Ajker Patrika

তরুণ উদ্যোক্তা রাকিবুলের হাত ধরে ‘শুঁটকি গ্রামে’ আধুনিক প্রযুক্তি, বাড়ল উৎপাদন

সুমন আলী, নওগাঁ
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৮: ০৩
তরুণ উদ্যোক্তা রাকিবুলের হাত ধরে ‘শুঁটকি গ্রামে’ আধুনিক প্রযুক্তি, বাড়ল উৎপাদন
ভরতেঁতুলিয়া গ্রামে আধুনিক গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ারে তৈরি করা হচ্ছে শুঁটকি। ছবি: আজকের পত্রিকা

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ভরতেঁতুলিয়া গ্রাম দীর্ঘদিন ধরে ‘শুঁটকির গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত। বংশপরম্পরায় খোলা আকাশের নিচে বাঁশের মাচায় শুঁটকি শুকানোর প্রচলন রয়েছে এলাকায়।

তবে সময় বদলেছে। ভরতেঁতুলিয়া গ্রামে এখন গ্রিনহাউস ফিশ ড্রায়ার প্রযুক্তিতে স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি উৎপাদন শুরু হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসানের উদ্যোগে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় মাছ শুকানোয় বৃষ্টি, কুয়াশা, ধুলাবালি ও পোকামাকড়ের কারণে মাছ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে ৫ থেকে ৭ দিনের বদলে মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় শুঁটকি তৈরি হচ্ছে। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি তৈরি হচ্ছে কম সময়ে।

আত্রাইয়ে ছোট যমুনা নদী ও স্থানীয় বিলের টেংরা, পুঁটি, খলসে, টাকি, শোল ও চাঁদাসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ থেকে যুগ যুগ ধরে শুঁটকি তৈরি হচ্ছে। আত্রাই রেলস্টেশনের দুই পাশে ও নদীর ধারে বাঁশের মাচায় তৈরি এসব শুঁটকির কদর দেশজুড়ে রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এর চাহিদা আছে।

খোলা আকাশের নিচে রোদে মাছ শুকানোর কারণে ধুলাবালি, পোকামাকড় এবং বৃষ্টি-কুয়াশায় মাছ পচে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকত। নতুন চালু হওয়া গ্রিনহাউস ফিশ ড্রায়ারে নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মাছ শুকানো হচ্ছে। এতে মাছের প্রাকৃতিক রূপ, রং, স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অটুট থাকছে বলে দাবি উদ্যোক্তার।

রাকিবুল হাসান বলেন, আগে খোলা মাঠে মাচা পেতে মাছ শুকাতাম। বৃষ্টি বা ধুলাবালির কারণে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মাছ নষ্ট হয়ে লোকসান গুনতে হতো। সেই অপচয় রোধ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি তৈরির ভাবনা থেকেই ইউটিউব দেখে ড্রায়ার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিই। এর বড় সুবিধা হলো—সব সময় জীবাণুমুক্ত পরিবেশে মাছ শুকানো যায়। বর্তমানে অনলাইনের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের মধ্যে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।

রাকিবুল হাসান আরও বলেন, প্রথম অবস্থায় গ্রিনহাউস ফিশ ড্রায়ার ছোট পরিসরে করায় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত শুঁটকি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। সরকার সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা দিলে এই পরিধি বাড়িয়ে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করি।

মাচায় শুঁটকি তৈরি করা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ব্যবসায় সবচেয়ে বড় চিন্তা বৃষ্টি আর কুয়াশা। পানি লাগলেই মাছ নষ্ট। রাকিবুল যেভাবে ড্রায়ারে কম সময়ে মানসম্মত শুঁটকি বানাচ্ছে, তাতে ঝুঁকি অনেক কম।’

শুঁটকি ব্যবসায়ী রিপন আকন্দ ও মঞ্জু মোল্লা বলেন, ‘আমরা বংশপরম্পরায় রোদে ও মাচায় মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে আসছি। হুট করে বৃষ্টি বা অতিরিক্ত কুয়াশা নামলে মাছ পচে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি সব সময়ই থাকে। তবে আমাদের তৈরি ঐতিহ্যবাহী শুঁটকির আলাদা একটা স্বাদ আছে। পুঁজির অভাবে ইচ্ছা থাকলেও আমরা প্রযুক্তির দিকে যেতে পারছি না।’

নওগাঁ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফেরদৌস আলী বলেন, আত্রাইয়ের শুঁটকি শিল্পে গ্রিনহাউস ফিশ ড্রায়ার প্রযুক্তির ব্যবহার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় শুকানোয় মাছের পুষ্টিগুণ ও স্বাদ শতভাগ অক্ষুণ্ন থাকে। মৎস্য দপ্তরের পক্ষ থেকে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ফেরদৌস আলী বলেন, খাতটিকে আধুনিক করতে ক্লাস্টারভিত্তিক সহায়তার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দেশীয় নিরাপদ আমিষের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানির নতুন দুয়ার খুলবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত