Ajker Patrika

মৃতদের ভিড়ে জীবিত নিউইয়র্ক টাইমস

জাহীদ রেজা নূর  
মৃতদের ভিড়ে জীবিত নিউইয়র্ক টাইমস
ছবি: নিউইয়র্ক টাইমস

পত্র-পত্রিকার প্রতি যে আকর্ষণ বা আগ্রহ ছিল গত শতাব্দীতে, তা এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়া নামক সংবাদপত্রের ব্যবসা লাটে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে সারা বিশ্বেই। তথ্য সংগ্রহের উপায় বেরিয়েছে অনেক রকম। তাই ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে টাটকা কাগজে ছাপা হওয়া সংবাদের প্রতি আকর্ষণ। সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ ধূমায়িত চায়ের সঙ্গে সংবাদপত্রে নজর বোলানোর ঐতিহ্য আর নেই।

প্রিন্ট মিডিয়ার এ রকম এক দুঃসময়ে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ নামক পত্রিকাটি খুঁজে বের করেছে বাঁচার উপায়। ডিজিটাল মিডিয়াকে মূল্য দিয়ে তারা পরিবর্তন করে নিয়েছে তাদের সংবাদ পরিবেশনার বিষয় আর ধরন। কেন অন্যরা এই প্রতিযোগিতায় নিউইয়র্ক টাইমসের চেয়ে পিছিয়ে পড়ল, তা আমরা জানব পত্রিকাগুলোর বর্তমান লক্ষ্য ও পরিবেশনার ধরন বিচার করে। আলোচনায় রেডিও-টেলিভিশনের ভালো-মন্দও উঠে আসবে প্রাসঙ্গিক বলে।

বহুদিন ধরে বাংলাদেশেও সংবাদপত্রগুলোর টিকে থাকা নিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে চিন্তা-ভাবনা করছেন মালিকেরা, সাংবাদিকেরা, বিজ্ঞাপন কর্মকর্তারা। একসময় বিজ্ঞাপন আর বিক্রির টাকা দিয়ে সংবাদপত্র চালানোর যে অভ্যাস গড়ে উঠেছিল, তা এখন আর কাজে দিচ্ছে না। প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে অডিও-ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার সামঞ্জস্য ছাড়া যে সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার সম্ভাবনা কম, সে কথাও পত্রিকা-সংশ্লিষ্টরা বুঝতে পারছেন বটে। কিন্তু কোন উপায়ে পাঠকের (বা এখন পাঠক-দর্শক বলা সমীচীন) মনস্তুষ্টি করা যাবে, তা নিয়ে সবাই দ্বিধাগ্রস্ত। এ সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা বিশ্বের।

নিউইয়র্ক টাইমস এখনো পর্যন্ত এই যুদ্ধে কীভাবে বীরের মতো টিকে থাকল, সে গল্পই বলব আজ।

ট্রাম্প যুগে নিউইয়র্ক টাইমস

একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, আমেরিকানদের মধ্যে প্রচলিত গণমাধ্যমের প্রতি আস্থার তীব্র এবং সম্ভবত অপরিবর্তনীয় পতন। ইন্টারনেট এখন একের পর এক বিকল্প তথ্যসূত্রের জন্ম দিচ্ছে, যেমন স্বাধীন পডকাস্ট, সাবস্ট্যাক নিউজলেটার থেকে শুরু করে টুইচ আর ইউটিউব স্ট্রিমিং। কাজেই ধীরে ধীরে বেশি সংখ্যক মানুষ পরিচিত মূলধারার গণমাধ্যমের বাইরে গিয়ে তথ্য খুঁজতে শুরু করেছে। সহস্রাব্দের সূচনালগ্নে যে প্রবণতার শুরু হয়েছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তা আরও ভয়াবহ গতিতে বিস্তৃত হয়েছে। যার প্রমাণ আমরা পৃথিবীর দেশে দেশে দেখতে পাচ্ছি।

‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ পত্রিকাটি ১৯৭০-এর দশকে ‘পেন্টাগন পেপারস’ প্রকাশ করে এবং উডওয়ার্ড ও বার্নস্টাইনের ‘ওয়াটারগেট স্ট্যাক্ডাল’ অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিল। অথচ বিগত চার বছরেরও কম সময়ে তারা তাদের পাঠকসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ হারিয়েছে। একসময় আমেরিকান সাংবাদিকতার স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত শক্তিশালী কেবল নিউজ চ্যানেলগুলোর অবস্থাও নাজুক। এমএসএনবিসি গত কয়েক মাসে ৫৩ শতাংশ দর্শক হারিয়েছে, আর সিএনএন হারিয়েছে ৪৭ শতাংশ। এক দশক আগেও কি এ রকম কিছু কল্পনা করা যেত?

কেন সরে গেল পাঠক আর দর্শক? দর্শক ও পাঠকদের এই ব্যাপক সরে যাওয়ার প্রতি প্রতিষ্ঠিত অভিজাত মহলের প্রতিক্রিয়াও প্রত্যাশিতভাবে ঔদ্ধত্যপূর্ণ। কেন মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তার গভীর বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন তারা বোধ করেনি। বরং তখনো অভিজাত প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তহীনভাবে বলে চলেছিল নীতিকথা। তাদের বার্তা একই রয়ে গেছে- শুধু তারাই, অর্থাৎ ‘দীক্ষিত’ শ্রেণি, সমাজের আলোচ্য বিষয় নির্ধারণ করার অধিকার রাখে। অর্থাৎ, যারা গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারক, তারাই ঠিক করবে পাঠক বা দর্শক কী পাবে। তারা মনে করে, যারা বিকল্প তথ্যসূত্র বেছে নেয়, তারা নাকি বিভ্রান্ত, ‘ভুল তথ্যের’ প্রভাবে আক্রান্ত এবং সঠিক দিকনির্দেশনার প্রয়োজন রয়েছে।

এই যখন অবস্থা, তখন নিউইয়র্ক টাইমসের সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। পত্রিকাটি শুধু টিকে থাকতেই সক্ষম হয়নি, বরং তাদের গ্রাহকসংখ্যাও বাড়িয়েছে। কয়েক দিন আগে তারা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক শেষে তাদের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ অতিক্রম করেছে। মাত্র তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে ৩ লাখ ১০ হাজার গ্রাহক যুক্ত করেছে।

ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন থেকে আয় আগের বছরের তুলনায় ১৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এআরপিইউ (প্রতি ব্যবহারকারী থেকে গড় আয়) শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭৭ ডলারে—মূলত প্রোমোশনাল অফার থেকে নিয়মিত মূল্যে স্থানান্তর এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে। মুদ্রিত সংস্করণ থেকে আয় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যাওয়া সত্ত্বেও কোম্পানির মোট রাজস্ব ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৭১২ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

তবে এমন সাফল্যের মাঝেও নিউইয়র্ক টাইমস খুব ভালোভাবেই বোঝে যে তারা এমন এক অঙ্গনে খেলছে, যেখানে মানুষের আস্থা এখন দুষ্প্রাপ্য সম্পদে পরিণত হয়েছে। পাঠক ক্রমেই নিজের অর্থ ও মনোযোগ ব্যয় করছে স্বাধীন কণ্ঠস্বরের পেছনে, প্রচলিত মাধ্যমের বদলে। তাহলে প্রশ্ন হলো—নিউইয়র্ক টাইমস এমন কী করেছে, যার ফলে তারা এখনো টিকে থাকতে পারছে?

বৈচিত্র্যময় কৌশল: সংবাদ থেকে ‘প্রয়োজনীয় সবকিছু’-র দিকে

নিউইয়র্ক টাইমস অত্যন্ত পরিকল্পিত ও প্রায় শল্যচিকিৎসার মতো নিখুঁত কৌশলে একটি ঐতিহ্যবাহী সংবাদপত্রকে রূপান্তর করছে ডিজিটাল অভ্যাসের পূর্ণাঙ্গ এক ইকোসিস্টেমে। এই বিষয়টি একটু গভীরভাবে বোঝা দরকার। নিউইয়র্ক টাইমসের আদল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কঠোর রাজনৈতিক বিশ্লেষণের পাশে স্বচ্ছন্দে জায়গা করে নিয়েছে ক্রসওয়ার্ড, রান্নার রেসিপি এবং ক্রীড়া বিশ্লেষণ।

২০২৬ সালের শুরুতে নিউইয়র্ক টাইমসে বহু-পণ্যভিত্তিক বা বান্ডল সাবস্ক্রিপশন ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৬৫ লাখে—মোট ১ কোটি ৩০ লাখ ৮ হাজার গ্রাহকের অর্ধেকেরও বেশি। এই ব্যবহারকারীরা কোম্পানিকে বেশি অনুগত পাঠক, দীর্ঘমেয়াদি সাবস্ক্রিপশন এবং শেয়ারহোল্ডারদের জন্য আরও বেশি আয় এনে দিচ্ছে।

নিউইয়র্ক টাইমস শুধু ট্রাম্প-সংক্রান্ত খবর নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বা আগ্রহকেই কাজে লাগাচ্ছে না; বরং মানুষের দৈনন্দিন চাহিদাকেও দক্ষভাবে অর্থে পরিণত করছে। এটাকে ‘সবকিছু একসঙ্গে’ বলা হচ্ছে। যেমন—ভালো খাবারের রেসিপি খোঁজা, ওয়ার্ডল (Wordle)-এর মতো শব্দের খেলায় জেতা, ওয়্যারকাটার (Wirecutter)-এর মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য ভ্যাকুয়াম ক্লিনার বেছে নেওয়া, কিংবা দ্য অ্যাথলেটিক (The Athletic)-এ খেলার বিশ্লেষণ দেখা। নিউইয়র্ক টাইমস কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মেরেডিথ ক্যাপিট লেভিয়েন এই ‘সবকিছু একসঙ্গে’ করার ধারণাকে বলেন ‘Essential Subscription’ বা ‘মৌলিক সাবস্ক্রিপশন’। এর ফলে সংবাদ কেনা আর এককালীন সিদ্ধান্ত থাকে না; বরং তা এমন এক অভ্যাসে পরিণত হয়, যেখান থেকে মিডিয়া-ক্লান্তির সময়েও বেরিয়ে আসা কঠিন। কোনো না কোনোভাবে নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে থাকতে হবেই।

ভিডিও কনটেন্টের প্রতিও নিউইয়র্ক টাইমস বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে তারা ছোট ভিডিওর পেছনে না ছুটে দীর্ঘ রিপোর্টধর্মী ভিডিও নির্মাণে জোর দিচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে নিজস্ব সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে তৈরি ভিডিওর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে ইউটিউবে ‘সংবাদ দেখার জন্য সবচেয়ে পছন্দের ব্র্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সেখানে এমন সাংবাদিকদের উপস্থিতি—যারা প্রয়োজনে ইরানের সীমান্তে দাঁড়িয়েও ক্যামেরার সামনে রিপোর্ট করতে পারেন—ছোট উল্লম্ব (ভার্টিক্যাল) ভিডিওর ভিড়ে আলাদা প্রতিযোগিতামূলক শক্তি তৈরি করছে। ফলে ইউটিউব এখন তাদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর একটি ‘ফানেলের ওপরের স্তর’—অর্থাৎ দীর্ঘ ভিডিও ও রিপোর্ট দর্শকদের কাছে বিনা মূল্যের কিন্তু উচ্চমানের টিজার হিসেবে কাজ করছে, যা পরে তাদের ওয়েবসাইট বা অ্যাপে এনে সাবস্ক্রিপশন নিতে উৎসাহিত করছে।

ডিজিটাল বিজ্ঞাপন থেকেও আয় চমকপ্রদভাবে ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৯ কোটি ৩৩ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। টানা দ্বিতীয় প্রান্তিকেও এই দ্বি-অঙ্কের প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, যখন একই সময়ে অধিকাংশ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান স্থবিরতা বা পতনের মুখে। এই সাফল্যের পেছনে শুধু বাজারের চাহিদা নয়, বরং ‘সংবাদ‍+খেলাধুলা+রান্নাবান্না+পণ্য পর্যালোচনা+পাজল বা শব্দ ভেদজাতীয় খেলা’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিজ্ঞাপনদাতারা এখানে কেবল নামহীন ট্রাফিক পাচ্ছেন না; বরং পাচ্ছেন স্পষ্ট আগ্রহসম্পন্ন, সক্রিয় ও মানসম্পন্ন পাঠকগোষ্ঠী—খাদ্য রসিক থেকে শুরু করে ক্রীড়াপ্রেমী পর্যন্ত।

