Ajker Patrika

জ্বালানি ও ঋণ ছাড়া উন্নয়ন অসম্ভব

  • দ্বিগুণ মূল্যে গ্যাস কিনে শিল্প টিকিয়ে রাখা অসম্ভব।
  • সরকারের লক্ষ্য বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির।
  • আসছে ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’ উদ্যোগ।
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা জরুরি।
  • সরকারি ব্যয় কমাতে দরকার প্রশাসনিক সংস্কার।
‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
জ্বালানি ও ঋণ ছাড়া উন্নয়ন অসম্ভব
রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে গতকাল সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘উন্নয়নে নজর: স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে নবনির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে অতিথিরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

গ্যাস-সংযোগ পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা; ব্যাংকঋণে চড়া সুদ; খেলাপি ঋণের পাহাড়; বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে সংকোচন—এমন বাস্তবতায় নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্বপ্নকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলেই মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের বক্তব্য স্পষ্ট, জ্বালানি ও অর্থায়ন সংকট না কাটলে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তাঁরা সতর্ক করেছেন, শুধু প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারও টেকসই হবে না। তাই বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় আগামী বাজেট প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে গতকাল বুধবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে। সেমিনারের বিষয় ছিল ‘উন্নয়নে নজর: স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে নবনির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার’।

প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি জানান, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় শিগগির বড় পরিবর্তন আনা হবে। ভোগভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে সরে এসে বিনিয়োগনির্ভর টেকসই অর্থনৈতিক মডেলে যেতে চায় সরকার। পুঁজিবাজারকে বিনিয়োগ অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ‘এলটিইউ’ নির্ভরতা কমিয়ে কর সংস্কৃতির বিস্তার ঘটানোর কথাও জানান তিনি।

উপদেষ্টা বলেন, ২০০৯-২০২৪ সাল পর্যন্ত সৃষ্ট ঋণের পাহাড় অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করেছে। অপচয় রোধ ও রাজস্ব সংস্কারের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা হবে। সামাজিক সুরক্ষায় স্বচ্ছতা আনতে ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’ চালুর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। জ্বালানি খাতে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির বিষয় উল্লেখ করে রিনেগোসিয়েশন ও সিস্টেম লস কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এবং খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ সংশোধনের ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি এখন মূলত সরবরাহজনিত সমস্যা। তাই মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয় এবং বাজার তদারকি বাড়াতে হবে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ৩৫.৭ শতাংশে দাঁড়ালেও ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে ব্যাপক পুনঃ তফসিলের ফলে তা কিছুটা কমেছে।

ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের গড় হার এখন ৩৬ শতাংশ; সরকারি ব্যাংকে তা প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ মাত্র ৬ শতাংশ, অথচ মোট ঋণের ৩২ দশমিক ১৯ শতাংশ গেছে সরকারি খাতে। সরকারের ব্যয়ের ৫৮ শতাংশই বেতন, সুদ ও ভর্তুকিতে ব্যয় হচ্ছে এবং গত ছয় মাসে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যারা ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে না। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গ্যাসের সংকট প্রসঙ্গে এ কে আজাদ বলেন, হাজার হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংযোগের অপেক্ষায়। নিজে দ্বিগুণ মূল্য দিয়ে সিএনজি থেকে গ্যাস নিয়ে বয়লার চালাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এভাবে শিল্প টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। ১০ শতাংশ গ্যাস চোরাই পথে বিতরণ হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় নতুন শিল্প স্থাপন উচ্চাভিলাষী চিন্তা। দেশে ৩৫০টি গার্মেন্টস ও ৫০টির বেশি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়েছে। প্রতিটি টেক্সটাইল মিলে হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলেও মাত্র ২০০ কোটি টাকার সংকটে কারখানা বন্ধ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের অসহযোগিতায় ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা যায়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পুনঃ তফসিলের পাশাপাশি পুনঃ অর্থায়নের দাবি জানান।

এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে শওকত আজিজ রাসেল বলেন, সুবিধার চেয়ে বাস্তব চ্যালেঞ্জ বড় হয়ে উঠছে। বিদেশি বিনিয়োগ পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। সফট ঋণ ও বিদেশি সহায়তা কমার ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেন।

ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহ্‌ফুজ আনাম বলেন, ভালো নীতি গ্রহণ যথেষ্ট নয়; বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ায়। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে ডিজিটালাইজেশন বাড়ানোর প্রস্তাব দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু, পিআরআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ, এমআরএর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ, বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর প্রমুখ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত