Ajker Patrika

লাউয়াছড়ায় পর্যটকের ঢল, আতঙ্কে বন্য প্রাণী

মাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজার
লাউয়াছড়ায় পর্যটকের ঢল, আতঙ্কে বন্য প্রাণী
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মূল ফটকে পর্যটকের উপচে পড়া ভিড়। ছবি: আজকের পত্রিকা

সংরক্ষিত বনের চারপাশ খোলা, বনের ভেতরে রয়েছে সড়ক ও রেলপথ। মধ্যখানে বনের ভেতরে প্রবেশের জন্য মূল ফটক। টিকিট কেটে ১০ শতাংশ পর্যটক ভেতরে প্রবেশ করলেও বাস্তবে বনের ভেতরে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ প্রবেশ করছেন বিনা বাধায়। আর ঈদ-পার্বণে তো কথাই নেই। মোটরসাইকেল নিয়ে, হইহুল্লোড় করে সবাই যেন আনন্দভ্রমণে ছুটে যান লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনে! এদিকে বনের ভেতর হঠাৎ করে একসঙ্গে এত মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে বন্য প্রাণীরা। অথচ বিষয়টি নিয়ে একেবারেই উদাসীন প্রশাসন।

আজ মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনে ঢুকে দেখা গেল, বনের ভেতর রেললাইনে বসে আছেন অনেকে। কেউবা আবার দল বেঁধে ছবি তুলছেন। হঠাৎ ট্রেন এলে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষ চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে ছবি তুলছেন। এখানেই শেষ নয়, আগত মানুষেরা যে যাঁর ইচ্ছামতো ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন বনের ভেতর। ভিআইপি কোনো অতিথি এলে মূল ফটক দিয়ে গাড়ি নিয়ে সরাসরি ভেতরে চলে আসেন। গাড়ির হর্ন আর শব্দদূষণে বানর, হনুমান ভয়ে অস্থির হয়ে ছোটাছুটি করতে থাকে।

১ হাজার ২৫০ হেক্টর আয়তনের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বন্য প্রাণীর নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে চলাচল করার কথা থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে পর্যটকের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন শনিবার থেকে আজ পর্যন্ত স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত পর্যটকের চাপে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয় বন এলাকার ভানুগাছ-শ্রীমঙ্গল সড়কজুড়ে। বনের ভেতর নীরবতা পালন করার কথা থাকলেও পর্যটকদের চিল্লাপাল্লা ও যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে নষ্ট হচ্ছে প্রাণীদের খাবার ও আবাসস্থল। ফলে বন ও পর্যটন একসঙ্গে দুটিকে রক্ষা করা খুবই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

উদ্যান কর্তৃপক্ষ জানায়, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়াকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ বলছে, ঈদের দিন (শনিবার) থেকে আজ পর্যন্ত টিকিট কেটে উদ্যানে প্রায় ৬ হাজার পর্যটক প্রবেশ করেছেন। লাউয়াছড়া বনের চারপাশ খোলা থাকায় প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যটক টিকিট ছাড়া উদ্যানে প্রবেশ করেন। পর্যটকদের জন্য বোর্ডে বেশ কিছু নির্দেশনা লেখা আছে। তবে বেশির ভাগ পর্যটক এই নির্দেশনা মেনে চলেন না।

কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া বনের ভেতর রেললাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন পর্যটকেরা। ছবি: আজকের পত্রিকা
কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া বনের ভেতর রেললাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন পর্যটকেরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

পরিবেশবাদীরা বলছেন, বনকে পৃথিবীর ফুসফুস বলা হলেও লাউয়াছড়া বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। বনের ভেতর সড়কপথে গাড়ির সংখ্যা গত কয়েক বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে এবার, যা বনের জন্য খুবই খারাপ সংকেত। চোরাকারবারিদের কারণে একদিকে বন থেকে গাছ ও বাঁশ উজাড় হচ্ছে, বনের ঘনত্ব কমে এসেছে; অন্যদিকে প্রাণীর সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে।

বন্ধুদের নিয়ে নরসিংদী থেকে আগত পর্যটক মার্জান আহমেদ বলেন, ‘আমরা এত দূর থেকে এসেছি লাউয়াছড়া বনে শুধু বন্য প্রাণী দেখার জন্য। তবে এখানে এসে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের দেখা মিললেও বন্য প্রাণীর দেখা মেলেনি।’

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কাজ্বী নাজমুল হক বলেন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। এতে বনের ভেতরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক পর্যটক আসেন বনজঙ্গল ও প্রাণী দেখার জন্য। তাঁদের হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। এ ছাড়া বনের ভেতর দিয়ে চলা সড়ক ও রেলপথ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কয়েকবার বন বিভাগ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে তা কেউ মেনে চলেন না।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫ থেকে ১০ জন। সেখানে আমাদের দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১ হাজার ২০০ জন। এই অবস্থায় শহরের বাইরে নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখে পর্যটকেরা বেসামাল হয়ে যান। অনেক পর্যটক না বুঝেই বনের ও প্রাণীদের ক্ষতি করছেন।’

আবুল কালাম আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, পৃথিবীর কোথাও চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে সেলফি তোলার জন্য কেউ ঝুঁকি নেবেন না। অথচ উদ্যানের ভেতর দিয়ে ট্রেন এলেই শত শত পর্যটক সেলফি তোলার জন্য ট্রেনের একেবারে কাছে চলে আসেন, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এর আগেও এ রকম সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন পর্যটক। আমাদের জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। এর পরও বনের পরিবেশ রক্ষায় আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

তেহরানে প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছে ওয়াশিংটন, পর্যালোচনা করছে ইরান

এক-এগারোর আলোচিত সাবেক জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার

ঈদ শেষে আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথে একই পরিবারের ৩ জন নিহত

ইরানের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে স্পিকার গালিবাফকে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র

ম্যাচ চলা অবস্থায় মারা গেলেন ভারতীয় সাকিব

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত