জেলখানার চিঠিতে নাজিম হিকমত লিখেছেন, ‘বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর।’ প্রথম পাঠের সময় মনে হয়েছিল, এ কেমন কথা? প্রিয়তমার কাছেও নাকি শোকের আয়ু এক বছর। কিন্তু এখন এই দেশে এই সময়ে মনে বরং বিস্ময় জাগে এই ভেবে—শোক, তা-ও এক বছর ধরে! অবশ্য এটা একবিংশ শতাব্দী। আর ঘরে-বাইরে সবখানে হয় সরাসরি, নয়তো স্নায়ুর যুদ্ধ চলছে প্রতিনিয়ত।
যে দেশে মৃত্যু আগেই পেয়ে গেছে শুধু সংখ্যার পরিণতি, সে দেশে শোক বস্তুটা রাষ্ট্র ঘোষণা না করলে হয় না। আর রাষ্ট্রের ঘোষণার জন্য সংখ্যাটা বড় হতে হয়, কান্নাটা ভারী হতে হয়। যেমনটা ছিল মিরসরাইয়ে অর্ধশত শিশুকে পিঠে নিয়ে ডুবে যাওয়া ট্রাকের ঘটনায়, যেমনটা ছিল রানা প্লাজায়, হুড়মুড় করে ধসে পড়া ভবনটির নিচে চাপা পড়া মানুষের চোখে ও যন্ত্রণায়।
মানুষের চোখে আর কত অশ্রু থাকবে যে, তা কথায় কথায় বেরিয়ে আসবে। ফলে শোক দিবসের কালোকে আরও কালো করে দিতে যখন হঠাৎ করেই আগুন লেগে যায় চকবাজারে, যখন ঘুমের মধ্যেই মরে যায় ছয়-ছয়টি মানুষ ও তাদের স্বপ্ন, তখন আমাদের চোখে বড়জোর আগুনের ধক লাগে, জল আসে না। কারণ, সে জল তো অনেক আগেই ঝরিয়ে গেছে নিমতলী, চুড়িহাট্টা। সেখানে এর চেয়ে ঢের বেশি মৃত্যু ছিল, এর চেয়ে ঢের বেশি কাভারেজ ছিল সাধের মিডিয়ায়। ফলে এবারের কিশোর শরীফের ঘুম থেকে পুড়তে পুড়তে আরও ঘুমে তলিয়ে যাওয়া, তার অসুস্থ মা-বাবার অবলম্বনহীন হয়ে যাওয়ার গল্প থেকে যায় ব্যক্তিগত, থেকে যায় ব্র্যাকেটবন্দী। মানুষ টিভির স্ক্রলের দিকে তাকিয়ে শুধু সংখ্যাটা দেখে। ফের চলে যায় তেলের দামের ওঠানামার দিকে, তারকাবহুল সবজি বাজারের দিকে। আর যাদের এ নিয়েও ভাবনা নেই, তাদের জন্য আছে হাওয়া, আছে পরাণ, আছে স্যান্ডম্যান কিংবা এমন হাজারটা জিনিস।
না কোনো দুঃখ নেই কোথাও। নেই এতটুকু হাহাকারও। গার্ডারচাপায় মৃত্যু? এ তো সৌভাগ্য এ দেশে। সড়কে প্রতিদিন যেনতেন দুর্ঘটনায় কত প্রাণ ঝরে যায়, কত অজস্র প্রাণ! এতটাই যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সব খবর এখন আর খবর নয়। ফলে এমন মৃত্যুর দেশে গার্ডারচাপায় মৃত্যু বিশেষ কিছু ভেবে সুখে থাকুন—এমনটা কেউ বলে উঠলে রাগ বা অনুযোগ করা যাবে না কিছুতেই। আবেগকে পাশে রেখে একটু ভেবে দেখুন ভুলটা কোথায়? ১৫ আগস্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে আরও কতজনের। কিন্তু সারা দিন ফেসবুকের নিউজফিড বলুন বা অনলাইন পোর্টাল বা পরদিনের পত্রিকার হেডলাইন দেখুন, খবর তো একটিই। বাকি মৃত্যুরা তবে কোথায়? সেসব মৃত্যু, তার মরদেহগুলো সার বেঁধে ঢুকে গেছে টালিঘরে। তারা আর কোনো দিন বের হবে না। তাদের কোনো দীর্ঘশ্বাসও আর থাকবে না বাতাসে।
এই মৃত্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হবেই। নিয়ম মেনেই হয় বারবার। এর আগেও হয়েছে। এটা নতুন নয়। তাহলে বাকি সব মৃত্যুকে এটি এভাবে ঢেকে দিতে পারল কেন? কারণ, এখনো গার্ডারচাপা বিষয়টা হ্যালির ধূমকেতু হয়ে আছে বলেই মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারছে, মনোযোগ কাড়তে পারছে। অথচ এ তো নতুন নয় একদমই। এর আগে চট্টগ্রামে হয়েছে, এই বিআরটি প্রকল্পেই হয়েছে। কিন্তু কোনো হেলদোল দেখা যায়নি কারও মধ্যে, যেমন এখন নেই।
না, একেবারে নেই বলা যাবে না। এই যেমন ঝটপট একটা তদন্ত কমিটি হলো, তার প্রাথমিক প্রতিবেদন এল, তাতে দায় পুরোটাই ঠিকাদার কোম্পানিকে দেওয়া হলো—এসব তো হলো। এই যেমন, এই ফুরসতে ওয়ার্ক জোন সেফটি ম্যানুয়াল সম্পর্কে যে যা জানে, তা উগরে দিল হাতের কাছে পাওয়া মাধ্যমে। কেউ ফেসবুকে, কেউ সংবাদপত্রে, কেউ চ্যানেলের নির্ধারিত সময়ে বসে বিশেষজ্ঞ মত দিল যে, নির্মাণকাজের আশপাশের এলাকায় যে নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা ও তা নিশ্চিত করা জরুরি, তার কিছুই মানা হয়নি। এমনভাবে সবাই বলল, যেন এটা এই প্রথম ঘটতে দেখেছে। যেন এতে বিস্ময়ের কিছু আছে। এত সিরিয়াস ভঙ্গিতে তারা আলাপ করল এবং এখনো করে যাচ্ছে যে, মৃতদের প্রাণ থাকলে তারা নিশ্চয় বলে উঠত, ‘ভালো হচ্ছে, অভিনয় ভালো হচ্ছে বেশ।’ কিন্তু বড় একঘেয়ে নয় কি? সচেতন নাগরিক, ‘সুশীল’ সমাজ নামের গড়ে নেওয়া বৃত্তে ঢুকতে কসরত ইত্যাদির যে অভিনয় ও স্ক্রিপ্ট, তা বড় একঘেয়ে হয়ে গেছে।
সরকার চুপ নেই। সরকার জানাল, ঠিকাদার কোম্পানি ১৫ আগস্ট এমন কাজ করা হবে, সে সম্পর্কে কাউকে অবহিত করেনি আগে থেকে। যদিও নিয়ম অনুযায়ী তাদের তা করার কথা ছিল। এই সবকিছুর ফাঁকে কেউ কেউ শুধু ক্রেনটা নিয়ে ব্যস্ত। ভরের হিসাবটা করার মতো লোকও কি তবে নেই এ দেশে? নাকি মরার মতো মানুষ বেশি হয়ে গেছে এখানে? অথচ কদিন আগেই তো জনশুমারিতে যথেষ্ট লোক দেখানো হয়নি বলে অনেককে হাপিত্যেশ করতে দেখা গেল। এসবের ফাঁকেই পলাতক হয়ে যায় সেই ক্রেনের চালক। আহা লোকটার দোষ কী? ফিজিকস না জানা? নাকি এমন মৃত্যুতে নিজের সংযুক্তি তাঁকে পালাতে বাধ্য করেছে লজ্জায় ও ক্ষোভে?
না এসবের কোনোটিই বড় কোনো ঘটনা নয়। ১১ জনের মৃত্যু এ দেশে খুব সাধারণ। আস্ত ভবনচাপায় যেখানে মানুষ মরে কাতারে কাতারে, ভুয়া ঘোষণায় রাসায়নিক রাখায় আগুন নেভাতে গিয়ে যেখানে মরে যায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, যে দেশে প্রতিদিন সড়কেই গড়ে ১৫ জনের বেশি মানুষ মরে, সে দেশে মৃতের সংখ্যা হিসাবে পৃথক ঘটনায় ১১ খুবই সাদামাটা সংখ্যা। এতে এমনকি শিশু থাকলেও, তার সাদা-মৃত চোখ হয়তো তেমন হাহাকারজাগানিয়া নয় আর। ফলে ঘটনাস্থলে তেমন কর্তাব্যক্তির উপস্থিতি দেখা যায় না। টিভি, আর অজস্র মিডিয়ার ক্যামেরা দিয়ে খুঁজেও তাঁদের পাওয়া যায় না। তাঁরা তখন ব্যস্ত বরগুনায় ছাত্রলীগকে পুলিশের লাঠিপেটার একটা হেস্তনেস্ত করতে। হয়েছে, সেখানে একটা হেস্তনেস্ত হয়েছে বটে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সেখানকার অতিরিক্ত এসপিকে বরিশালে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আহা এমন ত্বরিত পদক্ষেপ তো আর কোথাও সহজে দেখা যায় না, যায়নি। কত এলাকায় কত এমন পিটুনি হলো, পুলিশ সত্যিকার অর্থেই বেধড়ক পেটাল কত তরুণ-যুবাকে, কত মানুষকে। কিন্তু এমন করে ব্যবস্থা তো নেওয়া হয়নি। কই মনে তো পড়ছে না।
তাঁদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষও ব্যস্ত। তারা ব্যস্ত কোনো এক প্রতিমন্ত্রীর মুখ ফসকে বলা জাহান্নাম নিয়ে, তারা ব্যস্ত আরেক মন্ত্রীর উচ্চারিত বেহেশত নিয়ে, তারা ব্যস্ত এসবকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন ট্রলের আইডিয়া জেনারেট করতে। নিজের গড়া আইডিয়া, নিজেদের করা ট্রলই তাদের ঘিরে ফেলে। এই ঘেরাটোপে পরস্পরকে ভীষণ অচেনা লাগে। চা-শ্রমিকদের দিনে ৩০০ টাকা মজুরির দাবিও তখন বড় অচেনা মনে হয়, দূরবর্তী মনে হয়। তাদের দুঃখের পাথর, তাদের কান্না, তাদের ক্ষোভ—এসব তামাশার নিচে কেবলই হারিয়ে যেতে থাকে। আর এদিকে তারকাবহুল বাজারে ঢুকে, জ্বালানি তেলের দামে উত্তরোত্তর উন্নয়ন দেখে, ডিমের ক্রমাগত এলিট খাবার হয়ে ওঠা দেখে যারা আতঙ্কে সিঁটিয়ে যেতে থাকে, ভাড়ায় বাইক চালানো সেই যুবকের মতো, যারা অভিমানে আত্মহত্যার কথা ভাবতে বসে, তাদের সামনে মৃত্যু নামের বস্তুটা আর শুধু সংখ্যা হয়ে থাকতে চায় না, সেটা কেবলই বাস্তব হয়ে উঠতে চায়। সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্ববাজার ইত্যাদি দূরবর্তী নামের হাতিঘোড়া কিছুই করতে পারে না। তাদের সামনে কর্তাদের তাবৎ কাজ তখন শুধু মশকরা হয়ে যায়, যা প্রতিনিয়ত তাদের সঙ্গে করা হচ্ছে, তাদের ও তাদের স্বজনদের মৃত্যুর সঙ্গে করা হচ্ছে।
লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে সর্বশেষ (৫৪ তম) সাক্ষীর জেরা শুরু হয়েছে। এই মামলাটির বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ।
০৬ অক্টোবর ২০২৫
‘দুই দিন আগেই বাড়ি থেকে পাথরঘাটায় চলে এসেছি। এখন পুরোনো জাল সেলাই করছি। এক সপ্তাহের বাজারও করে এনেছি। আজ বিকেলে সাগর মোহনায় যাব, গভীর রাত থেকে জাল ফেলব।’ কথাগুলো বলছিলেন বরগুনা সদরের বাইনচটকী এলাকার জেলে হোসেন আলী। গতকাল বুধবার সকালে বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে কথা হয় তাঁর...
১২ জুন ২০২৫
ভারতের স্থলবন্দর নিষেধাজ্ঞার পর সীমান্তে আটকে থাকা তৈরি পোশাক, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ট্রাকগুলো ফেরত আনছেন রপ্তানিকারকেরা। তবে যেসব ট্রাক বন্দরে ঢুকে গিয়েছিল, সেগুলো ভারতে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব ট্রাক ঢুকতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।
১৯ মে ২০২৫
আধুনিক যুগের সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলোর একটি হচ্ছে গৌতম বুদ্ধের দেহাবশেষের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক রত্নসম্ভার। গতকাল বুধবার হংকংয়ে বিখ্যাত আর্ট নিলাম কোম্পানি সাদাবি’স-এর এক নিলামে এগুলো তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
০৮ মে ২০২৫