Ajker Patrika

হাঁটতে না পারা সেই ছেলেই কাঁপাচ্ছেন বিশ্বকাপ

আনোয়ার সোহাগ, ঢাকা
হাঁটতে না পারা সেই ছেলেই কাঁপাচ্ছেন বিশ্বকাপ
মরক্কোর প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচেই গোল করেছেন ইসমাইল সাইবারি। ছবি: এএফপি

লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে আর আর্লিং হালান্ডের মতো তারকারা যখন বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইয়ে মত্ত, ঠিক তখনই ফুটবল বিশ্বের নজর কেড়ে নিয়েছেন মরক্কোর ২৫ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড ইসমায়েল সাইবারি। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে খুব একটা পরিচিত মুখ না হলেও বিশ্বকাপে পা রেখেই নিজের জাত চিনিয়েছেন এই তরুণ। ব্রাজিলের বিপক্ষে চোখধাঁধানো গোলের পর স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটে জাল কাঁপিয়ে টুর্নামেন্টের অন্যতম দ্রুততম গোলের রেকর্ড গড়েন তিনি। গত শুক্রবারের সেই জয়ের পর উচ্ছ্বসিত সাইবারি বলেন, ‘এটি আমার ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত।’ কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবির মরক্কো দলের শিরোপা-স্বপ্নের অন্যতম আলোকবর্তিকা এই ফরোয়ার্ড।

চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফর্ম প্রদর্শনের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলেও অনন্য এক মৌসুম পার করেছেন সাইবারি। ডাচ ক্লাব পিএসভি আইন্দহোভেনের হয়ে গত মৌসুমে ৩৭ ম্যাচে ১৯টি গোল এবং ৯টি অ্যাসিস্ট করে ডাচ লিগের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন তিনি। মাঠে ‘ফলস নাইন’ হিসেবে খেললেও উইঙ্গার কিংবা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেও তিনি সমান কার্যকরী। তাঁর এই নিখুঁত টেকনিক ও শারীরিক সক্ষমতা দেখে জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখ তাঁকে দলে ভেড়াতে ৫৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করতে রাজি হয়েছে, যেখানে বায়ার্নের কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানির কৌশলে বড় অস্ত্র হবেন তিনি।

তবে বিশ্বকাপে আলো ছড়ানোর পেছনের গল্পটা সাইবারির জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। স্পেনের তেরাসায় জন্ম নেওয়া এই ফুটবলারের শৈশব কেটেছে চরম অনিশ্চয়তায়। জন্মের পরপরই তাঁর শরীরে এক জটিল জন্মগত শারীরিক ত্রুটি ধরা পড়ে, যার কারণে চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করেছিলেন, তিনি হয়তো কোনো দিন নিজের পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারবেন না।

বিশেষ অর্থোপেডিক সাপোর্টে দুই বছর বয়সে জীবনের প্রথম হাঁটাচলা করা সাইবারি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সেই মেশিন আমাকে সাহায্য করেছিল। ভাগ্য ভালো যে সেটি কাজ করেছিল এবং আমি হাঁটতে পেরেছিলাম। ওই সময়ে ফুটবলার হওয়া তো দূরের কথা, মূল লক্ষ্য ছিল শুধু স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারা।’

পরবর্তী সময়ে উন্নত জীবনের আশায় তাঁর পরিবার বেলজিয়ামে পাড়ি জমায়। সেখানে আন্ডারলেখটের একাডেমিতে যোগ দিলেও জোটে চরম অপমান। সাইবারি স্মৃতিচারণা করেন, ‘ওরা আমাকে বলেছিল, আমি নাকি মোটা। ওটা সত্যিই খুব কষ্টদায়ক ছিল। আমি ভালো খেলছিলাম এবং ফর্মেও ছিলাম। সেখানে খেলাটা ছিল সম্মানের, কিন্তু নতুন মৌসুম শুরুর ঠিক আগের দিন আমি এই দুঃসংবাদ পাই।’ এই প্রত্যাখ্যানকে শক্তিতে রূপান্তর করে মেচেলেন ও খেঙ্ক ক্লাবের হয়ে নিজের প্রতিভা প্রমাণ করেন তিনি।

স্পেনে জন্ম এবং বেলজিয়ামের জাতীয় দলে খেলার প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও নিজের শিকড়ের টানে মরক্কোকেই বেছে নেন সাইবারি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে আমি সব সময় বলেছি, মরক্কোর হয়ে খেলতে চাই; কারণ, আমার বাবা-মা ওখানকার।’ দেশের হয়ে অনূর্ধ্ব-২৩ আফ্রিকান কাপ এবং আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি।

বিশ্বকাপে মরক্কোর লক্ষ্য নিয়ে সাইবারি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রুপপর্ব পার হওয়া এবং যতটা সম্ভব এগিয়ে যাওয়া।’ আর মরক্কোর প্রায় ৪ কোটি মানুষের সব আশা এখন ভরসা করছে শৈশবের সেই অচল পা জয় করা লড়াকু ফুটবলারের পায়ের জাদুর ওপর। সাইবারি আজ হাইতির বিপক্ষে গোল করে মরক্কোর প্রথম ফুটবলার হিসেবে গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচে গোলের কীর্তি গড়েছেন। আটলান্টায় হাইতির বিপক্ষে মরক্কো ৪-২ গোলে জিতে উঠে গেছে নকআউট পর্বে। এর আগে ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেও একটি করে গোল করেন তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত