বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি শব্দবন্ধ হলো হরিলুট। আমরা প্রায় সবাই এ শব্দবন্ধটি সরাসরি প্রয়োগ না করলেও বিভিন্ন ঘটনাচক্রে কমবেশি শুনেছি। বর্তমান সময়ে, বিশেষ করে হরিলুট শব্দের নেতিবাচক অর্থটির সঙ্গেই আমরা অধিক পরিচিত। কিন্তু হরিলুট শব্দের আক্ষরিক অর্থটি কী? শব্দবন্ধটি কীভাবে নেতিবাচক অর্থে বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছে? আজ জানব হরিলুট শব্দের আদ্যোপান্ত।
সংস্কৃত ‘হরি’ শব্দের সঙ্গে বাংলা ‘লুট’ শব্দ সহযোগে হরিলুট শব্দের উদ্ভব। এটি বিশেষ্য পদ। হরি বলতে সাধারণত ভগবান শ্রীবিষ্ণু, নারায়ণ অথবা শ্রীকৃষ্ণকেই মান্য করা হয়। বাংলা লুট শব্দের অর্থ বলপূর্বক হরণ বা লুণ্ঠন। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত √লুঠ্ ধাতু থেকে।
এমনকি ইংরেজি ‘লুট’ (Loot) শব্দটির ব্যুৎপত্তির খোঁজ করলে জানা যায় সংস্কৃত √লুঠ্ ধাতু থেকেই ইংরেজি ‘লুট’ শব্দের উৎপত্তি। সনাতন ধর্মে হরির লুট বলতে বোঝায়, হরিনাম সংকীর্তনের মধ্যে বা শেষে সমাগত ভক্তবৃন্দের মধ্যে হরির নামে মুঠো মুঠো বাতাসা, মণ্ডা, নকুলদানা, কদমা প্রভৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার সংস্কারবিশেষকে। প্রকৃতপক্ষে ভক্তবৃন্দের মাঝে হরির প্রসাদ বিতরণের এই ধর্মীয় প্রথাটিই হরিলুট নামে খ্যাত।
কখনো কখনো কোনো কোনো ভক্ত ঈশ্বরের কাছে কিছু কামনা করে তাঁর অভীষ্ট লাভের জন্য হরির লুটের মানত করে থাকেন, অর্থাৎ তাঁর কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য পূর্ণ হলে, তিনি হরিনাম সংকীর্তনের আয়োজন করবেন এবং সেখানে সমাগত ভক্তবৃন্দের উদ্দেশে হরিলুট দেবেন। এ তো গেল হরিলুট শব্দবন্ধের আক্ষরিক অর্থের কিছু বিবেচ্য বিষয়। এবার আসি এর ব্যুৎপত্তি প্রসঙ্গে।
হরিলুট শব্দবন্ধটির ব্যুৎপত্তিগত দিকটি বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, আগে অনেকের ধারণা ছিল ‘লুঠ’ শব্দ থেকেই হরিলুট বা হরির ‘লুট’ শব্দবন্ধের সৃষ্টি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জানা যায়, হরিলুট কোনোভাবেই তথাকথিত লুঠের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। শুরুর দিকে শব্দবন্ধটি ছিল ‘হরির লুস’। প্রাচীন বাংলা ভাষায় ‘লুস’ শব্দের অর্থ হলো ‘ভোজন’।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অভিধানেও ‘লুস’ শব্দটির অর্থ দেওয়া হয়েছে ‘ভোজন’। সে হিসেবে হরির লুস শব্দটির অর্থ হলো হরির ভোজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ‘লুস’ শব্দটি ‘লুট’ শব্দে পরিণত হলো কী করে? ভাষাবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পরিবর্তন সাধিত হয়েছে ‘লোকনিরুক্তি’ নামক রূপতাত্ত্বিক একটি পদ্ধতির মাধ্যমে। হরিলুট শব্দবন্ধটি লোকনিরুক্তি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মুখে এসে ‘হরিলুট’ হয়ে গেছে।
প্রাসঙ্গিকভাবেই প্রশ্ন আসে, তাহলে লোকনিরুক্তি কী? খুব ছোট করে বললে বলতে হয়, আমাদের একটি সাধারণ ভাষিক প্রবণতা হলো আমরা চিরকালই কোনো অচেনা শব্দকে চেনা ছকে আবদ্ধ করতে ক্রমাগত চেষ্টা বা পছন্দ করি। কোনো অপরিচিত বা স্বল্প ব্যবহৃত শব্দ যখন ধ্বনিগত সাদৃশ্য আছে এমন একটি পরিচিত শব্দের রূপ পরিগ্রহ করে, তখন তাকে লোকনিরুক্তি বলে। প্রকৃতপক্ষে, দীর্ঘ সময় ধরে ভিন্ন ভাষাভাষী সমাজের সংযোগ এবং পারিপার্শ্বিক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ফলে যখন কোনো একটি শব্দ অন্য একটি শব্দের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, ফলে নতুন শব্দটি আমাদের কাছে অধিক পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তাকেই লোকনিরুক্তি বলে।
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। যেমন পর্তুগিজ শব্দ ‘আর্মারিও’ ও ‘আনানাস’ থেকে লোকনিরুক্তির মাধ্যমে যথাক্রমে ‘আলমারি’ ও ‘আনারস’ শব্দদ্বয় রূপান্তরিত হয়েছে। আবার ইংরেজি শব্দ ‘আর্ম চেয়ার’ লোকনিরুক্তির ফলে ‘আরাম চেয়ার’ বা ‘আরাম কেদারা’ হয়েছে। যেহেতু চেয়ারে বসলে আরাম হয়, তাই ‘আর্ম চেয়ার’ শব্দটি খুব সহজেই লোকনিরুক্তির ফলে ‘আরাম চেয়ার’ হয়ে গেছে।
ঠিক একই রকম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ‘হরির লুস’ কথাটি লোকনিরুক্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মুখে এসে ‘হরিলুট’ হয়ে গেছে। মূলত হরি বা ঈশ্বরের উদ্দেশে নিবেদিত অর্ঘ্য, বাতাসা, কদমা, নকুলদানা, মিষ্টি প্রভৃতি প্রসাদ ভক্তদের মাঝে ছুড়ে দেওয়ার সংস্কারটি ‘হরির লুস’ নামেই প্রচলিত ছিল। কিন্তু ঘটনার অবস্থাদৃষ্টে দেখা যায়, হরিপ্রদত্ত এই প্রসাদ যাদের শক্তি বা লোকবল বেশি, তারাই কেবল সংগ্রহ করতে পারছে, বাকিরা হুড়োহুড়ি করেও কিছুই সংগ্রহ করতে পারছে না। কেবল অসহায়ের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। প্রসাদ সংগ্রহের এই ঘটনাক্রম অনেকটাই নেতিবাচক ‘লুট’ শব্দের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই ‘লুস’ শব্দটি লোকনিরুক্তি প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে যায় ‘লুট’। আর ‘হরির লুস’ হয়ে যায় ‘হরিলুট’।
বর্তমান সময়ে হরিলুট শব্দবন্ধের আক্ষরিক অর্থটি কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আচাররূপে ব্যবহৃত হলেও নেতিবাচক অর্থটিই আমাদের সমাজের সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। নেতিবাচক অর্থে বলপূর্বক লুণ্ঠন বা আত্মসাৎ অর্থটির প্রয়োগই আমাদের জাতীয় জীবনে বেশি চোখ রাঙাচ্ছে। সুতরাং আমাদের নীতি-নৈতিকতাবোধকে জাগ্রত করে উপযুক্ত নজরদারির মাধ্যমেই কেবল হরিলুট নামের ব্যাধি ঠেকানো সম্ভব।
লেখক: আভিধানিক ও প্রাবন্ধিক

ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) সুগন্ধি খুব পছন্দ করতেন এবং নিয়মিত ব্যবহার করতেন। সুগন্ধির প্রতি প্রিয় নবী (সা.)-এর বিশেষ অনুরাগ ছিল। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘চারটি বস্তু সব নবীর সুন্নত—আতর, বিয়ে, মেসওয়াক ও লজ্জাস্থান আবৃত রাখা।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২২৪৭৮)
৫ দিন আগে
গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে সর্বশেষ (৫৪ তম) সাক্ষীর জেরা শুরু হয়েছে। এই মামলাটির বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ।
০৬ অক্টোবর ২০২৫
‘দুই দিন আগেই বাড়ি থেকে পাথরঘাটায় চলে এসেছি। এখন পুরোনো জাল সেলাই করছি। এক সপ্তাহের বাজারও করে এনেছি। আজ বিকেলে সাগর মোহনায় যাব, গভীর রাত থেকে জাল ফেলব।’ কথাগুলো বলছিলেন বরগুনা সদরের বাইনচটকী এলাকার জেলে হোসেন আলী। গতকাল বুধবার সকালে বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে কথা হয় তাঁর...
১২ জুন ২০২৫
ভারতের স্থলবন্দর নিষেধাজ্ঞার পর সীমান্তে আটকে থাকা তৈরি পোশাক, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ট্রাকগুলো ফেরত আনছেন রপ্তানিকারকেরা। তবে যেসব ট্রাক বন্দরে ঢুকে গিয়েছিল, সেগুলো ভারতে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব ট্রাক ঢুকতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।
১৯ মে ২০২৫