নিউইয়র্ক টাইমসের অপারেশনাল ব্যয় মাত্র ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে, যার মূল কারণ ছিল মানসম্মত সাংবাদিকতা ও কনটেন্টে বিনিয়োগ। তবে এই ব্যয় বহুগুণে লাভজনক বলে প্রমাণিত হয়েছে। কোম্পানির মুনাফা ও মার্জিন ক্রমাগত বাড়ছে, যা দেখাচ্ছে- গভীরতা ও বৈচিত্র্যের ওপর বাজি ধরা এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের পেছনে মরিয়া হয়ে দৌড়ানোর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর কৌশল। কথাটা দ্বিতীয়বারের মতো ভিন্নভাবে বলা দরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগারিদমের হয়তো মানে আছে, কিন্তু পত্রিকা বা মিডিয়াকে চলতে হলে গভীরতা ও বৈচিত্র্য অবশ্যই প্রয়োজনীয়। শুধু হালকা বিনোদন বেশি দিন পাঠক বা দর্শক ধরে রাখতে পারে না।

ফলে তথাকথিত ‘পুরোনো ধাঁচের’ নিউইয়র্ক টাইমসই আজ বাজারের সবচেয়ে আধুনিক খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। অন্যরা এখনো বিতর্ক করছে- তাদের কনটেন্ট কি পেইড হবে, নাকি ফ্রি থাকবে; আর নিউইয়র্ক টাইমস নির্ভারভাবে দুটোই বিক্রি করছে- তাও আকর্ষণীয়, ব্যয়বহুল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, টেকসই এক কাঠামোর মধ্যে।

ডুবে যাচ্ছে যারা

যখন নিউইয়র্ক টাইমস আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাদের ডিজিটাল সাম্রাজ্য বিস্তার করছে এবং সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে, তখন দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট যেন একটি পাঠ্যপুস্তকে ছাপা হওয়ার যোগ্য একটা বিষয় হয়ে উঠছে। বিষয়টির নাম হতে পারে, ‘কীভাবে একসময়কার মহান সংবাদপত্র নতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-নির্ভর বাস্তবতায় টিকে থাকার পথ খুঁজে না পেয়ে সংকটে পড়ল।’

২০২৫ সালে ওয়াশিংটন পোস্টের দৈনিক গড় মুদ্রিত প্রচারসংখ্যা ২১ দশমিক ২ শতাংশ কমে দাঁড়ায় মাত্র ৮৭ হাজার ৫৭৬ কপিতে—যা যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ২৫টি পত্রিকার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। ডিজিটাল গ্রাহকসংখ্যা, যা একসময় প্রায় ৩০ লাখের কাছাকাছি ছিল, তা নেমে আসে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ লাখে। এর পেছনে যে কারণগুলো ছিল, তার একটি হলো ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন না করা। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো, সম্পাদকীয় বা মতামত-সংক্রান্ত বিভাগের আমূল পরিবর্তন এবং কয়েক দফায় ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই।

অনেকের নিশ্চয়ই মনে পড়ে যাবে, শুধু এক দফা ছাঁটাইয়ে—যেখানে ৩০০ জনের বেশি সাংবাদিক, অর্থাৎ সম্পাদকীয় বিভাগের এক-তৃতীয়াংশ কর্মী চাকরি হারান, আর তাতে পত্রিকাটি মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ৬০ হাজারের বেশি ডিজিটাল সাবস্ক্রাইবার হারায়।

এসব ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। ওয়েব ট্রাফিক তীব্রভাবে কমেছে, এবং আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা থেকে শুরু করে খেলাধুলা ও বই বিষয়ক বিভাগ পর্যন্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হারিয়ে গেছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রচেষ্টা তাদের বিশ্বস্ত প্রগতিশীল পাঠকদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। নতুন বাস্তবতার মধ্যে সম্পাদকীয় নীতিতে লিবার্টারিয়ান ধাঁচের মোড় নেওয়ার ঘটনাও ছিল। অথচ বিপরীত দিকের পাঠকদের কাছ থেকেও পত্রিকাটি উল্লেখযোগ্য সমর্থন আনতে পারেনি। ফলে, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত ওয়াশিংটন পোস্ট এখন নিজেরই ফিকে ছায়ায় পরিণত হয়েছে। তাদের সংকুচিত নিউজরুম এখন স্থিতিশীলতার মরিয়া অনুসন্ধানে ব্যস্ত। অথচ মনে হচ্ছে, পত্রিকাটির মালিক জেফ বেজস যেন এই সংকটকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

অবস্থা খুব ভালো নয় ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিরও। যে প্রতিষ্ঠানটি একসময় গণমাধ্যমভিত্তিক জনসেবার প্রতীক ছিল, এখন সেই বিবিসিকেই অনেকটা এমন এক বয়স্ক আত্মীয়ের মতো মনে হয়, যিনি কিছুতেই মানতে চান না যে সময় বদলে গেছে। যুক্তরাজ্যে লাইসেন্স ফি-নির্ভর অর্থায়ন মডেল (যা ২০২৬ সালে বেড়ে ১৮০ পাউন্ড হয়েছে) এখন ভেঙে পড়ার মুখে। ফি দিতে আগ্রহী পরিবারের সংখ্যা নেমে এসেছে ৮০ শতাংশে, ফাঁকি দেওয়ার হার পৌঁছেছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে, আর যারা অর্থ দেয় না বা আনুষ্ঠানিকভাবে বিবিসি বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে—তাদের কারণে বছরে প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতি হচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে আগামী দুই বছরে ৫০ কোটি পাউন্ড বাজেট কমাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য পেইড মডেল চালুর চেষ্টা করছে—যেমন যুক্তরাষ্ট্রে এই পেইড মডেলে গ্রাহকপ্রতি দিতে হবে মাসে ৮ দশমিক ৯৯ ডলার—তা আসলে কোনো সুপরিকল্পিত কৌশল হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মানতে চাইছেন না। এটা বরং হতাশাগ্রস্ত পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্ক টাইমস যেন বাকিদের প্রতি বিদ্রূপ ছুড়ে দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি সফল হচ্ছে মূলত কঠোরভাবে পেইড মডেলের ওপর নির্ভর করে, তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অঙ্গভঙ্গির ওপর কম নির্ভরশীল থেকে, এবং একইসঙ্গে ‘মানসম্মত সাংবাদিকতা’-র ভাবমূর্তি ধরে রেখে রেসিপি, ক্রসওয়ার্ড ও ক্রীড়া বিশ্লেষণও বিক্রি করতে পারার দক্ষতার মাধ্যমে। নিউইয়র্ক টাইমস খুব স্বাভাবিকভাবেই একদিকে বামপন্থী ক্ষোভ, অন্যদিকে ডানপন্থী আগ্রহ—এমনকি মানুষের প্রতিদিনের সাধারণ অভ্যাসকেও সফলভাবে অর্থে পরিণত করছে। অর্থাৎ বিভিন্নভাবে বিভাজিত মানুষদের সবার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে আগ্রহ দেখাতে পারছে নিউইয়র্ক টাইমস।

ট্রাম্পের ‘সাদা তালিকা’ এবং হোয়াইট হাউসের সঙ্গে নিউইয়র্ক টাইমস-এর সম্পর্কের বিবর্তন অনেকেই জানেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ গণমাধ্যমের প্রতি এক হিসাবি, প্রায় নাটকীয় দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করেছে। প্রশাসন যেন নিজেদের একটি ‘সাদা তালিকা’ তৈরি করেছে। এই তালিকায় এমন সব গণমাধ্যম ও সাংবাদিকেরা রয়েছে, যারা অন্তত পুরোপুরি বৈরী নয়। তাদের জন্য হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং, প্রেস পুল এবং বিশেষ মন্তব্যের দরজা খোলা থাকে। অন্যদিকে ঐতিহ্যগত সমালোচনামূলক মাধ্যমগুলোকে প্রায়ই বয়কট, প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধতা এবং ট্রুথ সোশ্যাল-এ প্রকাশ্য আক্রমণের মুখে পড়তে হয়।

নিউইয়র্ক টাইমস দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের কঠোর সমালোচক। রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে বহু বছরের অনুসন্ধান, দুটি অভিশংসন প্রক্রিয়া, অস্বস্তিকর জনমত জরিপ এবং ইরান-সংক্রান্ত পররাষ্ট্রনীতির বিশদ বিশ্লেষণ—সবকিছুতেই তারা ধারালো অবস্থান নিয়েছে। তবু পত্রিকাটিকে বাগে আনা যায়নি। বরং তারা এখনো তীক্ষ্ণ ও অস্বস্তিকর প্রতিবেদন প্রকাশ করছে, একই সঙ্গে এমন এক শীতল বাস্তববাদ দেখাচ্ছে যা তাদের নির্দিষ্ট মাত্রার হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে সাহায্য করছে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে—এই মনোযোগের পুরো নাটকটিকেই অর্থে পরিণত করতে দিচ্ছে।

২০২৫–২০২৬ সালে নিউইয়র্ক টাইমস-এর গ্রাহক বৃদ্ধির পেছনে এই রাজনৈতিক মেরুকরণ বড় ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকেরা যেমন ‘ভুয়া খবর’-এর প্রমাণ খুঁজতে নিউইয়র্ক টাইমস পড়ছে, তেমনি তার আপসহীন বিরোধীরাও গভীর বিশ্লেষণের আশায় সাবস্ক্রিপশন কিনছে। এদিকে ট্রাম্পপন্থী গণমাধ্যম—যেমন নিউজম্যাক্স, দি ব্লেজ, দি ডেইলি ওয়্যার যখন প্রেস পুলে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে, তখনো নিউইয়র্ক টাইমস দক্ষতার সঙ্গে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য ধরে রেখেছে। তারা একইসঙ্গে ‘স্বাধীন’ প্রিমিয়াম গণমাধ্যমের ভাবমূর্তি বজায় রাখছে এবং প্রেসিডেন্টের প্রতিটি নতুন ক্ষোভকে নিজেদের লাভে কাজে লাগাচ্ছে।

সম্পর্ক তাই উত্তেজনাপূর্ণই রয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে তা আশ্চর্যজনকভাবে পারস্পরিক লাভজনক। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়মিতভাবেই নিউইয়র্ক টাইমসকে ‘ব্যর্থ’, ‘জনগণের শত্রু’ এমনকি ‘জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি’ বলে আক্রমণ করেন। অথচ পত্রিকাটি প্রতিটি আক্রমণকেই নতুন সাবস্ক্রিপশনের শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত করে। ওয়াশিংটন পোস্ট যেখানে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে রাজনৈতিক দুই দিকেরই আস্থা হারিয়েছে, সেখানে নিউইয়র্ক টাইমস স্পষ্ট অবস্থান ধরে রেখেছে: ‘আমরা ক্ষমতার বন্ধু নই; আমরা চিন্তাশীল আমেরিকার জন্য সেরা পণ্য।’

ফলে, যখন অনেক গণমাধ্যম টিকে থাকার জন্য আপস বা রূপান্তরের চেষ্টায় ডুবে যাচ্ছে, তখন নিউইয়র্ক টাইমস সেই খেত থেকেই ফসল তুলছে, যেটিকে তারা নিজেরাই কঠোর সমালোচনার জলসিঞ্চন করেছিল। ট্রাম্প-২ যুগে যেন সবচেয়ে লাভজনক অবস্থান হলো—তার সবচেয়ে প্রিয় বিরক্তিকর প্রতিপক্ষ হয়ে থাকা; অবশ্য শর্ত একটাই: সেই বিরক্তিকর অবস্থানকে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি অর্থ প্রদানকারী পাঠকে রূপান্তর করার দক্ষতা থাকতে হবে।

বাস্তব ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

গোটা গণমাধ্যম জগতের অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাফল্য নিঃসন্দেহে চিত্তাকর্ষক। তবে এই সাফল্য মোটেও মেঘহীন নয়; এর ভেতরে এমন কিছু ঝুঁকি লুকিয়ে আছে, যা ভবিষ্যতে বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

ছাপা পত্রিকা থেকে আয় অব্যাহতভাবে কমছেই। ২০২৫ সালেও তা আরও কয়েক শতাংশ কমেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে—কাগজের সংবাদপত্র ক্রমশ বয়স্ক ও সচ্ছল পাঠকদের জন্য ব্যয়বহুল একটি বিশেষায়িত পণ্যে পরিণত হচ্ছে। একই সঙ্গে কনটেন্ট তৈরির ব্যয়ও বাড়ছে। ভিডিও, আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা এবং নতুন পণ্যে বিনিয়োগের কারণে অপারেশনাল খরচ সাম্প্রতিক প্রান্তিকগুলোতে ৮–৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। যদিও আপাতত বাড়তি সাবস্ক্রাইবারের কারণে সেই ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। এমন এক সময়ে, যখন গড় আমেরিকান ইতিমধ্যেই আটটির বেশি ডিজিটাল সেবার জন্য অর্থ পরিশোধ করছে এবং ৪১ শতাংশ ভোক্তা ‘সাবস্ক্রিপশন ক্লান্তি’-র অভিযোগ করছে, তখন ‘সংবাদ ক্লান্তি’ এবং নতুন মূল্যবৃদ্ধির পর গ্রাহক হারানোর ঝুঁকিও যথেষ্ট বাস্তব।

অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা ট্রাম্প-২ যুগের রাজনৈতিক নাটকের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে গেলে নতুন সাবস্ক্রাইবার বৃদ্ধির গতি মন্থর হতে পারে। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ ১ কোটি ৫০ লাখ গ্রাহকের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বর্তমান গতিধারা বজায় থাকলে অর্জনযোগ্য মনে হলেও, এর জন্য ক্রমাগত নতুন আকর্ষণ তৈরি করতে হবে।

রাজনৈতিক প্রতিবেদনকে ঘিরে নিউইয়র্ক টাইমস-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী পক্ষপাতের অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ডানপন্থী মহল তো বটেই, অনেক স্বাধীন পর্যবেক্ষকও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ‘বামঘেঁষা’ অবস্থানের অভিযোগ তোলেন। যদিও বাস্তবতা দেখায় যে এই মডেলটি অধিকাংশ প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় ভালো কাজ করছে, তবু সুনাম-সংক্রান্ত ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

তবুও বর্তমান সময়ে নিউইয়র্ক টাইমস-এর কৌশল আমেরিকান বাজারে সবচেয়ে সফল কৌশলগুলোর একটি। অন্য অনেক গণমাধ্যম যখন নতুন ক্ষমতাকাঠামোকে সন্তুষ্ট করার মরিয়া চেষ্টা করছে, অথবা উল্টো আরও বেশি আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়ায় ডুবে যাচ্ছে, তখন নিউইয়র্ক টাইমস শান্তভাবে বিনিয়োগ করছে পণ্য, পাঠকগোষ্ঠী এবং বহুমাত্রিক কনটেন্টে। ফলস্বরূপ, এমনকি প্রকাশ্যভাবে বৈরী মনোভাবাপন্ন প্রেসিডেন্টের সময়েও প্রতিষ্ঠানটি সমাজের মেরুকরণকে স্থিতিশীল অর্থপ্রবাহে রূপান্তর করে চলেছে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো—এই সূত্র কত দিন কার্যকর থাকবে? আপাতত নিউইয়র্ক টাইমস শক্তিশালী ব্র্যান্ড, মানসম্মত কনটেন্ট এবং বিস্তৃত ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে পাঠকদের ধরে রাখতে পারছে। কিন্তু যদি রাজনৈতিক আলোচনায় ক্লান্তি এবং সাবস্ক্রিপশন-বিরক্তি আরও বাড়তে থাকে, তাহলে এমন মডেলও একসময় সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারে। তবে আপাতত এটি কাজ করছে—এবং বেশ কার্যকরভাবেই কাজ করছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত