Ajker Patrika

ব্যাংকিং সেবায় আঞ্চলিক বৈষম্য প্রকট

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা
ব্যাংকিং সেবায় আঞ্চলিক বৈষম্য প্রকট
বাংলাদেশ ব্যাংক। ফাইল ছবি

দেশের সব অঞ্চলে ব্যাংকিং কার্যক্রমের বিস্তার সমান নয়। কোথাও ব্যাংকে জমা হচ্ছে বিপুল আমানত, বিতরণ হচ্ছে বেশির ভাগ ঋণ। আবার কোনো কোনো বিভাগে আমানত ও ঋণ—দুটির পরিমাণই খুব কম। ফলে ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার সুযোগেও অঞ্চলভেদে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগও এতে সীমিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট আমানতের ৬০ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং ঋণের ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশই ঢাকা বিভাগে কেন্দ্রীভূত। চট্টগ্রাম বিভাগকে হিসাবে নিলে দুই বিভাগে দেশের মোট আমানতের ৮১ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং ঋণের প্রায় ৮৭ শতাংশ রয়েছে। এর বিপরীতে, ময়মনসিংহে মোট আমানতের মাত্র ১ দশমিক ৭১ শতাংশ জমা রয়েছে। আর সিলেটে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দেশের মোট ঋণের মাত্র ১ দশমিক ০৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান ব্যাংকিং কার্যক্রমে অঞ্চলভেদে বৈষম্যের চিত্রই তুলে ধরে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুন প্রান্তিকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগেই জমা রয়েছে ১৩ লাখ ৩৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা, যা দেশের মোট আমানতের ৬০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আগের প্রান্তিকের তুলনায় এ বিভাগে আমানত বেড়েছে ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আবার ঢাকা বিভাগের মোট আমানতের ৫৪ দশমিক ৯৮ শতাংশই এসেছে শহরাঞ্চল থেকে।

অন্যদিকে, একই সময়ে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৮ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে বিতরণ করা হয়েছে ১২ লাখ ২৭ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশই এ বিভাগে কেন্দ্রীভূত। অর্থাৎ দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ব্যাংকঋণ যাচ্ছে ঢাকা বিভাগে। অন্য অঞ্চলগুলোতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ এর তুলনায় অনেক কম।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হওয়ায় দেশে ভারসাম্যহীন উন্নয়ন তৈরি হচ্ছে। ড. মুস্তফা কে মুজেরী সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক

আমানত ও ঋণ এ দুই ক্ষেত্রেই ঢাকার পর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। জুন শেষে এ বিভাগে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা, যা দেশের মোট আমানতের ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একই সময়ে ঋণের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৪৬ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। দুই বিভাগ মিলিয়ে দেশের মোট আমানতের ৮১ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং ঋণের ৮৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ কেন্দ্রীভূত।

বাকি বিভাগগুলোর চিত্র বেশ হতাশাজনক। খুলনা বিভাগে আমানতের পরিমাণ ৯৯ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা এবং ঋণের স্থিতি ৬৭ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। রাজশাহী বিভাগে আমানত ৯৪ হাজার ৩৭৫ কোটি এবং ঋণ ৬৬ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা। সিলেট বিভাগে আমানত রয়েছে ৮৮ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। তবে সেখানে ঋণের স্থিতি মাত্র ১৮ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা, যা দেশের মোট ঋণের ১ দশমিক ০৩ শতাংশ। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ বিভাগে আমানতের পরিমাণ সবচেয়ে কম, মোট আমানতের প্রায় ১ দশমিক ৭১ শতাংশ।

ব্যাংকিং কার্যক্রমের এই কেন্দ্রীভবন শুধু আমানত ও ঋণের পরিসংখ্যানের পার্থক্য নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভৌগোলিক অসমতারও প্রতিফলন। যেসব অঞ্চলে শিল্পকারখানা, বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট অফিস ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেশি, সেখানে ব্যাংকে আমানত জমার পাশাপাশি ঋণের চাহিদাও বেশি। বিপরীতে, শিল্প ও ব্যবসার পরিসর সীমিত হলে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কম থাকে। ফলে ওই অঞ্চলে ব্যাংকঋণের চাহিদা ও বিতরণ—দুটিই তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে।

ঢাকার ভেতরেও আমানত সংগ্রহ কয়েকটি বাণিজ্যিক এলাকায় কেন্দ্রীভূত। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মতিঝিলের পাশাপাশি গুলশানেও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের কারণে আমানতের পরিমাণ বাড়ছে। আমানতের দিক থেকে এরপর রয়েছে বনানী, ধানমন্ডি, পল্টন ও তেজগাঁও। অর্থাৎ দেশের ভেতরে বিভাগীয় বৈষম্যের পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মধ্যেও ব্যাংকিং কার্যক্রমের কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে।

জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হওয়ায় দেশে ভারসাম্যহীন উন্নয়ন তৈরি হচ্ছে। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের আশায় মানুষ এ দুই অঞ্চলে ছুটছে। এতে ঢাকায় জনসংখ্যার চাপ ও অচলাবস্থা বাড়ছে, অন্যদিকে অন্যান্য অঞ্চলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হচ্ছে না।

ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, সারা দেশে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উদ্যোক্তা তৈরিতে ব্যাংকগুলোর নজর বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত