Ajker Patrika

বাবাই পৃথিবী আড়াই বছরের শিশু সানির

• অটোরিকশায় সন্তানকে নিয়ে অলিগলিতে ছুটে চলছেন রবিউল।

• মা রেখে যাওয়ায় বাবাই এখন তার একমাত্র আশ্রয়।

শাহীন রহমান, পাবনা
বাবাই পৃথিবী আড়াই বছরের শিশু সানির
আড়াই বছরের শিশুসন্তানকে নিজের কোমরের সঙ্গে বেঁধে অটোরিকশা চালান রবিউল ইসলাম। ছবিটি গত সোমবার পাবনা সদরের দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর থেকে তোলা। আজকের পত্রিকা

তাঁর দুই হাতে অটোরিকশার হাতল, আর কোমরের সঙ্গে গামছা দিয়ে বাঁধা ছোট্ট একটি শিশু। পাবনা শহরের অলিগলিতে ছুটে চলে অটোরিকশাটি। শিশুটি কখনো ফিডার থেকে দুধ খায়, আবার কখনো অবাক তাকিয়ে থাকে। এ দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হন অনেকেই।

ওই অটোচালক হলেন পাবনা সদর উপজেলার দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম। শিশুটি তাঁর আড়াই বছরের সন্তান। নাম আলফে সানি। অন্য শিশুদের মতো মায়ের আদর পাচ্ছে না সে। দুই বছর বয়স থেকেই মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত সে। বাবাই এখন তার একমাত্র আশ্রয়।

রবিউল ইসলাম জানান, পারিবারিকভাবে ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি তিনি বিয়ে করেন। ২০২৪ সালের ১ মে তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় আলফে সানি। পারিবারিক বিরোধে চলতি বছরের ৫ মে আলফে সানিকে রেখে চলে যান তার মা। তার পর থেকেই পুত্র সন্তানকে আগলে রাখছেন রবিউল।

শিশুসন্তানকে নিয়ে এ জীবনযুদ্ধ কখন থামবে জানেন না হতদরিদ্র রবিউল। দারিদ্র্যের কারণেই তাঁকে ও সন্তানকে রেখে প্রায় চয় মাস আগে স্ত্রী বাবার বাড়ি চলে গেছেন বলে জানান রবিউল। কয়েক দফায় চেষ্টা করেও তাঁকে ফেরাতে পারেননি। এ অবস্থায় প্রতিদিন সন্তানকে নিজের কোমরের সঙ্গে গামছা দিয়ে বেঁধে অটোরিকশা চালাতে নামেন তিনি। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে সন্তানকে যত্ন করেন মায়ের মতো।

সোমবার দুপুরে রবিউলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অটোরিকশা চালিয়ে বাড়ি ফিরেছেন তিনি। ছেলেকে খাওয়াচ্ছিলেন রবিউল। তারপর বাবা-ছেলে গোসল করেন। ভাঙাচোরা ছোট্ট ছাপড়া টিনের ঘরে বসবাস রবিউলের। নিজের বসতবাড়ি বা জমি বলতে কিছু নেই। খালাতো ভাইয়ের ছেলের ভাঙাচোরা দুটি টিনের ঘরে একটিতে শিশুসন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে তাঁর।

জানতে চাইলে রবিউল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন তিনি একটি সরিষার তেলের মিলে কাজ করতেন। পরে মিলটি বন্ধ হয়ে গেলে সংসারের খরচ চালাতে বাধ্য হয়ে অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। নিজের মায়ের কাছ থেকে পাওয়া আধা কাঠা জমি বিক্রি করে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে অটোরিকশাটি কেনেন। অটোরিকশা চালিয়ে প্রতিদিন তাঁর আয় হতো ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এ আয় দিয়ে ভালোই চলছিল সংসার। তবে গত ৫ মে হঠাৎ স্ত্রী চলে যাওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

রবিউল বলেন, নিজের মা-বাবা মারা যাওয়ায় শিশুসন্তানকে একা রেখে বাইরে কাজে বের হতে পারেন না। আবার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে অটোরিকশাও ঠিকমতো চালাতে পারেন না। ভীষণ সংকটের মুখোমুখি তিনি। কিন্তু থেমে থাকার সুযোগ নেই। এ লড়াইয়ে তাঁকে জিততে হবে। তাই সন্তানকে কোমরের সঙ্গে বেঁধে অটোরিকশা নিয়ে নামেন তিনি।

রবিউলের প্রতিবেশী রমজান আলী, শহিদুল ইসলাম ও বিজন শেখ বলেন, ছোটবেলা থেকেই রবিউল অসহায়। বিয়ের পর অটোরিকশা চালিয়ে মোটামুটি চলছিল। কিন্তু স্ত্রী চলে যাওয়ার পর খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে তাঁর। সরকার যেন রবিউল ও তাঁর ছেলের পাশে দাঁড়ায়, তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে—এই দাবি জানান তাঁরা।

পাবনার জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘রবিউল ও তাঁর শিশুসন্তানের বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জেনেছি। তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় যা যা করা দরকার, সরকারিভাবে আমরা করব। তাঁর নিজস্ব জায়গা থাকলে সেখানে আমরা একটি ঘর করে দেব। আর রবিউল ও তাঁর স্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের মধ্যে কী সমস্যা আছে, জেনে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত