‘আমরা কিছু বুঝে উঠেতে পারছি না। আমাদের কপালে যা আছে তা হবে। আগে বাবার লাশটি খুঁজে পেতে চাই।’ কথাটি চট্টগ্রামে চার দিন আগে নিখোঁজ সালেহ আহমেদের ছেলে সাদেকুল্লাহ মাহিমের।
করোনার কারণে উপার্জন কমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম নগর থেকে পরিবারকে বাড়ি পাঠিয়ে টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছিলেন সালেহ আহমেদ। স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া দুই সন্তান স্ত্রীসহ পরিবারের খরচ জোগাতে নগরে সবজির ব্যবসা করতেন তিনি। রাস্তায় ভ্যান গাড়িতে করে সবজি বিক্রি করা সালেহ স্বপ্ন দেখতেন পড়াশোনা করে ছেলেমেয়ে একদিন ঠিক দাঁড়িয়ে যাবে নিজেদের মতো করে। তখন এই এত কষ্ট সব গল্প হয়ে যাবে। কিন্তু তা আর হলো কই? একদিনের ঝুম বৃষ্টি, আর চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেল তাবৎ স্বপ্ন। শুনতে যেমনই লাগুক, রাস্তায় বেরিয়ে হাঁটতে থাকা সালেহ আহমেদ নালায় পড়ে নিখোঁজ হলেন। এমনই নিখোঁজ যে, তাঁর খোঁজ আর মিলল না।
গত ২৫ আগস্ট নালায় পড়ে নিখোঁজ সবজি ব্যবসায়ী সালেহ আহমেদের কোনো হদিস মেলেনি এখনো। তাঁর পরিবারের এখন শোকের আবহ। পরিবারের সদস্যরা এখন সালেহ আহমেদের মরদেহের খোঁজটি অন্তত চাইছেন।
ওই দিন চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুরে একটি নালায় পড়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন সালেহ আহমেদ (৫০)। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার মনসার টেক গ্রামে। সালেহ আহমেদ তাঁর পরিবারের একমাত্র উপার্জন করা ব্যক্তি। ফলে তাঁর নিখোঁজ হওয়ায় চিন্তার ভাঁজ পড়েছে পরিবারের সদস্যদের কপালে। সালেহ এত দিন কষ্ট করে হলেও স্ত্রী ও দুই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া সন্তানসহ চার সদস্যের পরিবারের খরচ জোগান দিচ্ছিলেন। এখন পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু এসব ছাপিয়ে তাঁকে শেষবারের মতো দেখার আকাঙ্ক্ষাই এখন প্রবল হয়ে উঠেছে। অথচ একটানা অভিযান চালিয়েও সালেহের কোনো খোঁজ দিতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ।
সালেহ আহমেদের ছেলে সাদেকুল্লাহ মাহিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা কিছু বুঝে উঠেতে পারছি না। আমাদের কপালে যা আছে, তা হবে। আগে বাবার লাশটি খুঁজে পেতে চাই। শেষবারের মতো বাবাকে দেখতে চাই। এত দিন বাবা সংসার আগলে রেখেছিলেন।’
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে আলাপ হলো বিষয়টি নিয়ে। তাঁরা জানালেন, সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি আয়ের জন্য পাঁচ বছর আগে সালেহ আহমেদ শহরে এসে সবজি বিক্রি শুরু করেন। সালেহের প্রতিবেশী ও চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত মো. ফারুক বলেন, ‘তিনি শহরে ভ্যান গাড়িতে করে সবজি বিক্রি করতেন। এই দিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলত। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। এখন তাঁকে হারিয়ে পরিবারের সদস্যেরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছে বলা যায়। তাঁর দুই ছেলেমেয়ে। ছেলেটি একটি কলেজে প্রথম বর্ষে ও মেয়েটি নবম শ্রেণিতে পড়ছে।’
সালেহের পরিবারের সদস্যরাও আগে শহরে থাকতেন। করোনার কারণে আয় উপার্জন কমে যাওয়ায় পরে তাঁদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রোকন নামে একই এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, তাঁদের অভাবের সংসার ছিল। আবার ঋণগ্রস্তও ছিল পরিবারটি।
রোববারও নালার সম্ভাব্য বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। তাদের সঙ্গে ছিলেন মাহিমও। তিনিসহ এলাকার আরও কয়েকজন নালায় নেমে বহদ্দারহাট, শমসের পাড়াসহ বিভিন্ন নালায় তল্লাশি করেন। কিন্তু বিকেলে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ফলাফল আগের মতোই।
অভিযান পরিচালনাকারী দলের সদস্য ও ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক মো. সেকান্দার আলী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা এখনো তাঁকে খুঁজে পাইনি। ময়লা আবর্জনা ও মাটির নিচে দেহ চাপা পড়লে লাশ খুঁজে পাওয়া কঠিন। এরপরও আমরা সব জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছি।
নিখোঁজ সালেহর ভাতিজা রুবায়েত হাসান চৌধুরী বলেন, ঘটনার দিন ফটিকছড়ি মাইজভান্ডার দরবার শরীফে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন।
এদিকে এ ঘটনায় চট্টগ্রাম নগর প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রশাসন নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে উল্লেখ করে নাগরিক পরিসর থেকে অভিযোগ উঠেছে। তাঁরা বলছেন, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর অবহেলার কারণেই সালেহ আহমেদ নালায় পড়ে নিখোঁজ হয়েছেন। ভারী বৃষ্টিপাত হলেই নগরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। তখন কোথায় ফুটপাত ও সড়ক, আর কোথায় নালা বোঝার কোনো উপায় থাকে না। খাল ও নালার ওপর কোনো স্ল্যাব নেই, দেয়াল বা লোহার বেষ্টনীও নেই, নেই বিপদসূচক চিহ্ন। এভাবে নগরের প্রায় সব খালের পাড় অরক্ষিত। এতে দুর্ঘটনায় হতাহত হচ্ছেন অনেকেই।










