Ajker Patrika

চাঁপাইনবাবগঞ্জ: পদ্মার পাঁচ পয়েন্টে মাটি লুট

রিমন রহমান, রাজশাহী
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: পদ্মার পাঁচ পয়েন্টে মাটি লুট
পদ্মা শুকিয়ে গেছে। সেই চর থেকে মাটি তুলে ইটভাটায় বিক্রি করছে প্রভাবশালী চক্র। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চর বাগডাঙ্গা ইউনিয়নে। ছবি: আজকের পত্রিকা

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর পাঁচটি পয়েন্ট থেকে মাটি লুট করছে প্রভাবশালী চক্র। ‘পুলিশ-প্রশাসন ও অন্যদের ম্যানেজ করার জন্য’ প্রতিটি ট্রাক্টর থেকে আলাদাভাবে তোলা হয় চাঁদা। অবৈধভাবে এই মাটি কাটার কারণে নদীতীরবর্তী কয়েক কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। আর রাস্তাঘাট ধুলার রাজ্যে পরিণত হওয়ায় অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযান হয়। তবে সেটাও ম্যানেজ করা।

সম্প্রতি এই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সদর উপজেলার চর বাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখের আলী-আলীমনগর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৫, ৬, ৭ ও ৮ নম্বর স্পার (নদীর গতিপথ পরিবর্তন করতে দেওয়া বাঁধ) দিয়ে মাটিভর্তি ট্রাক্টরগুলো উঠছে। বাঁধগুলোর দুপাশে জনবসতি রয়েছে। কিছুক্ষণ পরপর সেই বাঁধ দিয়ে মাটি নিতে ট্রাক্টর পদ্মায় নামছে, মাটি নিয়ে আবার উঠছে। তাই বাঁধে এখন প্রচণ্ড ধুলা। ট্রাক্টর যাওয়া-আসার সময় আশপাশের বাড়িঘর ধুলায় ঢেকে যাচ্ছে। এ কারণে মানুষের বসবাস কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু দফায় দফায় অভিযোগ করেও প্রতিকার মিলছে না।

এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুন্দরপুর ও চর বাগডাঙ্গা এলাকায় প্রায় ২০টি ইটভাটা রয়েছে। পদ্মার বুকের এসব মাটি চলে যাচ্ছে ভাটাগুলোতে। পাঁচটি পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন অন্তত দেড় হাজার গাড়ি মাটি কাটা হয়। মাটিখেকো চক্র মাটির দাম হিসেবে গাড়িপ্রতি ৪০০ টাকা, খননযন্ত্রের ভাড়া হিসেবে ২৬০ টাকা, পুলিশ-প্রশাসনসহ অন্যদের ম্যানেজ করার জন্য আরও ৩০০ টাকা করে নেয়। আর ট্রাক্টরের ভাড়া নেওয়া হয় ১ হাজার টাকা। পাঁচ পয়েন্টের মাটি বেচে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকা পকেটে ঢোকাচ্ছে চক্রটি।

জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইকরামুল হক নাহিদ বলেন, ‘আমরা মাটিখেকো চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। গত এক মাসের মধ্যে আমি পাঁচ-সাত দিন অভিযান পরিচালনা করেছি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আলাদাভাবে অভিযান চালানো হয়েছে। এ চক্রের বিরুদ্ধে আমরা একটি নিয়মিত মামলা করারও প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ প্রশাসনের নামে টাক্ট্ররপ্রতি ৩০০ টাকা তোলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমরা জানি না। আমাদের কাছে কেউ কোনো অনৈতিক প্রস্তাবও নিয়ে আসেনি। সেই সাহস নেই। ম্যানেজ হলে তো আমরা অভিযান করতাম না। আমরা কিন্তু নিয়মিতই অভিযান পরিচালনা করি।’

আরও যা দেখা গেল

১ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার পাঁচটি এলাকা ঘুরে পদ্মা নদী থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে। বাখের আলী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর পাড়ে বালু স্তূপ করে রাখা আছে। তার পাশে আলীমনগর এলাকা থেকে মাটি কেটে নিয়ে যেতে গ্রাম থেকে সোজা রাস্তা নেমে গেছে পদ্মা নদীর নিচে। তবে তখন সেখানে কোনো ট্রাক্টর দেখা যায়নি।

গ্রামের দিকে উঠে এসে কথা হয় একটি দোকানে বসে থাকা দুজন নির্মাণশ্রমিকের সঙ্গে। তাঁরা জানান, প্রতিনিয়ত এই এলাকা দিয়ে পদ্মার মাটি কেটে ট্রাক্টরে করে ইটভাটায় নেওয়া হয়। একজন শ্রমিক বলেন, ‘একটু আগেই পুলিশ আইসছিল। সবকে দাবড়ানি দিল। এই কারণে এখুন একটু বন্ধ। একটু পরে আবার শুরু হয়্যা যাইবে। লুকাচুরি খেলা চইলছে।’

পদ্মা নদী থেকে তুলে আনা মাটি নেওয়া হচ্ছে ট্রাকে করে। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায়। ছবি: আজকের পত্রিকা
পদ্মা নদী থেকে তুলে আনা মাটি নেওয়া হচ্ছে ট্রাকে করে। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

৭ ও ৮ নম্বর স্পার দিয়ে পদ্মার পাড় থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার নিচে নেমে সেখানে কয়েকটি স্থান থেকে মাটি কাটার চিত্র দেখা যায়। দুটি এলাকাতেই মাটি কাটতে কাটতে নদীর ভেতর অনেকগুলো পুকুর হয়ে পড়েছে। একই দৃশ্য দেখা যায় ৬ নম্বর স্পারেও। ৫ নম্বর স্পার দিয়ে নদীতে নেমে প্রায় আড়াই কিলোমিটার যেতে হয়। তারপর সেখানে মাটি কাটার চিত্র দেখা যায়।

৭ নম্বর স্পারে যাওয়ার আগেই শিবিরহাট মোড়ে মাটিবাহী ট্রাক্টর উঠে আসতে দেখা যায় নদী থেকে। স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, তিনি প্রবাসী। সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। এসে দেখছেন, ধুলার কারণে এলাকায় থাকা মুশকিল। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা নদী থেকে মাটি লুট করছে প্রভাবশালী চক্র। প্রশাসন কিছুই করতে পারছে না।

এ নিয়ে কথা বলতে জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গীর মোবাইলে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি। জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘প্রথমত এটা এসি ল্যান্ডের বিষয়। তারপরেও আমরা অভিযান করি। বেশ কিছু ট্রাক্টর জব্দ করেছি। আসামি ধরেছি। মামলাও দিয়েছি।’ পুলিশের নামে টাকা তোলার বিষয়ে বলেন, ‘এটা আমার জানা নেই। অন্তত এর সঙ্গে পুলিশ জড়িত নেই। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়।’

নেপথ্যে কারা

ওই পাঁচটি এলাকায় স্থানীয় এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এই মাটিখেকো চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। তারা সবাই দলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। এলাকার লোকজন জানান, পাঁচটি পয়েন্টেরই মাটিখেকো চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন সুন্দরপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান। তাঁর সঙ্গে আছেন আজিজুল ইসলাম নামের আরেকজন। তাঁদের হয়ে সরাসরি টাকা আদায় করে থাকেন মুশফুল আলী, সাদরুল ইসলাম, আসাদুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, আকবর আলী ও মো. জিয়া। তাঁরা পাঁচ পয়েন্টে আরও কিছু লোকজন রেখে সবকিছু দেখাশোনা করে থাকেন। দিন শেষে টাকার হিসাব বুঝে নেন মতিউর ও আজিজুল।

শিবিরহাট এলাকায় একটি চায়ের দোকানে বসে ক্রেতা সেজে কথা হয় সাবেক ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনিও এই মাটি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বলে জানান। আর ট্রাক্টর সরবরাহ করে থাকেন নবাবজাইগির এলাকার বজলু কালু, সেলিম রেজাসহ কয়েকজন।

কথা বলার জন্য সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মতিউর রহমানকে কয়েক দফা ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। গতকাল সোমবার দুপুরে চক্রের আরেক হোতা আজিজুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তখন আজিজুল জানান, তিনি হিসাবপাতি নিয়ে ব্যস্ত আছেন। পরে ফোন করবেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত