নোয়াখালীর হাতিয়ার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চরগাসিয়ার হেলাল উদ্দিনের স্ত্রী স্বপ্না বেগমের (৪৫) গর্ভধারণগত জটিলতায় রক্তক্ষরণ শুরু হয়। তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু নদী উত্তাল। এখন নৌকা ভাসানো যাবে না। খবর দেওয়া হয় স্থানীয় এক ওষুধ বিক্রেতাকে। জোয়ারে পথঘাট ডুবে যাওয়ায় তিনিও আসতে পারেননি। এ অবস্থায় চার ঘণ্টা ছটফট করে জীবনপ্রদীপ নিভে যায় স্বপ্নার।
চরগাসিয়ার মানুষ চিকিৎসার অভাবে কী রকম ভোগান্তি পোহাচ্ছে, তা বোঝাতে ১৫ দিন আগে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন স্বপ্নার প্রতিবেশী চরগাসিয়ার রসূলপুর গ্রামের বৃদ্ধ মোস্তাফিজ মিয়া (৭৫)।
স্বপ্নার মতো বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর অসংখ্য ঘটনা রয়েছে এই চরে। কারণ এখানে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চরে বসবাস করা আনুমানিক আট হাজার পরিবারের স্বাস্থ্যসেবায় একমাত্র ভরসা ছয়জন অদক্ষ ওষুধ বিক্রেতা। এঁদেরই গ্রামের মানুষ চিকিৎসক হিসেবে চেনে। এর মধ্যে তিনজনের দোকান চরগাসিয়ার দক্ষিণ পাশের জনতা বাজারে। আর বাকিদের দোকান উত্তর পাশের বারআওলিয়া বাজারে। তাঁরাই ইচ্ছেমতো যে কোনো রোগের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। বিক্রি করছেন ওষুধ। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মোস্তাফিজ মিয়ার সঙ্গে দেখা হয় চরগাসিয়া সূর্যমুখী আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাঠে। তাঁর সঙ্গে থাকা একই গ্রামের কৃষক জসিম উদ্দিন (৪৮) জানালেন আরও একটি ঘটনা। তিনি বলেন, চলতি মাসের শুরুতে জনতা বাজারের শাহেনা বেগমকে (৪০) গুঁতো দেয় ষাঁড়। তাঁকে জেলেনৌকায় নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক রক্ত শরীর থেকে বেরিয়ে গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য নিতে হবে জেলা সদরে। হাতিয়া থেকে জেলা সদরে নেওয়ার পথে নদীতে স্পিডবোটে তাঁর মৃত্যু হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এখানে চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ওষুধ দোকানের মালিক থেকে তাঁরা চিকিৎসক বনে গেছেন। এঁদের মধ্যে কেউ আবার আগে পশুর চিকিৎসা করতেন। এখন করছেন মানুষের সব জটিল রোগের চিকিৎসা। এমনকি ছোট ছোট অপারেশনও করেন তাঁরা। এমন একজন হলেন জনতা বাজারের ওষুধের দোকানদার রিয়াজ উদ্দিন। গত দুই বছর ধরে তিনি চরে বসবাস করা মানুষদের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন।
জনতা বাজারের ওষুধ বিক্রেতা মানিক (৪৫) বলেন, তাঁরা চরে বসবাস করা মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। জটিল কোনো রোগী এলে চেয়ারম্যানঘাট ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠিয়ে দেন। চরগাসিয়া সূর্যমুখী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা তৈমুর হোসেন বলেন, চরের কিছু সচেতন মানুষ মোবাইল ফোনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ওষুধ কিনে থাকেন। তবে চরে মোবাইল নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল। তাই যে কেউ যেকোনো সময় চাইলেও এই সুবিধা নিতে পারেন না।
এদিকে গত বছর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে হাম রোগের জন্য কিছু টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। চরে বিদ্যুতের সুবিধা না থাকায় এসব টিকা ২৪ ঘণ্টার বেশি রাখা যায় না। তাই কর্মীরা এক দিন টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করে চলে আসতে বাধ্য হন। এ ছাড়া টিকা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত কর্মীদের আবাসনব্যবস্থা না থাকায় সেখানে টিকার কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য পরিদর্শক জাফরুল আমিন। এ ব্যাপরে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের চিন্তাভাবনা আছে চরগাসিয়ায় দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক করার।’
চরগাসিয়া উত্তর-দক্ষিণে আট কিলোমিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় চার কিলোমিটার। হাতিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নদীভাঙা আনুমানিক ৮ হাজার পরিবার বসবাস করছে এই চরে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়রে অর্থায়নে এই চরে নৌবাহিনী দুটি ব্যারাক হাউস তৈরি করে দিয়েছে। এ ছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছয়টি গুচ্ছগ্রাম তৈরি করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বলতে জনতা বাজার থেকে সূর্যমুখী আশ্রয়ণ পর্যন্ত তিন কিলোমিটারের একটি কাঁচা সড়ক ছাড়া কিছুই নেই এখানে।










