Ajker Patrika

আওয়ামী লীগ নেতা টিপুর খুনের কারণ নিয়ে ধন্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২২, ১০: ০৯
আওয়ামী লীগ নেতা টিপুর খুনের কারণ নিয়ে ধন্দ

তিন দশকের বেশি সময় ধরে রাজনীতি করতেন জাহিদুল ইসলাম টিপু। কিন্তু গত ৬ বছর তাঁর কোনো পদ নেই। সম্প্রতি দলের পদ পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি। দৌড়ঝাঁপ করেছিলেন দলের প্রথম সারির নেতাদের কাছেও। প্রত্যাশা ছিল আসছে সম্মেলনে মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ পাবেন। কিন্তু তার আগেই নিহত হন তিনি।

নিহত জাহিদুল ইসলাম টিপুর পরিবারের দাবি, রাজনৈতিক কারণেই টিপুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, সে বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি তাঁরা। গতকাল শনিবার খিলগাঁওয়ে নিজ বাসায় নিহত জাহিদুল ইসলাম টিপুর স্ত্রী ঢাকার দক্ষিণ মহানগর সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি, টিপুর দীর্ঘদিনের সহযোগী মন্টু, পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছোট ভাই তাঁর ব্যবসায় সহযোগী বায়েজিদ, শরিফুল ইসলাম এমনই আভাস দিয়েছেন।

টিপুর স্ত্রী সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি বলেছেন, চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাণিজ্য, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কোনো কিছুই না। তাঁর স্বামী খুন হয়েছে রাজনৈতিক কোন্দল ও অধিক জনপ্রিয়তার কারণে। তাঁর জনপ্রিয়তা কেউ নিতে পারছিলেন না। তবে স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, টিপু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি রাজনৈতিক কি না, তা বলার মতো এখনো সময় আসেনি।

গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর শাহজাহানপুরে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত হন টিপু। এ সময় সামিয়া আফরিন প্রীতি নামের এক কলেজছাত্রীও নিহত হন। এ ঘটনায় টিপুর স্ত্রী শাহজাহানপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বলেন, ফেনীতে জন্ম নেওয়া টিপু ঢাকায় আসেন ১৯৭৫ সালের দিকে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগ করতেন তিনি। পরে যুবলীগ হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আওয়ামী লীগে আসার পর মতিঝিলে পুরোনো ৩৩ (নতুন ১০) ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৪ সালে তিনি বৃহত্তর মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০১৬ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন। এরপর যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কি হত্যায় নাম আসায় আওয়ামী লীগের কোনো কমিটিতে ছিলেন না। পরে মিল্কি হত্যার অভিযোগপত্র থেকে তাঁর নাম বাদ যায়।

পরিবার-ঘনিষ্ঠদের দাবি, মতিঝিলের থানা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কমিটি হয়েছে ২০১৬ সালে। সেটাও পূর্ণাঙ্গ নয়। এবারের সম্মেলনে এই কমিটির সভাপতি হতে চেয়েছিলেন টিপু। হয়তো সে কারণেই তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি বশির উদ্দিন বাবুল ও সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেন। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এ পদে আছেন। জাহিদুল ইসলাম টিপুর বিষয়ে জানতে চাইলে সভাপতি বশির উদ্দিন বাবুল বলেন, কবে সম্মেলন হবে তার ঠিক নেই। তিনি যে সভাপতি হতে চেয়েছিলেন, সেটাও তিনি জানতেন না। তবে তাঁর দাবি, তাঁর কাছে টিপু বলেছিলেন দক্ষিণ মহানগরে কোনো একটা পদে থাকতে চান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টিপুর ঘনিষ্ঠ একাধিক রাজনীতিবিদ বলছেন, এই হত্যার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। এক মতিঝিলের এজিবি কলোনির অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের দোকানের নিয়ন্ত্রণ ও ভাগ-বাঁটোয়ারা। আরেক, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের টেন্ডার নিয়ে দ্বন্দ্ব ও ঠিকাদার সমিতি নির্বাচন।

গতকাল শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, মতিঝিল এজিবি কলোনির মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া মডেল সার্কুলার রোডে সারি সারি দোকান। রাস্তার দুই পাশে সিটি করপোরেশনের জায়গায় ১৩০টি দোকান। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ২০০০ সাল থেকে এই দোকানগুলো দখলের চেষ্টা করেছে বিভিন্ন গ্রুপ। ৮ হাজার টাকা করে প্রতি মাসে ভাড়া এসব দোকান থেকে ভাড়া উঠছে প্রায় ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বছরে সেই অঙ্ক দাঁড়াচ্ছে ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। যার ভাগ দিয়েই মূল দ্বন্দ্ব।

মার্কেট ব্যবসায়ী মোতালেব বলেন, অবৈধ জায়গায় দোকান হওয়ার কারণে গত ১৬ বছরে ছয়বার দোকানগুলো ভাঙা হয়েছে। সর্বশেষ তিন বছর আগে ভাঙা হয়। তারপর আবার ২০১৯ সালে দোকান ঠিক করে ভাড়া তুলতে থাকেন জাহিদুল ইসলাম টিপু। এই মার্কেটে ৭টি দোকান নিয়ে নিহত টিপু নিজেও একটা রেস্তোঁরা করেছেন। নাম গ্র্যান্ড সুলতান রেস্তোরাঁ। তা ছাড়া এটুজেড ফার্মেসি, গার্ল জোন, জুস কর্নারসহ মোট ১৪টি দোকানের মালিক তিনি।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৩ সালে যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কি হত্যার আগে এখানকার দোকানগুলো তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর মিল্কি খুন হলে যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট, টিপু ও খালেদ ভুইয়ার যৌথ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সম্রাট ও খালেদ গ্রেপ্তার হলে একক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় টিপুর হাতে। পূর্বের নিয়ন্ত্রণকারীদের সঙ্গে এ নিয়ে টিপুর দ্বন্দ্ব।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) রাজস্ব ও সম্পত্তি বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে, এজিবি কলোনি কাঁচাবাজারে দোকান করার জন্য মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসনকেন্দ্র নামের একটি সংগঠনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ এজিবি কলোনিবাসীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সাল থেকে সব সরকারের আমলেই দফায় দফায় উচ্ছেদ করা হয়েছে অবৈধ এই কাঁচাবাজার।

স্থানীয় রাজনীতিবিদেরই আরেকটি পক্ষ বলছেন, মতিঝিল ও পল্টন এলাকার দুই ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ এবং আবুল হোসেনের সঙ্গে টিপু জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের টেন্ডারবাজি নিয়ে দ্বন্দ্বে চলছে। এসব থেকে পাওয়া অর্থের একটি কমিশন শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ফ্রিডম মানিককে দিতে হতো। কিন্তু টিপু একক রাজস্ব কায়েম করতে কাউকেই কোনো অর্থ দিতেন না। তা ছাড়া আগামী মাসে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ঠিকাদার সমিতির নির্বাচনে সভাপতি পদপ্রার্থীও ছিলেন টিপু। সে কারণে সন্ত্রাসী জাফর আহম্মেদ মানিক তাঁর সেকেন্ড ইন কমান্ড সোহেল ওরফে ‘শটগান সোহেলকে’ দিয়ে তাঁকে খুন করিয়েছেন।

তবে নিহত টিপুর স্ত্রী সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি আজকের পত্রিকাকে বলেন, তাঁর স্বামী ঠিকাদারি ব্যবসা করতেন ঠিকই। কিন্তু এ নিয়ে কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব আছে বলে তাঁর জানা নেই।

হত্যা মামলার তদন্তের ব্যাপারে জানতে চাইলে মামলার তদারকি কর্মকর্তা মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ পরিদর্শক আব্দুল আহাদ বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অন্তত ৪ জনকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের কাছে থেকে তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এখন টিভির ঘটনা সমঝোতার চেষ্টা করবেন তথ্যমন্ত্রী

ড. ইউনূস এখন কোথায় আছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী উঠবেন কোথায়?

২৬ ফেব্রুয়ারি বসতে পারে সংসদের প্রথম অধিবেশন, সভাপতিত্ব করবেন কে

ঈদের আগেই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু করবে সরকার, হবে সর্বজনীন

বৈধ সুবিধাকে অস্বীকার করে জনগণের সামনে সাধু সাজা হচ্ছে: নাহিদ ইসলাম

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত