Ajker Patrika

নাইকি ও অ্যাডিডাসের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে চীনা স্পোর্টস ব্র্যান্ড

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
নাইকি ও অ্যাডিডাসের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে চীনা স্পোর্টস ব্র্যান্ড
চীনের ব্র্যান্ড আজ লড়াই করছে নাইকি-অ্যাডিডাসের মতো বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে। ছবি: জেমিনি এআই

আশির দশকের শেষের দিকে চীনের অর্থনীতি যখন সবে উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে, তখন এক তরুণ উদ্যোক্তার গল্পও নীরবে শুরু হচ্ছিল। হাইস্কুলের পড়ালেখা ছেড়ে ৬০০ জোড়া জুতো নিয়ে বেইজিংয়ের পথে পা বাড়ান ডিং শিজং নামে ১৭ বছর বয়সী ওই তরুণ। জুতোগুলো তৈরি করিয়েছিলেন এক আত্মীয়ের কারখানায়। বেইজিংয়ে জুতোবিক্রির মধ্য দিয়ে যে স্বপ্নের শুরু হলো তার পরিণত রূপই আজ লড়াই করছে নাইকি-অ্যাডিডাসের মতো বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে।

শিজং ৬০০ জোড়া জুতো বিক্রি করে নিজের ওয়ার্কশপ খুললেন। তারপর সেখানে অন্য কোম্পানির জুতো বানানো শুরু করলেন। কমিউনিস্ট পার্টির কড়া নজরদারিতে চীনে যখন পুঁজিবাদের জয়যাত্রা শুরু হয়, ১৭ বছর বয়সী ডিং শিজং ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম উদীয়মান উদ্যোক্তা। তবে ডিংয়ের স্বপ্ন ছিল আরও অনেক বড়। তিনি চেয়েছিলেন একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড তৈরি করতে।

চীনে আন্তার ১০ হাজারের বেশি দোকান রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
চীনে আন্তার ১০ হাজারের বেশি দোকান রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

সেই স্বপ্নই আজ রূপ নিয়েছে ক্রীড়াসামগ্রীর জগতের জায়ান্ট-এ। নাম তার ‘আন্তা’ (Anta)। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ঝুলিতে ভরেছে আর্কটেরিক্স (Arc’teryx) ও সলোমনের (Salomon) মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড। অতি সম্প্রতি তারা নামি ব্র্যান্ড পুমার (Puma) শেয়ারও কিনেছে।

এখন আন্তা পাল্লা দিতে চাইছে নাইকি ও অ্যাডিডাসের মতো বৈশ্বিক জায়ান্টদের সঙ্গে। ২০০৫ সালে ডিং শিজং তাঁর লক্ষ্য স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘আমরা চীনের নাইকি হতে চাই না, আমরা হতে চাই বিশ্বের আন্তা।’

পাশ্চাত্যে আন্তা এখনো খুব পরিচিত নাম না হলেও চীনে তাদের ১০ হাজারের বেশি দোকান রয়েছে। ফ্রিস্টাইল স্কিয়ার আইলিন গু-র মতো শীর্ষ অ্যাথলেটদের পৃষ্ঠপোষকতা করে তারা। গত ফেব্রুয়ারিতে লস অ্যাঞ্জেলেসের অভিজাত এলাকা বেভারলি হিলসে তারা যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের প্রথম ফ্ল্যাগশিপ স্টোর খুলেছে।

আন্তার এই বিশ্বজয়ের প্রচেষ্টা এমন এক সময়ে আসছে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক আরোপের মাধ্যমে কলকারখানার কাজ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে আন্তার এই উত্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, উৎপাদনের ক্ষেত্রে চীনা সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) কতটা অপরিহার্য ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে।

‘আন্তা’ শব্দের অর্থ ‘নিরাপদ পদক্ষেপ’। এর উত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কয়েক দশক ধরে ‘বিশ্বের কারখানা’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় অনেক উচ্চাভিলাষী চীনা কোম্পানি সেই সব প্রতিষ্ঠানকেই চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পেয়েছে, যারা একসময় তাদের গ্রাহক ছিল।

জুতো প্রস্তুতকারক থেকে গ্লোবাল ব্র্যান্ড

১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তার শুরুটা বেভারলি হিলসের চাকচিক্য থেকে অনেক দূরে দক্ষিণ-পূর্ব ফুজিয়ান প্রদেশের জিনজিয়াং শহরের একটি ছোট কারখানা হিসেবে। সরকারের বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শান্ত কৃষিপ্রধান এলাকা জিনজিয়াং দ্রুত বিশ্বের ‘জুতো রাজধানী’তে পরিণত হয়।

উৎপাদন খরচ কমাতে বিদেশি নামি ব্র্যান্ডগুলো যখন কারখানার খোঁজে এখানে বিনিয়োগ শুরু করে, তখনই দৃশ্যপট বদলে যায়। জিনজিয়াং ও এর আশপাশের উপকূলীয় শহরগুলোতে জুতোর বিভিন্ন অংশের বিশেষায়িত সব সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

আন্তার বিদেশের বাজারে আছে মাত্র ৪৬০টি স্টোর আছে। ছবি: সংগৃহীত
আন্তার বিদেশের বাজারে আছে মাত্র ৪৬০টি স্টোর আছে। ছবি: সংগৃহীত

এই হাবের কেন্দ্রে ছিল চেন্দাই শহর। মাত্র ৪০ বর্গকিলোমিটারের এই এলাকায় গড়ে ওঠে হাজার হাজার কারখানা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। নাইকি ও অ্যাডিডাসের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের জুতো তৈরির মাধ্যমে শহরটির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ফিতে, তলা (সোল) ও কাপড়ের সরবরাহকারী থেকে শুরু করে লজিস্টিকস কোম্পানি সবই ছিল হাতের নাগালে। ফলে খুব দ্রুত নকশা থেকে জুতো তৈরি করে দোকানে পাঠানো সম্ভব হতো।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৫ সাল নাগাদ বিশ্বের মোট জুতোর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শুধু ফুজিয়ানেই তৈরি হতো। আজও জিনজিয়াংয়ের এক-তৃতীয়াংশ কর্মী জুতো তৈরির সঙ্গে যুক্ত।

চীনের পূর্ব উপকূলজুড়ে এমন অনেক শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠেছিল। বাথ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ফেই কিন বলেন, উৎপাদনের এই বিশেষায়ন ওই সময় বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায়নি। বিদেশি ক্রেতারা যখন এই কারখানাগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে শুরু করে, তখন চীনের আয় কেবল অর্থেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা শিখেছিল কীভাবে আরও ভালো মানের পণ্য দ্রুত ও ধারাবাহিকভাবে তৈরি করা যায়।

এই পরিবেশেই বড় হয়েছে আন্তা। তারা পাইকারি দরে সস্তায় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পণ্য তৈরি করত। পাশাপাশি তারা চীনজুড়ে খুচরা বিক্রেতাদের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। একই সঙ্গে ঘরোয়া বাজারে নিজেদের ব্র্যান্ডিং শুরু করে আন্তা; বিভিন্ন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পৃষ্ঠপোষকতা করে।

অধ্যাপক ফেই মনে করেন, আন্তার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জানত যে সাব-কন্ট্রাক্টর হওয়ার চেয়ে নিজেদের একটি ব্র্যান্ড হওয়া অনেক বেশি লাভজনক। ২০০৭ সালে আন্তা হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় এবং প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে, যা তৎকালীন সময়ে চীনের কোনো স্পোর্টস কোম্পানির জন্য রেকর্ড ছিল।

আন্তার বিদেশের বাজারে আছে মাত্র ৪৬০টি স্টোর আছে। ছবি: সংগৃহীত
আন্তার বিদেশের বাজারে আছে মাত্র ৪৬০টি স্টোর আছে। ছবি: সংগৃহীত

নাইকি ও কনভার্সের সঙ্গে কাজ করেছেন ব্র্যান্ডিং বিশেষজ্ঞ ওয়েই কান। তিনি বলেন, পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে দ্রুত জুতো ডিজাইন ও বাজারে আনতে পারত আন্তা। এটিই তাদের আলাদা করে চিনিয়েছে।

এরকম আরও উদাহরণ আছে। যেমন শাওমি (Xiaomi) সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে শুরু করলেও এখন ফোন, ইলেকট্রনিকস ও ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরি করছে। ডিজেআই (DJI) প্রথমে ক্যামেরার সরঞ্জাম বানালেও এখন ড্রোনের বাজারে বিশ্বসেরা। আর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো বিওয়াইডি (BYD)। প্রতিষ্ঠানটি একসময় এলন মাস্কের টেসলার ব্যাটারি বানাত, আর এখন তারা বিশ্বের শীর্ষ ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা।

এখন পাশ্চাত্যের বাজারের দিকে নজর আন্তার। চীনে তাদের ১২ হাজার দোকান থাকলেও বিদেশের বাজারে আছে মাত্র ৪৬০টি। তবে আগামী কয়েক বছরে কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই ১ হাজার দোকান খোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। অথচ বিশ্বের এক নম্বর ব্র্যান্ড নাইকির বিশ্বজুড়ে নিজস্ব দোকান আছে মাত্র ১ হাজার। যুক্তরাষ্ট্রেও তারা পা রেখেছে, লস অ্যাঞ্জেলেসের বেভারলি হিলসে খুলেছে প্রথম ফ্ল্যাগশিপ স্টোর।

তবে বিদেশের বাজারে বড় হওয়ার পথে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য প্রধান বাধা হলো নেতিবাচক ধারণা। অনেকেই চীনা পণ্যকে সস্তা, নিম্নমানের বা নকল মনে করেন। এই ধারণা ভাঙতে আন্তা ‘মাল্টি-ব্র্যান্ড স্ট্রাটেজি’ গ্রহণ করেছে। ২০০৯ সালে তারা ইতালীয় ব্র্যান্ড ফিলার (Fila) চীনা স্বত্ব কিনে নেয় এবং সেটিকে একটি সফল ব্যবসায় রূপান্তর করে।

২০১৯ সালে আন্তা ফিনল্যান্ডের অ্যাথলেটিকস ব্র্যান্ড আমের স্পোর্টস (Amer Sports) কিনে নেয়, যার অধীনে আর্কটেরিক্স ও সলোমনের মতো দামি ব্র্যান্ড রয়েছে। এছাড়া তারা মার্কিন টেনিস সরঞ্জাম নির্মাতা উইলসন ও জার্মান ব্র্যান্ড পুমার বড় অংশীদার। এই কৌশলে তারা সরাসরি ‘মেড ইন চায়না’ তকমা ব্যবহার না করে পাশ্চাত্যের সুপরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর মাধ্যমে বাজার ধরছে।

বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হওয়ার জন্য সেলিব্রিটি স্পনসরশিপ একটি জরুরি বিষয়। নাইকি আশির দশকে মাইকেল জর্ডানের সঙ্গে চুক্তি করে ইতিহাস গড়েছিল। আন্তা ক্লে থম্পসন বা কাইরি আরভিংয়ের মতো বাস্কেটবল তারকাদের সঙ্গে চুক্তি করলেও এখনো নাইকি বা অ্যাডিডাসের মতো বড় কোনো জোয়ার তৈরি করতে পারেনি।

এছাড়া চীনের সঙ্গে পাশ্চাত্যের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী রাজনৈতিক সম্পর্কও আন্তার জন্য একটি বড় বাধা। যেমন, তাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর আইলিন গু যখন অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্রের বদলে চীনকে প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তা নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বীরাও চাপে আছে। নাইকি ও অ্যাডিডাস যখন বিশ্বজুড়ে ও চীনের বাজারে শুল্ক, সরবরাহ ব্যয় এবং কমে যাওয়া চাহিদার মতো সংকটে পড়ছে, ঠিক তখনই আন্তার উত্থান ঘটছে। একই সঙ্গে চীন দ্রুত কারখানায় রোবট প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াচ্ছে, যা উৎপাদনকে আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী করে তুলতে পারে।

স্পোর্টস মার্কেটার ঝু মনে করেন, প্রতিযোগীদের এই দুর্বলতা আন্তার জন্য বড় সুযোগ। প্রশ্ন এখন এটা নয় যে আন্তা নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারবে কি না, বরং প্রশ্ন হলো প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাদের নিজেদের বাজার রক্ষা করতে পারবে কি না।

অন্যদিকে, কারখানায় রোবটের ব্যবহার বাড়িয়ে চীন ভবিষ্যতে উৎপাদনের খরচ আরও কমিয়ে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। লস অ্যাঞ্জেলেসে আন্তার স্টোরটি বাস্কেটবল ও স্নিকার্সের শেলফে ঠাসা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নাইকির সঙ্গে লড়াই করতে হলে এই দুটি খাতে জেতা আন্তার জন্য অপরিহার্য।

তবু অ্যান্টা নিজেই স্বীকার করে, পথ এখনো দীর্ঘ। তবে তারা এটাও বিশ্বাস করে, বৈশ্বিক ক্রীড়াপোশাক বাজারে জায়গা সবার জন্যই আছে। প্রতিষ্ঠানের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, ক্রীড়াপ্রেমীরা অ্যান্টার উদ্ভাবন ও ব্র্যান্ডের মূল্য বুঝতে পারবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

যুক্তরাষ্ট্রে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী খুন: মিথ্যা জবানবন্দি দিয়ে ধরা খেল খুনি, প্রকাশ্যে রোমহর্ষক তথ্য

ময়মনসিংহ মহানগর পুলিশ গঠনসহ ৭ দাবি পুলিশের

৩ দিনের মধ্যে বিস্ফোরিত হতে পারে ইরানের তেল অবকাঠামো: ট্রাম্প

চাঁদপুরে ডিসি অফিসে স্মারকলিপি দিতে গিয়ে হাতাহাতি, আহত ৪

কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তাকে চলন্ত অটোরিকশা থেকে ফেলে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা: র‍্যাব

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত