Alexa
রোববার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

সেকশন

epaper
 

‘আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি’

সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের সব সমস্যার সমাধান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকেই যেন ভাবতে হয়। অব্যবহৃত বাড়ি নিয়েও তিনি ভেবেছেন। তাঁর নিজস্ব ভাবনায় ১০টি অগ্রাধিকারভিত্তিক উদ্যোগ রয়েছে।

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:৩৫

আমাদের দেশের আশ্রয়ণ প্রকল্প অনেকটাই সফল হয়েছে। ছবি: আজকের পত্রিকা গত শতাব্দীর মধ্যভাগে বাঙালি মধ্যবিত্তের উন্মেষ ঘটার সময় সমাজের প্রাগ্রসর অংশ শিক্ষা ও জীবিকার জন্য গ্রাম ছেড়েছে। আমাদের পিতৃপুরুষের এ প্রজন্মটি আবহমান বাঙালি জাতির সব প্রজন্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠতর প্রজন্ম। তারা যেমন ভূমিপুত্র হিসেবে হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতির যোগ্যতর উত্তরাধিকার, তেমনি ব্যক্তি হিসেবে পূর্ণ স্বাবলম্বী মানুষ। তাদের হাত ধরেই ঘটেছে বাঙালির শ্রেণি উত্তরণ। তৈরি হয়েছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ। এই প্রজন্মই আমাদের দেশপ্রেম শিখিয়েছে, ভেঙেছে পরাধীনতার শৃঙ্খল, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তারাই এনেছে আমাদের স্বাধীনতা। নগরায়ণের বিস্তৃতিও ঘটেছে তাদের হাত ধরেই। এরপর স্বাধীন দেশের দুটি প্রজন্ম গ্রাম থেকে মফস্বল, মফস্বল থেকে বড় শহর বা রাজধানী; তারপর একটা বড় অংশের প্রবাসজীবন। প্রজন্মের ব্যবধানে কমতে থাকে 
শিকড়ের টান।

বিকাশমান নগরায়ণ ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় মধ্যবিত্তের একটা অংশ আজ দেশে-বিদেশে স্থায়ী হচ্ছে, যে কারণে অনেকেরই আদি বসতবাড়ি শূন্যভিটায় রূপান্তরিত হচ্ছে। প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শহরে এখন অনেক বাড়িতে সন্ধ্যাবাতিও জ্বলে না বছরের পর বছর। আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় অভিসম্পাতমূলক 
একটা  গালি আছে, ‘এমন দিন আইবে, তোর পোতায় হাউজ্জা বাত্তি জ্বালাইন্যা লোকও পাবি না!’ আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই অভিসম্পাতই যেন সত্যি হতে চলছে। ফলে গ্রাম ও জনপদে একটা অসামাজিক ও দুর্বৃত্তায়িত সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

তৎকালীন সমাজে সবার মতো আমার বাবাও ছিলেন বংশপরম্পরায় কৃষকের ছেলে। গ্রামের মধ্যে তিনিই প্রথম শহরে এসে লেখাপড়া শিখে চাকরি নিয়ে পটুয়াখালী শহরে থিতু হলেন। টানাপোড়েনের সংসারে বাবা আমাদের সব চাচা, মামা, খালা এবং তাঁদের সন্তানসহ অনেক নিকটাত্মীয়কে গ্রাম থেকে এনে আমাদের শহরের বাসায় রেখে পড়াশোনা করিয়েছেন নিজের দায়িত্বে। এখন সবাই দেশ-বিদেশে স্থায়ী আবাস গড়েছেন।

বাবার মৃত্যুর পর বড় ভাইয়ের উদ্যোগে আমরা তিন ভাই খুব কষ্ট করে আমাদের সেই ভাঙাচোরা সুখের নীড়টিতে বেশ দৃষ্টিনন্দন একটা দোতলা বাড়ি করেছি।যে বাড়িটি জন্ম থেকেই ছিল কোলাহলপূর্ণ, জীবন্ত, টগবগে সেই বাড়িতে আমার বৃদ্ধ মা আজ একা থাকেন। মা চোখ বুজলে কী হবে, জানি না। আমাদের প্রজন্মের প্রায় সবারই যাপিত জীবনের গল্পটা এমনই।

 শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দ ভৈরবী কবিতাটা তাই আকৈশর আমাকে নস্টালজিক করে, 

‘আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি
এমন ছিল না আষাঢ় শেষের বেলা
উদ্যানে ছিল বরষা-পীড়িত ফুল
আনন্দ ভৈরবী।’

এই নস্টালজিয়া বা আবেগের আলাপ বাদ দিই, একটু বাস্তবতার চোখ দিয়ে হিসাব করি। এই যে আমাদের কয়েক কোটি টাকা মূল্যের পটুয়াখালীর এই বাড়ি, দুই প্রজন্মের সারা জীবনের বিনিয়োগ, এর ভবিষ্যৎ কী? এত বিশাল বিনিয়োগের দুই-চার বছর পর যদি এই বাড়ি আর ব্যবহৃত না হয়? তাহলে তো তা শুধু আমার পরিবারের অপচয় নয়, রাষ্ট্রেরও অপচয়।

ইংল্যান্ডে এখন সিলেটবাসীদের তৃতীয় প্রজন্ম কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে। বৃহত্তর সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেক প্রবাসী নিজ গ্রামে প্রাসাদোপম বাড়ি করেছে, যা গোটা বছর প্রায় জনমানবশূন্য থাকে। অনেক কষ্ট করে সব সন্তান-নাতি-নাতনিসহযোগে জীবনে একবারই হয়তো নতুন বাড়িতে এসেছেন! এ ছাড়া নিজে হয়তো দুই-এক বছর পর পর কদিন ছুটি কাটানোর জন্য আসেন, তারপর আবার শূন্য। তিনি চোখ বুজলে এই বাড়ির ভবিষ্যৎ কী? সমস্যাটা কি শুধু বাংলাদেশের? না, উন্নত দেশে অব্যবহৃত বাড়ি আমাদের তুলনায় আরও বেশি।

উন্নত দেশগুলো এই অব্যবহৃত সম্পদ পুনর্ব্যবহার করার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। যেমন ২০১৮ সালের জরিপ অনুসারে, জাপানে ৬২ দশমিক ৪ মিলিয়ন বাড়ির মধ্যে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ, মানে ৮ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন বাড়ি পরিত্যক্ত। খোদ টোকিও শহরে এর পরিমাণ ১০ শতাংশ। নাম্যুরা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, জাপানে ২০৩০ সালের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ বাড়ি পরিত্যক্ত হবে, ৯০০ ছোট শহর ২০৪০ সালের মধ্যে হারিয়ে যাবে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক প্রদেশের স্থানীয় প্রশাসন প্রতিটি বাড়ি মাত্র ৪৫৫ ডলার তথা ৫০ হাজার ইউয়ানে বিক্রি করছে এবং সেখানে ফার্মল্যান্ড গড়ার জন্য অনুদানও দিচ্ছে সরকার। ইতালির উত্তরাঞ্চল সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে শিল্প-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ হয়ে উঠলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ জীবিকার সন্ধানে অন্যান্য জায়গায় চলে যায়। শুধু পড়ে থাকে তাদের পরিত্যক্ত বাড়ি। তাই মাত্র ১ ইউরোতে ওখানকার স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে বাড়িগুলো বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে—যে সুযোগ বিদেশিরাও নিতে পারে।

গোটা ইউরোপে পরিত্যক্ত বাড়ির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। গার্ডিয়ানের মতে, ইউরোপে ১১ মিলিয়ন ভুতুড়ে বাড়ি আছে (ঘোস্ট হোম), যা ইউরোপের সব গৃহহীন মানুষের প্রত্যেককে দুটি করে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব। এক ইংল্যান্ডেই এরূপ বাড়ির সংখ্যা ৬ লাখ, যা সেখানকার প্রতি গৃহহীনকে ১০টা করে বাড়ি দেওয়ার সমান।

ইংল্যান্ডে ১ শতাংশ বাড়ি পরিত্যক্ত, তাতেই এই অবস্থা আর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এই হার ১২ শতাংশ। ২০২১ সালের সেন্সাস অনুযায়ী, ১ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান বাড়ি পরিত্যক্ত, যা মোট বাড়ির ১০ শতাংশ। ২০১৯ সালের হোয়াইট হাউস রিপোর্ট অনুযায়ী, হাফ মিলিয়ন আমেরিকান হোমলেস আর পরিত্যক্ত বাড়ির সংখ্যা ১৭ মিলিয়ন। পৃথিবীর যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশ এই সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ভুগবে ভবিষ্যতে, যা এখনো কেউ উপলব্ধিতে আনছে না। আমাদের ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে জনসংখ্যার আধিক্যই সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং প্রায় সব ধরনের জাতীয় সমস্যার মূলেও এটি। অথচ অব্যবহৃত বাড়ির বিষয়ে আমাদের কোনো জরিপ নেই, গবেষণা নেই। শুধু ‘ভেস্টেড প্রোপার্টি’র হিসাব হয়তো আছে কিন্তু সরকারি ও বিভিন্ন সংস্থার পরিত্যক্ত বাড়ি/কোয়ার্টার ও সম্পত্তির হিসাব কোথাও খুঁজে পাইনি।

ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমির এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে অব্যবহৃত বাড়ি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি যে কত বড় রাষ্ট্রীয় অপচয় এবং ভবিষ্যতে এটা যে কত বড় সমস্যায় পরিণত হবে, সে বিষয়ে রাষ্ট্র, সমাজ বা বিশেষজ্ঞ কাউকেই এখন পর্যন্ত তেমনভাবে ভাবতে দেখিনি।

তবে মনে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নিয়ে ভাবেন। যেমন বাংলাদেশে ‘কেউ গৃহহীন থাকবে না’ তাঁর এই চ্যালেঞ্জ ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’ নামে অসাধারণ উদ্যোগের মাধ্যমে অনেকটাই মোকাবিলা করতে পেরেছে। কিন্তু ‘অব্যবহৃত বাড়ি’র চ্যালেঞ্জে এর কোনো প্রভাব নেই।

সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের সব সমস্যার সমাধান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকেই যেন ভাবতে হয়। অব্যবহৃত বাড়ি নিয়েও তিনি ভেবেছেন। তাঁর নিজস্ব ভাবনায় ১০টি অগ্রাধিকারভিত্তিক উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ (আগের একটি বাড়ি একটি খামার) বাংলাদেশে এযাবৎকালে গৃহীত সর্ববৃহৎ দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি, যে প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুন মাসে শেষ হয়েছে। প্রকল্পটি ৬৪ জেলার ৪৯০ উপজেলার ৪ হাজার ৫০৩টি ইউনিয়নের ৪০ হাজার ৯৫০টি গ্রামে ৮০ হাজার সমিতির মাধ্যমে ৮ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মাধ্যমে চলমান। এই প্রকল্পের মধ্যেই রয়েছে ‘পল্লী অঞ্চলে অনাবাসী ভূমিমালিকগণের ভূমি একটি বাড়ি একটি খামার সমিতির মাধ্যমে ব্যবহার ও সংরক্ষণ নীতিমালা’। অনাবাসী ভূমি মানে যে ভূমিতে মালিক বাস করে না।যত দূর খোঁজ নিয়ে জেনেছি, একজন অনাবাসী ভূমিমালিকের ভূমিও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যায়নি। তবু এ প্রকল্পটি সরকারের অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় অনেকটাই সফল বলে স্বীকৃতি পেয়েছে।

বিশাল রাষ্ট্রীয় অপচয় নিয়ন্ত্রণ ও গ্রাম অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা তৈরিতে অব্যবহৃত বাড়ি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্ব্যবহারের জন্য যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে এবং এমনতর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যত দ্রুত নেওয়া যায়, ততই মঙ্গল হবে আমাদের।

লেখক: প্রশিক্ষণ ও কর্মশালাবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    ‘মানুষের সাফল্য পরিমাপ করি বিত্ত আর ক্ষমতা দিয়ে’

    ‘বাহাদুরদের’ গ্রাসে বাহাদুর শাহ পার্ক

    বসন্তমঞ্জরী

    রাজনীতিতে শিয়াল

    পশ্চিমারা কি আরেকটি মহাযুদ্ধ ডেকে আনছে

    জনসন্তুষ্টির বিদ্যুৎ হচ্ছে গণ-অস্বস্তির কারণ!

    টোয়াবের পর্যটন মেলার টাইটেল স্পনসর ইউএস-বাংলা 

    গণমাধ্যমকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন বিধ্বস্ত ক্লপ 

    ‘চলছ খেলা চলবে, চারুকলা লড়বে’

    আড়াই ঘণ্টা পর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ চলাচল স্বাভাবিক

    সন্তানদের খোঁজে এসে ধর্ষণের শিকার নারী, গ্রেপ্তার ৫