ময়মনসিংহ অঞ্চল: স্বস্তির ট্রেনযাত্রায় এখন ভোগান্তি-মৃত্যুঝুঁকি
• তিন মাসে ৫ ট্রেন লাইনচ্যুত ও ২২ ইঞ্জিনে ত্রুটি।
• রেলপথের অনেক অংশ ৭০ বছরের বেশি পুরোনো ও জরাজীর্ণ।
• মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন, দুর্বল ট্র্যাক ও সিগন্যালিং সংকটে বাড়ছে ঝুঁকি।
• যাত্রীদের দাবি, দ্রুত ট্র্যাক সংস্কার, নতুন ইঞ্জিন ও আধুনিক সিগন্যালিং চালু করা হোক।

একসময় স্বস্তি ও নিরাপদ যাত্রার অন্যতম মাধ্যম ছিল ট্রেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ট্রেনযাত্রাই এখন পরিণত হয়েছে ভোগান্তি আর মৃত্যুঝুঁকির যাত্রায়। লাইনচ্যুত হওয়া, ইঞ্জিনে আগুন লাগা কিংবা ইঞ্জিন বিকল হয়ে মাঝপথে ট্রেন আটকে পড়া—নিত্যদিনের এসব ঘটনায় আতঙ্ক বাড়ছে যাত্রীদের। দেশের অন্যতম ব্যস্ত ময়মনসিংহ-ঢাকা, জামালপুর, মোহনগঞ্জ, ঝারিয়া, কিশোরগঞ্জ ও চট্টগ্রাম রেলপথের অনেক লাইনই ৭০ বছর বা তারও বেশি পুরোনো। চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল ও জরাজীর্ণ ইঞ্জিনের কারণে লাখো যাত্রীর কাছে এখন রেলযাত্রা যেন স্বস্তির বদলে গলার কাঁটা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ অঞ্চলের ট্রেনযাত্রায় দুর্ঘটনা, ইঞ্জিন বিকল ও লাইনচ্যুতি যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত তিন মাসে পাঁচটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে। একই সময়ে ইঞ্জিন বিকল, আগুন, সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও লাইনচ্যুতিসহ অন্তত ২২টি বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটেছে।
সর্বশেষ ২৮ আগস্ট সন্ধ্যায় জামালপুর থেকে ঢাকাগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনটি ময়মনসিংহ নগরীর নতুন বাজার এলাকায় ইঞ্জিনে ত্রুটির কারণে দাঁড়িয়ে যায়। এ ঘটনায় ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আক্তার হোসেন জানান, ট্রেনের ইঞ্জিন দুর্বল হয়ে পড়েছে। যে কারণে সামান্য ত্রুটিতেই তিস্তা এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে যায়। পরে বিকল্প ইঞ্জিনে তিস্তা এক্সপ্রেস ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে আনা হলে ওই রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। ট্রেন লাইনচ্যুত, ইঞ্জিন বিকল, ইঞ্জিনে আগুন এখন নিয়মিত ঘটনা বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
এর আগে ২২ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার ট্রেনটি গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালে ইঞ্জিনে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। পরে চালক, পরিচালক ও রেলওয়ের কর্মীরা ইঞ্জিনের ত্রুটি মেরামত করেন।
দুই ঘণ্টা পর ট্রেনটি পুনরায় চলাচল শুরু করে।
১৫ আগস্ট দুপুরে গফরগাঁও উপজেলায় অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটে। তবে এক নম্বর লাইন দিয়ে ঢাকার সঙ্গে ময়মনসিংহের ট্রেন চলাচল চালু রয়েছে। ৭ আগস্ট গফরগাঁও স্টেশনের অদূরে জামালপুর কমিউটার ট্রেনের পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে ৭ ঘণ্টা ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। এর আগে ১৬ জুলাই তিন ঘণ্টার ব্যবধানে একই রুটে দুটি পৃথক লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটে। ১০ জুন ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ রেলক্রসিং এলাকায় ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসের পাওয়ার কার লাইনচ্যুত হলে উদ্ধারকারী ট্রেনও লাইনচ্যুত হয়।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুনে তিনটি, মে মাসে আটটি এবং এপ্রিলে ছয়টি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়। গত ১৫ জুন গফরগাঁওয়ে জামালপুর এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ও বগির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই দিন আঠারোবাড়িতে বিজয় এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনে আগুন লাগে এবং পরে বিকল্প ইঞ্জিনও বিকল হয়। ১৩ জুন ময়মনসিংহ স্টেশনে তিস্তা এক্সপ্রেসের এসি কোচে আগুন লাগে।
বারবার দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কার্যকর পরিবর্তন না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়েও।
ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথের বিভিন্ন স্থানে রেললাইনকে স্লিপারের সঙ্গে সংযুক্ত রাখা ফাস্টেনিং ক্লিপ ভাঙা বা অনুপস্থিত। কোথাও ক্ষয়প্রাপ্ত স্লিপার, দুর্বল বেস প্লেট ও সংযোগস্থল চোখে পড়ে। রেলপথ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ত্রুটি দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলে ট্র্যাকের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে লাইনচ্যুতির ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি পুরোনো ট্র্যাক, দুর্বল ব্যালাস্ট, বসে যাওয়া লাইন এবং সেতুর দুই পাশের মাটি ধসে পড়ার ঘটনাও উদ্বেগজনক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই রুটে বর্তমানে ১৮ জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও ইঞ্জিন ও কোচ সংকটে কয়েকটি মেইল ও লোকাল ট্রেন বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি অসংখ্য অবৈধ ও অরক্ষিত রেলক্রসিং, গেটম্যান সংকট এবং দুর্বল সিগন্যালিং ব্যবস্থাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
যাত্রীদের দাবি, আশ্বাস নয়-ঝুঁকিপূর্ণ ট্র্যাক সংস্কার, ভাঙা ফাস্টেনিং ক্লিপ ও স্লিপার প্রতিস্থাপন, নতুন ইঞ্জিন সংযোজন, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথকে নিরাপদ করা হোক। অন্যথায় আরও বড় দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হবে।
ময়মনসিংহ লোকোশেডের পরিদর্শক শফিউল হাসান জানান, অনেক পুরোনো ইঞ্জিন পূর্ণাঙ্গ মেরামতের আগেই চলাচলে নামাতে হচ্ছে। ফলে বিকলের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, ‘এই রুটের অধিকাংশ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ। নতুন ইঞ্জিন সংযোজনের পাশাপাশি শ্রীপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে বিদ্যাগঞ্জ, গৌরীপুর, আঠারোবাড়ি, মোহনগঞ্জ ও জারিয়া পর্যন্ত রেলপথ দ্রুত সংস্কার জরুরি। পাথরের ঘাটতির কারণে ট্র্যাক দুর্বল হয়ে পড়ছে।’









