Ajker Patrika

ভাষারা মরে যায় কেন?

জাহীদ রেজা নূর
আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৭: ০৯
ভাষারা মরে যায় কেন?

তুষারাবৃত এক দুপুরে আমাদের ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক গেওর্গি পাভলোভিচ নেমেৎস উচ্চারণ করেছিলেন দীর্ঘশ্বাসে ভরা একটি বাক্য। সেটা ছিল ১৯৮৮ সাল। সাইবেরিয়ার কোনো এক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা সম্পর্কে কথা বলছিলেন তিনি। বলছিলেন, মাত্র তিনজন ৯০ বছরের বেশি বয়স্ক মানুষ এখন সেই ভাষায় কথা বলেন। আর কেউ নেই, যাঁরা ধরে রাখতে পারবেন ভাষাটি। ভাষাটি মৌখিক, তাই লিখিতভাবে এটাকে রেখে দেওয়া যাবে, এই ভাবনা একেবারেই বাস্তবসম্মত নয়।

ভাষাপ্রেমী গেওর্গি পাভলোভিচের কথায় দীর্ঘশ্বাস ছিল। ভাষার মরে যাওয়া নিয়ে ভাবনা ছিল। কী করে ভাষা রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে ভাবতেন তিনি। পৃথিবীর সাত হাজার ভাষার মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভাষা যে ঝুঁকির মধ্যে আছে এখন, সে কথা কে না জানে!

আমাদের এই ভূখণ্ডে যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল, সেটি ছিল নিজ ভাষার প্রতি অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। নিজ ভাষার অধিকার আদায় করতে গিয়ে অন্যকে ছোট করার কোনো ভাবনা সেই আন্দোলনে ছিল না। ভাষা প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই সংস্কৃতি-ঐতিহ্যসহ জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে স্বচ্ছতা আনার একটা বড় সদিচ্ছা পরিলক্ষিত হয়েছিল পরবর্তী সময়ে। তাই, কোনো ভাষা যেন কোনো ভাষার কাঁধে চড়ে ছড়ি ঘোরাতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা দরকার ছিল। যে ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা পরিচর্যার অভাবে মরে যেতে পারে, তাদের ভাষাগুলো সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পনা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

কিন্তু যখন ভাষা নিয়ে কথা বলা হয়, তখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজের ভাষাকে অন্যের ভাষার চেয়ে বড় কিংবা শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার একটা নিষ্ঠুর ও অবিবেচক পথে হাঁটতে দেখা যায় অনেককেই। ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে পড়তে গিয়ে এই প্রশ্নটি নিয়ে একসময় নাড়াচাড়া করেছিলাম। কিছু ব্যাপার রয়েছে যেগুলো এখনো খুবই জরুরি। সে বিষয়গুলো নিয়ে কিছুটা কথা বলা হলে কোনো গবেষক কিংবা নীতিনির্ধারক আমাদের এখানে কীভাবে ভাষা বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, তা ঠিক করতে পারবেন। 

দুই. ভাষা মরে যাচ্ছে, এই বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বহু আগে থেকেই ভাবছেন। কিন্তু তাকে কেন্দ্রীয় সমস্যা বলে মেনে নেওয়া হয়নি। মরিস সোয়াদেশ নামের এক মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী ১৯৪৮ সালে বিজ্ঞানীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, প্রয়োজনীয় যত্নের অভাবে বেশ কিছু ভাষা মরে যাচ্ছে। তিনি তাঁর লেখায় প্রায় আটটি নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ভাষা সম্পর্কে কথা বলেছিলেন, যার মধ্যে ছয়টি ছিল রেড ইন্ডিয়ানদের ভাষা। অর্থাৎ আমেরিকার মূল অধিবাসীদের ভাষা। আর দুটি ছিল তাসমানিয়ন এবং কোর্ন। তার এই লেখালেখি খুব বেশি পাত্তা পায়নি ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনায়। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে গুরুত্ব ছাড়াই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা অক্ষরহীন জাতি আর তাদের সংস্কৃতি নিয়ে কিছু কিছু লেখালেখি হয়েছে।

গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে একটি প্রবণতা এদিকে ভাষাবিজ্ঞানীদের নজর পড়ে। তাঁরা দেখতে পান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ তাদের ভাষা ভুলে যাচ্ছে। নিজের অঞ্চলে উপনিবেশ বা যুদ্ধের কারণে চাপিয়ে দেওয়া বিজাতীয় ভাষায় মানুষ কথাবার্তা বলা রপ্ত করে নিচ্ছে। মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী ন্যান্সি ডোরিয়ান ১৯৭৩ সালে এদিকে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি যে বইটি লেখেন তার নাম ছিল ‘ভাষার মৃত্যু’।

১৯৯০ সালের পর থেকে ভাষার মৃত্যু নিয়ে বেশ কিছু কাজ হয়েছে ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে। আরেক মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী মাইকেল ক্রাউস ১৯৯২ সালে লিখেছিলেন, ‘আমরা কোন বিষয়টির অগ্রাধিকার দেব, সেটা যদি এখনই নির্ধারণ করতে না পারি তাহলে ভাষাতত্ত্ব হয়ে উঠবে একমাত্র একটি বিজ্ঞান, যে বিজ্ঞান এমন বিষয় নিয়ে গবেষণা করবে, যার ৯০ শতাংশ এরই মধ্যে দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেছে।’ অর্থাৎ যে বিষয়ে কথা বলা হচ্ছে, সে বিষয়টিই হারিয়ে যাচ্ছে জীবন থেকে। তিনি ভাষার মৃত্যু নিয়ে কথা বলেছিলেন। সে সময় তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে ৬০০০ জীবিত ভাষার মধ্যে ১০০ বছর পর মাত্র ৬০০ ভাষা হয়তোবা টিকে থাকবে। যদিও এখন বিজ্ঞানীরা মনে করেন একটু অগ্রাধিকার দিলে ভাষার মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব, কিন্তু সেটা কতটা বাস্তবসম্মত ভাবনা, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

জাহীদ রেজা নূরতিন. ভাষা বিষয়ে আমরা আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার কথাই আর একবার ঝালিয়ে নিই। এ দেশকে পদানত করার সময় একদম নতুন একটা ভাষা নিয়ে এসেছিল ইংরেজরা। ভারত উপমহাদেশে প্রচলিত ভাষাগুলো থেকে ইংরেজি শেখা অনেক বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল এই অঞ্চলের মানুষের অনেকের জন্য। শাসকগোষ্ঠীর ভাষা শিখে নিলে বৈশ্বিক সুযোগ-সুবিধার বিরাট সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, সে কথা বুঝেছিল মধ্যবিত্তের দল। এবং অতি দ্রুত তারা ইংরেজি ভাষা শিখে নিয়েছিল। ইংরেজরা তাদের এই ভাষাটা এই এলাকায় চালু করেছিলেন একদল কেরানি সৃষ্টি করার জন্য (তবে তার মধ্য দিয়েও জ্ঞানের আলো প্রবেশের বিষয়টি অস্বীকার করা যাবে না)। ইংরেজ চলে গেছে অনেক দিন আগে, কিন্তু সে কেরানি মনোবৃত্তি আজও রয়ে গেছে ভারতবর্ষীয় মানুষের মনস্তত্ত্বে। যা-কিছু 
পশ্চিমা, তা-ই সেরা—এ রকম একটি 
ভাবনা-ধারা বয়ে চলেছে উপনিবেশের শিকার মানুষের রক্ত ধারায়।

ভাষাবিজ্ঞানীদের আলোচনায় প্রায়ই শোনা যায়, যে ভাষায় মা-বাবা কথা বলেন, সেটা যদি পুরোনো ভাষা হয়ে থাকে এবং নতুন একটি ভাষা এসে প্রভু ভাষায় পরিণত হয়, তাহলে এই মা-বাবার সন্তানেরা মূলত নতুন ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়বেন। পুরোনো ভাষা ব্যবহার করবেন কম এবং তাদের জীবনে নতুন ভাষার জয়জয়কার সুনিশ্চিত। আর নাতিপুতিরা যখন জন্মাবে, তখন তারা একেবারেই পুরোনো ভাষা ব্যবহার করবে না, তারা শিখে নেবে বিজয়ী ভাষা, যা তার মাতৃভাষা নয়।

কেন এ রকম ঘটনা ঘটে, সে ব্যাপারে অনেকেরই ধারণা আছে। উপনিবেশ কিংবা যুদ্ধের কারণে অন্যের ভূমি জবরদখল করা জাতি এই সর্বনাশের জন্য দায়ী। আবার কখনো একদল মানুষ যখন জীবনের অবধারিত প্রয়োজনে অন্য কোনো এলাকায় যেতে বাধ্য হয় এবং সে এলাকায় মানুষ যদি কথা বলে অন্য ভাষায়, তাহলে তারা ধীরে ধীরে সেই নতুন ভাষাতেই কথা বলা শুরু করে। তাদের সন্তানেরা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দ্রুত এই নতুন ভাষাকে বরণ করে নেয়। শিল্পায়ন, নগরসভ্যতা, অন্যের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ, টেলিভিশনসহ অন্যান্য প্রচারমাধ্যমের প্রভাবে নানা কারণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যেতে থাকে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় সমাজের ওপরে ওঠার সিঁড়ি নাগাল পাওয়া যায় না বলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা অন্য ভাষায় কথা বলতে বাধ্য হয়। আমরা যখন আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের নিজস্ব ভাষা মরে যেতে দেখি এবং সেই ভাষার জায়গায় ইংরেজি, স্প্যানিশ কিংবা ফ্রেঞ্চ ভাষায় আধিক্য দেখি, তখন বুঝতে পারি সংস্কৃতির গোড়া ধরে টান দিয়েছে উপনিবেশ, ভাষাসহ ঐতিহ্যের শিকড় ধরে গুঁড়িয়ে দিয়েছে আত্মপরিচয়। ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় মানুষ কোন কোন মহাদেশের মানুষের সঙ্গে এই নির্মম আচরণ করেছে, সেটা কেউ ভুলে যায়নি।

ভিনদেশের ভাষা যদি মাথার ওপর ছড়ি ঘোরায়, চাকরি পাওয়ার মূল যোগ্যতা যদি হয়ে থাকে ভিন ভাষা, যেকোনো প্রতিষ্ঠিত জায়গায় কথা বলার সময় বিজাতীয় ভাষা যখন হয়ে ওঠে শক্তিশালী মাধ্যম, নিজ দেশের ভাষা হয় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ব্যাপার, তখন এমনিতেই সেই রাজ ভাষার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে মানুষ। এখন এই উপনিবেশ বাইরে থেকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়, মাটির দখল ছাড়াই এগিয়ে যেতে পারে এই দুষ্টগ্রহ। 

চার. আমাদের দেশের ভাষা সমস্যা নিয়ে দু-একটি কথা বলার আছে। অনেকেই মনে করে থাকেন, বাংলাদেশ এক জাতি ও ভাষাগোষ্ঠীর দেশ। সংখ্যার বিচারে এ দেশে মূলত বাঙালিরাই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু স্বীকার করে নিতে হবে, এই দেশে অনেক অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাস। সংখ্যায় অল্প হলেও তারা নিজ ভাষায় কথা বলে, নিজ সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করে। এদের ভাষা বাঁচিয়ে রাখার একটা দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্রের। যেসব জায়গায় দলবদ্ধভাবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস, সেসব জায়গায় যে স্কুলগুলো হবে, সেগুলোয় তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির আদলে গড়ে উঠতে হবে পাঠক্রম। তারা যেন নিজ ভাষায় নির্বিঘ্নে কথা বলতে পারে, নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসতে পারে, সে আবহ থাকতে হবে। নইলে এই ভাষা এবং ভাষাগোষ্ঠীগুলো বাঁচানো যাবে না।

জগতে বৈচিত্র্যের দরকার আছে। করপোরেট সংস্কৃতির তৈলাক্ত সংস্কৃতি কিংবা বিশ্বায়নের একমুখী যান্ত্রিক উন্নতি আসলে মানুষের মানবিক জায়গাটার ক্ষতি করছে। 
এই বিশাল শক্তিশালী দৈত্যের হাত থেকে মানুষের মুক্তি আসবে কী করে, সে রাস্তা এখনো তৈরি হয়নি। 

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

হাত-পাবিহীন শিশুর জন্ম: বাবা বললেন ফেলে দিতে, হাসপাতাল করল বিল মওকুফ

দূরপাল্লার বাসযাত্রায় নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ, কোন রুটে কত বাড়ল

তেলপাম্পে মিছিল নিয়ে এসে ইউএনওর ওপর হামলা, অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থীকে খুন পূর্বপরিকল্পিত, খুনি রুমমেট: পুলিশ

যুক্তরাষ্ট্রে ২ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার কে এই হিশাম আবুঘারবিয়েহ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত