Ajker Patrika

গ্যাস-সংকট মোকাবিলা

চীনের সহায়তায় চতুর্থ টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের

  • ১৮ মাসের আগে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ সম্ভব হবে না।
  • আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে বেশ সময় লেগে যাবে।
  • দুই টার্মিনালে সর্বোচ্চ ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট পাওয়া যায়।
  • আদালতে থাকায় অনিশ্চিত সামিটের তৃতীয় টার্মিনাল।
ফয়সাল আতিক, ঢাকা
চীনের সহায়তায় চতুর্থ টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের
ফাইল ছবি

সাম্প্রতিক সময়ে দেশীয় গ্যাসের প্রমাণিত মজুত ও উৎপাদন ক্রমেই কমেছে। সাগরে ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে কোনো কারণে আমদানি করা গ্যাস সরবরাহ হ্রাস পেলে বাসাবাড়ি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, কলকারখানা ও গ্যাসচালিত যানচালকদের মধ্যে হাহাকার পড়ে। এমন পরিস্থিতি থেকে দ্রুত উত্তরণে স্বল্প সময়ের মধ্যে চীনের সহায়তায় আরেকটি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণ করে গ্যাস আমদানি সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে হাত দিয়েছে সরকার।

বর্তমানে মহেশখালী উপকূলে দুটি এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ রয়েছে। কার্গো জাহাজে করে আমদানি করা তরল গ্যাস এসব টার্মিনালে আবার গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপে সরবরাহ করা হয়। বর্তমান দুই টার্মিনালের একটি যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি এবং অপরটি দেশীয় কোম্পানি সামিট পাওয়ারের। দুই টার্মিনাল থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যায়। সম্প্রতি এসব টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি হওয়ায় দেশজুড়ে গুরুতর গ্যাস সংকট শুরু হয়। আমদানি করা গ্যাসের পাশাপাশি দেশীয় কূপের গ্যাস মিলিয়ে সরবরাহ করার পরও প্রতিদিন চাহিদার তুলনায় কয়েকশ মিলিয়ন ঘাটতি থেকে যায়।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত সমাধানের কথা ভাবা হলেও ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। শিগগিরই প্রকৌশল কাজে হাত দিলেও ১৮ মাসের আগে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ সম্ভব হবে না। বিভিন্ন কারণে ৩০ মাস পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

অন্যদিকে আদালতে বিচারাধীন থাকা সামিট টার্মিনাল-২ নামের দেশীয় কোম্পানিটির আরেকটি এফএসআরইউর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালকে প্রতিযোগিতামূলক দরপ্রস্তাব এড়িয়ে সরাসরি তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাসীন ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের অক্টোবরে সেই প্রকল্প থেকে সামিটকে বাদ দেয়। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়—প্রতিষ্ঠানটি ৯০ দিনের মধ্যে পারফরম্যান্স বোনাস জমা দেয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যায় সামিট। বর্তমানে বিষয়টি বিচারাধীন।

জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দেশের এখন নতুন এলএনজি টার্মিনাল প্রয়োজন। বিষয়টি যাতে দ্রুত সম্পন্ন করা যায় সরকার তাই চাচ্ছে। সামিটের বিষয়টি যেহেতু বিচারাধীন সে বিষয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করছি না। এ কারণে চীনের চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিএনইই) মাধ্যমে যে এফএসআরইউ নির্মাণে হাত দেওয়া হয়েছে সেটাকে আমরা বলছি চতুর্থ এফএসআরইউ।’

সামিটের একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে বলেন, ‘সামিট আদালত থেকে ন্যায়বিচার পাবে বলে আশা করি। দেশের গ্যাস সংকট নিরসনে এলএনজি কেনা এবং এফএসআরইউ নির্মাণ এখন খুবই প্রয়োজন, এর কোনো বিকল্প নেই।’

চতুর্থ টার্মিনাল কবে হতে পারে

গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে চীনের চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে (সিএনইই) মহেশখালীর কুতুবজোমে টার্মিনাল নির্মাণের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। চীনের এই কোম্পানি টার্মিনাল নির্মাণ ও নির্দিষ্ট সময় পরিচালনা করার পর মেয়াদ শেষে এটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে বলে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ১৮ থেকে ৩০ মাসের মধ্যে এই টার্মিনাল নির্মাণ সম্পন্ন করা। বর্তমানে সাগরে দৈনিক ১৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার গ্যাস পাইপলাইন রয়েছে। তাই এফএসআরইউ হয়ে গেলেই গ্যাস খালাস করা যাবে। কিন্তু এখানে বিপত্তি হচ্ছে সরকারি ক্রয় আইন অনুযায়ী অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত চুক্তিতে যেতে হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে বেশ খানিকটা সময় লেগে যাবে।

ইতোমধ্যে চীনের ওই কোম্পানির সঙ্গে যেসব চুক্তি করা হবে তা যাচাইয়ের জন্য সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি আইনি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয়েছে। এরপর টার্মিনাল ব্যবহার চুক্তি করবে পেট্রোবাংলা এবং বাস্তবায়ন চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। শেষ ধাপে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং শেষে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।

দেশীয় গ্যাসের মজুত কমতে থাকায় ২০১৮ সালে এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউর মাধ্যমে এলএনজি আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। পরের বছর যুক্ত হয় সামিটের এফএসআরইউ। ২০২০ সালেও দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ দৈনিক ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ছিল। তা বর্তমানে ১৬১০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। আগামী দিনে দেশীয় কূপের গ্যাসের সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে বলে আভাস মিলছে। তবে বেশ কিছু নতুন কূপ খনন ও পুরনো কূপ সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত