত রক্ষায় রক্ষণাত্মক অবস্থান নেয়, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কিনা—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, এশিয়ার কিছু দেশে এটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপে ডিজেল ও জেট জ্বালানির সরবরাহ পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে, যদিও কানাডা ও মেক্সিকোর বাড়তি উৎপাদন কিছুটা সহায়তা করবে। বিরোল সতর্ক করে বলেন, ‘এই সংকট যদি এভাবেই চলতে থাকে, তবে কোনো দেশই এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না। তাই বৈশ্বিক সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত