Ajker Patrika

ভারতে ব্যবসা ও বিনিয়োগে জ্যোতিষশাস্ত্রের বাজার এখন ৭০ হাজার কোটি টাকা, কীভাবে হলো

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ভারতে ব্যবসা ও বিনিয়োগে জ্যোতিষশাস্ত্রের বাজার এখন ৭০ হাজার কোটি টাকা, কীভাবে হলো
ভারতে এখন অর্থনৈতিক জ্যোতিষশাস্ত্রের রমরমা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

আগামী নভেম্বরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান উৎসব দীপাবলি উপলক্ষে ভারতের শেয়ারবাজারের ব্রোকার এবং তাঁদের পরিবারগুলো একত্র হবেন এক ঘণ্টার একটি বিশেষ লেনদেন সেশনে। ‘মহুরত ট্রেডিং’ নামের এই বিশেষ সময়ে সমৃদ্ধি কামনায় প্রতীকী শেয়ার কেনাবেচা করা হয়। বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (বিএসই) লবিতে থাকা ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মীর চরণে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ পূজা। একই সময়ে বিভিন্ন বিজনেস টিভি চ্যানেলে ফান্ড ম্যানেজারদের সুদের হার বা প্রতিষ্ঠানের আয় নিয়ে বিশ্লেষণের পাশাপাশি দেখা যায় জ্যোতিষীদের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান গণনা।

বিশ্বজুড়ে ট্রেডারদের মধ্যে এক ধরনের অলৌকিক বা লোকবিশ্বাসের প্রবণতা নতুন কিছু নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিনিয়োগকারী যেমন বিশেষ টাই পরাকে ‘সৌভাগ্যের প্রতীক’ মনে করেন, তেমনি জাপানের শেয়ারবাজারে বছরের প্রথম নিলামকে দেখা হয় ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের নামে চার্ট দেখে ‘হেড অ্যান্ড শোল্ডার’ কিংবা ‘রাইজিং ওয়েজ’-এর মতো নকশা খুঁজে বেড়ানোও এক ধরনের জনপ্রিয় চর্চা।

তবে ভারতে লোকবিশ্বাসের এই প্রবণতা রূপান্তরিত হয়েছে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা) এক বিশাল বাজারে।

বিশ্বাস ও বিনিয়োগের মেলবন্ধন

পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপ অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করেন। শিশু জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তৈরি করা হয় কোষ্ঠী। অনেক সময় চিকিৎসকেরাও পুরোহিতের নির্ধারিত ‘শুভ সময়ে’ সিজারিয়ান সেকশন করার চেষ্টা করেন। নতুন গাড়ি বা বাইক ডেলিভারি নেওয়ার ক্ষেত্রেও মেনে চলা হয় বিশেষ দিনক্ষণ।

অর্থনীতির মতো অনিশ্চিত ক্ষেত্রেও এই বিশ্বাসের ছোঁয়া পাওয়া যায়। ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় মিউচুয়াল ফান্ড প্রতিষ্ঠানের এক ফান্ড ম্যানেজার তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জ্যোতিষীদের পরামর্শ নেন। তাঁর মতে, মূলধনি মৌলিক বিশ্লেষণ (ফান্ডামেন্টালস) যদি হয় গাড়ির ‘ইঞ্জিন’, তবে জ্যোতিষশাস্ত্র হলো সেই ‘'স্টিয়ারিং’ যা সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়।

এমনই একজন ছিলেন পুরবেশ শেলাটকর, যিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত উচ্চ-নিট-সম্পদের বিনিয়োগকারীদের জন্য দুটি অলটারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড পরিচালনা করতেন। তিনি তাঁর বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রায় অর্ধেক গুরুত্ব দিতেন জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর। একবার নিজের কোষ্ঠীতে মঙ্গল গ্রহের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে তিনি জিন্দাল স্টিলের শেয়ার কিনেছিলেন এবং সেখান থেকে লাভও পেয়েছিলেন। তাঁর মতে, জ্যোতিষশাস্ত্র হলো কুয়াশার মধ্যে গাড়ির ‘ফগ লাইট’-এর মতো—যখন দৃশ্যমানতা ভালো থাকে তখন এর প্রয়োজন নেই, কিন্তু চারপাশ অনিশ্চিত হয়ে উঠলে এটি দিক চেনাতে সাহায্য করে।

প্রযুক্তি ও স্টার্টআপের নতুন দিগন্ত

বর্তমানে খুচরা বিনিয়োগকারীদের কাছে জ্যোতিষভিত্তিক আর্থিক পূর্বাভাসের নানা সুযোগ রয়েছে। শেয়ারবাজারের গতিবিধি জানার জন্য ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার রুপি খরচে অনলাইন কোর্স করা যাচ্ছে।

এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বহু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। উদাহরণস্বরূপ, ‘ইনস্টাঅ্যাস্ট্রো’ (InstaAstro) নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যার ব্যবহারকারী সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখের বেশি, সম্প্রতি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার অর্থায়ন পেয়েছে। এ ছাড়া ‘অ্যাস্ট্রোটক’ (AstroTalk)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতি মিনিটে ১৪ থেকে ২০০ রুপি ফি নিয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে। তারা ‘ধন যোগ’ ব্রেসলেটের মতো জিনিসও বিক্রি করে থাকে।

বিজ্ঞান কী বলে?

তবে লোকবিশ্বাস কিংবা জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য পাওয়া যায়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। চীনের তাইওয়ানের বাজারে করা কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বিনিয়োগকারীরা ‘৮’ নম্বরযুক্ত (যা সেখানে শুভ মনে করা হয়) প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত দাম দিয়ে শেয়ার কেনেন এবং ‘৪’ নম্বরযুক্ত (যার উচ্চারণ মৃত্যুর শব্দের কাছাকাছি) প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে চলেন। দেখা গেছে, এতে করে বিনিয়োগকারীরা কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হন।

ভারতেই এক আর্থিক বিশ্লেষক কোভিডের সময়ে জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর নির্ভর করে ফিউচার ও অপশনস ট্রেডিং করার চেষ্টা করে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন।

ভারতের নতুন প্রজন্মের কাছে এখন মূলধন খাটানোর জন্য মিউচুয়াল ফান্ড, ইকুইটি এবং ডেরিভেটিভসের মতো নানামুখী পথ খোলা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক গাণিতিক মডেলগুলো বিশাল ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারলেও, শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ ঠিক কী হবে তা কেউ শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। জ্যোতিষশাস্ত্রও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে ভারতের শেয়ারবাজারে যুক্ত বহু বিনিয়োগকারীর কাছে বৈজ্ঞানিক যুক্তির চেয়ে এই শুভ-অশুভ বিশ্বাসের প্রভাব এখনো অনেক বেশি রূপক ও শক্তিশালী।

তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত