Ajker Patrika

কক্সবাজারের সৈকত: অসচেতনতা, বৈরী আবহাওয়ায় বাড়ছে প্রাণহানি

• গত তিন বছরে সাগরে ডুবে মারা গেছেন ৪৬ জন।

• তিন কিলোমিটার সৈকতের বাইরে নেই লাইফগার্ড সেবা।

• চলতি বছর বেড়েছে গুপ্তখাল ও গভীর খাদের সংখ্যা।

• সাগরের পরিবেশ ও আবহাওয়া সম্পর্কে অসচেতন পর্যটকেরা।

• সাঁতার না জানায় বাড়ছে বিপদ, সচেতনতায় জোর।

মাইনউদ্দিন শাহেদ, কক্সবাজার
আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬: ৫০
কক্সবাজারের সৈকত: অসচেতনতা, বৈরী আবহাওয়ায় বাড়ছে প্রাণহানি
ফাইল ছবি

বিকেলে নির্জন সৈকতে হাঁটুপানি পর্যন্ত নেমে গোসল করছিলেন ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে বেড়াতে আসা দুই দলের ১২ জন। হঠাৎ একের পর এক বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে তাঁদের ওপর। পায়ের নিচ থেকে সরে যায় বালু, ভেসে যায় একটি দল। গত বুধবার বিকেলে কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় দলটি। এই ঘটনায় পাঁচজন প্রাণ হারান।

এটি একটি ঘটনা। কক্সবাজারের সৈকতে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। অপর্যাপ্ত লাইফগার্ড সেবা, বৈরী আবহাওয়ায় সাগরে নেমে গোসল, সাঁতার না জানার পর গভীর পানিতে যাওয়ায় এমন দুর্ঘটনা বাড়ছে। ২০১৪ সাল থেকে পর্যটকদের উদ্ধারে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা সি-সেফ লাইফগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী এলাকায় সাগরে ডুবে ৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ১২০ জনকে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত তিন বছরে মারা গেছেন ৪৬ জন। এর মধ্যে গত বছর ২০ জন এবং তার আগের বছর ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ছয়জন করে পর্যটকের মৃত্যু হয়।

সমুদ্রবিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরের আবহাওয়া ও ঢেউয়ের ধরনে ঘন ঘন পরিবর্তন ঘটছে। জোয়ারের পানি প্রবল বেগে তীরে আছড়ে পড়ায় সৈকতের বিভিন্ন স্থানে গুপ্তখাল ও গভীর গর্ত তৈরি হচ্ছে।

সর্বশেষ দুর্ঘটনা যেভাবে

গত বুধবার বিকেলে কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে রামু উপজেলার হিমছড়ির প্যাঁচারদ্বীপে মেরিনা রিসোর্টের জাদুঘরসংলগ্ন সৈকতে নেমেছিলেন ওই ১২ জন। এই ঘটনায় সর্বশেষ গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এস এম নাফিসুর রহমান নিবিড়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হলো। এ ছাড়া মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন রাকিব হাসান (১৯) নামের একজন।

এই দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা চট্টগ্রামের মোহাম্মদ সানি বলেন, ‘আমরা হাঁটুপানিতে নেমেছিলাম। হঠাৎ বড় বড় ঢেউ পরপর আমাদের ওপর আছড়ে পড়ে। উল্টো স্রোতে ভেসে যাচ্ছিলাম। সবাই হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। পায়ের নিচ থেকে বালু সরে যাচ্ছিল। কোনোমতে পাঁচ-ছয়জন তীরে উঠে আসতে পারলেও ছয়জন সাগরে তলিয়ে যান।’

সমুদ্র দেখতে এসে গোসল করতে নেমে পর্যটকের মৃত্যুর আরেকটি বড় ঘটনা ঘটেছিল ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। সেই সময় হিমছড়ির এই সৈকতে গোসল করতে নেমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। অরিত্র হাসান নামে বিশ্ববিদ্যালয়টির উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের এক শিক্ষার্থীর খোঁজও মেলেনি।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাগরে ডুবে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন মেহেরপুর সদরের হেলাল উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি।

তিন কিলোমিটার সৈকতের বাইরে নেই সুরক্ষাব্যবস্থা

কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফের বদরমোকাম পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত। এর মধ্যে শহরের লাবণী থেকে কলাতলী পর্যন্ত তিন কিলোমিটার এলাকায় গোসল করতে নেমে বিপদে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারের ব্যবস্থা রয়েছে। এর বাইরে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী, পাটুয়ারটেক ও টেকনাফের কয়েকটি সৈকতে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক গোসল করতে নামেন। এসব এলাকায় কেউ গুপ্তখাল বা উল্টো স্রোতে পড়ে ভেসে গেলে তাৎক্ষণিক উদ্ধারের ব্যবস্থা নেই।

জেলা প্রশাসনের বিচ কর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুব আলম বলেন, সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি ও উত্তাল সাগরের কারণে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে গুপ্তখাল ও বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে লাল নিশানা টাঙানো এবং মাইকিং করে পর্যটকদের সতর্ক করা হচ্ছে। তবে নির্জন সৈকতগুলোতে এই ব্যবস্থা নেই।

বৈরী আবহাওয়ায় বদলাচ্ছে সাগরের পরিস্থিতি

চলতি বছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রে অন্তত ১১ বার সতর্কসংকেত জারি করা হয়েছিল। এপ্রিল থেকে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে সাগর শান্ত হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা উত্তাল। পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের প্রভাবে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে বালিয়াড়ি ভেঙে গুপ্তখাল ও গভীর খাদ তৈরি হয়েছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান বলেন, নভেম্বর পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় কিংবা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সাগরে নামার আগে জোয়ার-ভাটার সময়সূচি ও আবহাওয়া সম্পর্কে জানা জরুরি।

২০২৪ সালের অক্টোবরে সৈকতের ভাঙন ও গুপ্তখাল নিয়ে গবেষণা করছেন বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে সৈকতের গঠনে ঘন ঘন পরিবর্তন ঘটার তথ্য উঠে এসেছে। বোরির সামুদ্রিক পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই কিবরিয়া বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ বাড়ছে। চার-পাঁচ বছর ধরে কক্সবাজার উপকূলের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে এর বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, বাস, রেল ও উড়োজাহাজে আসা পর্যটকদের সৈকতে নামার আগে সতর্কতা ও বিপদ এড়ানোর উপায় জানানো জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ সৈকতে পর্যটকদের বিচরণ নিয়ন্ত্রণেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত