Ajker Patrika

খুলনায় বিশেষ যৌথ অভিযান: আগাম তথ্য ফাঁসে আগেই গা ঢাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের

  • চার দিনের বিশেষ অভিযানে আটক ১৮৪
  • বড় সন্ত্রাসী ধরা পড়েনি, উদ্বেগ বাড়ছে
  • খুলনা এখন আতঙ্কের শহরে পরিণত হয়েছে: মঞ্জু
  • রাঘববোয়াল ও অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা ব্যর্থ হলে সমস্যার সমাধান অসম্ভব: নাগরিক সমাজ
কাজী শামিম আহমেদ, খুলনা
খুলনায় বিশেষ যৌথ অভিযান: আগাম তথ্য ফাঁসে আগেই গা ঢাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের

খুলনায় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারিসহ বিভিন্ন অপরাধীদের গ্রেপ্তারে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের নেতৃত্বে চলছে বিশেষ যৌথ অভিযান। অভিযানের গত চার দিনে ১৮৪ জন অপরাধী আটক হলেও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিশেষ অভিযানের আগাম খবর পেয়ে যাওয়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আত্মগোপনে চলে গেছে। ফলে তালিকভুক্ত এই অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খুলনার রাজনীতিবিদ ও নাগরিক নেতারা।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, যৌথ বাহিনী কখন, কোথায়, কোন সময় অভিযান চালাবে, তার আগাম তথ্য সন্ত্রাসীরা জেনে যাচ্ছে। ফলে ঢাকঢোল পিটিয়ে নামা এই অভিযানে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। অপরাধীরা বীরদর্পে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) সূত্র জানায়, ৩ জুন থেকে খুলনায় যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৮৪ জন অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রথম দিনে ৬২, দ্বিতীয় দিনে ৫৯ জন এবং তৃতীয় দিনে ৬৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। অভিযানকালে মদ, গাঁজা, ইয়াবার মতো মাদক কারবারি, ছিঁচকে চোরসহ ছোটখাটো অপরাধীরা ধরা পড়েছে। ধরা পড়েছে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী কসাই লিটন ও আজম খান। তবে তাঁরা বাহিনীর প্রধান নন। এ দুজন ছাড়া বড় অপরাধীরা ধরা পড়েনি।

নগরীর ময়লাপোতা এলাকার বাসিন্দা হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘তিন দিন ধরে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অভিযান চালাচ্ছেন যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। অভিযানে বড় ধরনের সন্ত্রাসী আটক হওয়ার খবর আমরা পাইনি। নগরের বিভিন্ন অলিগলিতে প্রতিদিন মাদকের হাট বসে। অভিযান শুরু হলে তাদের দেখা যায় না। কিন্তু অভিযান শেষ করে যৌথ বাহিনী চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা আবারও পয়েন্টগুলোতে এসে মাদক বিক্রি করে। তাঁর প্রশ্ন, কীভাবে তারা অভিযানের আগাম খবর পায় এবং গ্রেপ্তার হয় না কেন।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শেখপাড়া চামড়াপট্টিতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তিন পুরিয়া গাঁজাসহ দুজনকে আটক করা হয় সেখান থেকে। তবে সাপ্লাইয়ার এবং গডফাদাররা ধরা পড়ে না। অভিযানের আগাম খবর পেয়ে মাদক কারবারিরা অন্যত্র চলে যায়। অভিযানের পর ফিরে এসে তারা আবারও কার্যক্রম শুরু করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক একজন চেম্বার পরিচালক ও ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিশেষ অভিযানের মধ্যেও শহরে খুনখারাবি হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে। বড় অপরাধীরা অভিযানের আগাম খবর পেয়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের ধরা যাচ্ছে না। সন্ত্রাসীদের আগাম খবর পাওয়া খুবই উদ্বেগের।’

কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত বুধবার থেকে পুলিশ, র‌্যাব ও এপিবিএনের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত ১৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে সন্ত্রাসী লিটন, রিফাত, আযম খান, রাব্বিসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। খুলনায় শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

কেএমপি কমিশনার আরও বলেন, অনেক সময় বাইরে থেকে সন্ত্রাসীরা এসে খুলনায় অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে চলে যাচ্ছে। সেগুলো প্রতিহত করার জন্য প্রবেশদ্বারে চেকপোষ্ট বাড়ানো হয়েছে। কেএমপি কমিশনার বলেন, আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অনেক সন্ত্রাসী কারাগার থেকে বের হচ্ছে। তাদের ওপরও নজরদারি রাখা হয়েছে। কোনো ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও থেকে গোলাগুলি, চাঁদাবাজি, অপহরণের তথ্য আসে। খুলনা এখন আতঙ্কের শহরে পরিণত হয়েছে। সন্ত্রাসীদের দমনে খুলনায় পুলিশের আরও তৎপর হওয়া প্রয়োজন।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব বাবুল হাওলাদার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা পুলিশের কাছে আছে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের নামে পুলিশ চুনোপুঁটিদের ধরছে। যেটা একধরনের আইওয়াশ। রাঘব বোয়াল ও অস্ত্রবাজদের অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা ব্যর্থ হলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

খুলনা মহানগর পুলিশের অপরাধ শাখার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে গত মে মাস পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন থানা এলাকায় ৮৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেগুলোর মধ্যে ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত। এই প্রেক্ষাপটে থানাভিত্তিক সন্ত্রাসীদের নতুন তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। মহানগরীর আটটি থানায় সন্ত্রাসীদের নতুন তালিকায় ১৮১ জন সন্ত্রাসী রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত