লিবিয়ায় নির্যাতনে মৃত্যু: তদন্তে মুক্তিপণ আদায়কারীকে অব্যাহতি

লিবিয়ায় মানব পাচারকারী চক্রের নির্যাতনে ফরিদপুরের হাবি মাতুব্বর নিহতের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস। প্রতিবেদনটি ফরিদপুরের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে। এতে মুক্তিপণের টাকা নেওয়া বকুল মাতুব্বরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে নিহত হাবির পরিবার। নিহত হাবির স্ত্রী তাছলিমা বেগমের দাবি, এতে বিচারপ্রক্রিয়ার শুরুতেই তাঁরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
নিহত হাবি মাতুব্বরের বয়স ছিল ৪৫ বছর। তিনি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের জাঙ্গালপাশা গ্রামের মৃত সালাম মাতুব্বরের ছেলে। তাঁর দুই ছেলে হৃদয় (২০) ও তাওহীদ (১৫) এবং পাঁচ বছর বয়সী এক মেয়ে রয়েছে।
স্বামী নিহত হওয়ার পর তিন সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তাছলিমা বেগম। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় একটি চক্র ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে হাবি মাতুব্বরকে লিবিয়ায় পাঠায়।
পরিবারের ভাষ্য, পাশের গোয়ালপাড়া গ্রামের আসলাম মাতুব্বরের (৪০) সঙ্গে হাবির পরিচয় ছিল। আসলাম তাঁকে চক্রের প্রধান হিসেবে পরিচিত নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের মুরাদ ব্যাপারী (৪০), ফুলসূতি গ্রামের বকুল মাতুব্বরসহ (৫০) ছয়জনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
ইতালি পাঠানোর জন্য ২০ লাখ টাকায় চুক্তি হয় বলে দাবি পরিবারের। ধারদেনা ও জমি বন্ধক রেখে প্রথম দফায় ১০ লাখ টাকা চক্রটির হাতে দেন হাবি। এরপর ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট ইতালির উদ্দেশে দেশ ছাড়েন তিনি। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর ২ সেপ্টেম্বর অবশিষ্ট ১০ লাখ টাকা বকুল মাতুব্বরসহ তিনজনের হাতে দেওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি।
তাছলিমা বেগমের অভিযোগ, লিবিয়ায় হাবি মাতুব্বরকে অন্য বন্দীদের সঙ্গে একটি বদ্ধঘরে আটকে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে বকুল মাতুব্বরের কাছে পাঠানো হয়। পরে বকুল তাঁর বাড়িতে গিয়ে ওই দৃশ্য দেখান এবং হোয়াটসঅ্যাপে নির্যাতনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন।

নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে হাবিকে বাঁচাতে আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে জানান তাছলিমা। বসতঘর বন্ধক রেখে এবং স্বজনদের কাছ থেকে ধার ও সুদে টাকা নিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বকুল মাতুব্বর, শাহিন মাতুব্বর ও মনির মাতুব্বরের হাতে ১০ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয়।
তাছলিমা বেগম বলেন, ‘মুক্তিপণের ১০ লাখ টাকা দেওয়ার পরও নির্যাতন থামেনি। এক মাস পর বকুলের মাধ্যমে মুরাদ ব্যাপারী আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। ওই টাকা দিতে না পারায় নির্যাতন বাড়তে থাকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অন্য বন্দীদের মাধ্যমে স্বামীর মৃত্যুর খবর পাই।’
হাবির মৃত্যুর পর সেখান থেকে জানালা ভেঙে পালিয়ে আসা অন্তত ১১ জন সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার মাধ্যমে দেশে ফিরেছেন বলে জানিয়েছে পরিবার। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাবি মাতুব্বরকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তিনি নিস্তেজ হয়ে মারা যান। পরে তাঁর মরদেহ একটি গাড়িতে তুলে ভূমধ্যসাগরে অথবা মরুভূমিতে ফেলে দেওয়া হয় বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় তাছলিমা বেগম চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। মামলায় গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) তদন্ত কর্মকর্তা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক ষষ্ঠী পদ রায় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তাছলিমা বেগমের স্বামী হাবি মাতুব্বরকে লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য আসলাম মাতুব্বর মুরাদ ব্যাপারীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ করেন। প্রতিবেদনে মুরাদ ব্যাপারী, আসলাম মাতুব্বর, শাহিন মাতুব্বর, মনির ফকির ও তানিয়া আক্তারের বিরুদ্ধে হাবি মাতুব্বরকে ইতালিতে পাঠানোর উদ্দেশ্যে মানব পাচার ও চোরাচালানের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে প্রতিবেদনে বকুল মাতুব্বরের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাছলিমা বেগম।
তাছলিমা বেগমের অভিযোগ, বকুল মাতুব্বরের ছেলে পারভেজ মাতুব্বর বাগেরহাটের মান্দা এলাকায় বিয়ে করেছেন। পারভেজের এক চাচাশ্বশুর যুগ্ম সচিব। তাঁর সুপারিশে বকুল মাতুব্বরকে প্রতিবেদন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তাছলিমা বেগম বলেন, ‘গত ২৫ সেপ্টেম্বর জনশক্তি অফিসে দুই পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার সময় সহকারী পরিচালক ষষ্ঠী পদ রায়ের কাছে যুগ্ম সচিব পরিচয়ে এক ব্যক্তির ফোন আসে। বকুল মাতুব্বরকে ডেকে আমার সামনেই জিজ্ঞাসা করা হয়, যুগ্ম সচিব তাঁর কী হন। পরে বকুলের একটি মনগড়া বক্তব্য রাখা হয়। এরপর তদন্ত প্রতিবেদনে দেখি, বকুল মাতুব্বর এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতই নন।’
তাছলিমা বেগম আরও বলেন, ‘পাওনাদারদের ভয়ে তিন সন্তান নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। কখনো না খেয়েও থাকছি। এই অবস্থায় সঠিক বিচার না পেলে আমারও মরণ ছাড়া কিছু নেই। বকুল মাতুব্বর নিজেই আমার বাড়িতে এসে টাকা নিয়েছেন। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ায় টাকা দেওয়ার ভিডিও রাখতে পারিনি। স্বামী হত্যার সঠিক বিচার চাই, সন্তানদের নিয়ে বাঁচতে চাই।’
বকুল মাতুব্বরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন, বাদীর সঙ্গে তাঁর কখনো যোগাযোগ হয়নি; তিনি তাঁকে চেনেনও না।
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক ষষ্ঠী পদ রায় বলেন, ‘মামলার বাদী তাছলিমা বেগম বকুল মাতুব্বরের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ দাখিল করতে পারেননি। প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা যায় না। এই তদন্ত প্রতিবেদনই সবকিছু নয়। বাদী আদালতে প্রমাণ দাখিল করতে পারলে আদালত ব্যবস্থা নেবেন। আদালত একটি প্রতিবেদন চেয়েছেন, আমরা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিবেদন পাঠিয়েছি।’
যুগ্ম সচিব পরিচয়ে ফোন আসার বিষয়ে ষষ্ঠী পদ রায় বলেন, কেউ ফোন দিলেই কাজ হয়ে যাবে, এমন নয়। সবকিছু প্রমাণের ওপর নির্ভর করে।









