Ajker Patrika

প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে স্বপ্নের আলপনা আঁকছেন আলপি

আনোয়ার সোহাগ, ঢাকা
আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০: ২৩
প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে স্বপ্নের আলপনা আঁকছেন আলপি
মেয়েদের ফুটবল লিগে সর্বোচ্চ ২৯ গোল করেছেন আলপি আক্তার। ছবি: বাফুফে

মাঠের এক প্রান্তে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটির কাজ ছিল শুধু গোল ঠেকানো। পাড়ার বড় ভাইদের ম্যাচে আলপি আক্তারের ভাগ্যে জুটত শুধু গোলপোস্টের সীমানা। গোল ঠেকানো মেয়েটিই এখন নারী ফুটবলে একের পর এক গোলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছেন! মেয়েদের ফুটবল লিগে রাজশাহী স্টারসকে চ্যাম্পিয়ন করার পাশাপাশি ২৯ গোল করে হয়েছেন সর্বোচ্চ গোলদাতা।

স্কুলপর্যায়ে অ্যাথলেটিকসে লং জাম্প আর হাই জাম্পে প্রথম হওয়ার পর কোচ মোফাজ্জল হোসেন বিপুলের চোখে ধরা পড়ে আলপির প্রতিভা। বিপুল আলপিকে তুলে ধরলেন এভাবে, ‘আলপি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে, তখন ও অ্যাথলেটিকসে চ্যাম্পিয়ন। ওকে বললাম, ফুটবলও খেলো। শুরুতে গোলকিপার হিসেবে খেলালেও আমি দেখলাম ওর দৌড়ানোর গতি আর মুভমেন্ট দুর্দান্ত। তখনই ওকে গোলপোস্ট থেকে তুলে স্ট্রাইকার হিসেবে গড়ে তুললাম।’

আলপির লক্ষ্যও ছিল দুর্দান্ত স্ট্রাইকার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা। গতকাল আজকের পত্রিকার সঙ্গে আলাপে আলপি বলেন, ‘সিনিয়রদের সঙ্গে খেলার সময় বলত, তুই গোলকিপারে দাঁড়া, আমরা ওপরে খেলি। সবাই দেখি গোল দেওয়ার চেষ্টা করে, তখনই মনে হলো গোলকিপার হওয়ার চেয়ে স্ট্রাইকার হওয়ার চেষ্টা করব।’

দেড় বছর আগের লিগে সিরাজ স্মৃতি সংসদের হয়ে খেলেছিলেন আলপি। ১১ গোল করেও আসতে পারেননি পাদপ্রদীপের আলোয়। এবার সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন তিনি। যদিও পথটা সহজ ছিল না। কোচ বিপুল বলেন, ‘তিন মাস ওকে অনেক বকাঝকা করেছি আর কঠোর অনুশীলন করিয়েছি। ওর মধ্যে শৃঙ্খলার অভাব ছিল, সেটা ঠিক করেছি। আমি জানতাম সে ২৯ গোল করার সামর্থ্য রাখে।’

সাফল্যের সেই মন্ত্র আলপি ভোলেননি, ‘বাড়িতে ফিরে একাডেমির হয়ে অনেক ম্যাচে গোল পাচ্ছিলাম না, খুব খারাপ দিন যাচ্ছিল। তখন একা একা মাঠে যেতাম, আগে আগে গিয়ে অনুশীলন করতাম। অনেক চেষ্টা করতাম।’

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় বেড়ে ওঠা আলপি এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী। বাবা আতাউর রহমানের চায়ের দোকানের আয়েই চলে সংসার। ফুটবল খেলতে গিয়ে দারিদ্র্য আর সমাজের টিপ্পনী—সবই ছিল আলপির নিয়মিত সঙ্গী। তবে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বড় ভাই নূর আলম। আলপি তাই কৃতজ্ঞচিত্তে বলেন, ‘আমার ভাই আমাকে অনেক সাপোর্ট করে। এ পর্যন্ত আসছি কোচের হাত ধরে, ফ্যামিলি থেকে সাপোর্ট না দিলে তো সম্ভব হতো না। কোচের মতো আমার ভাইয়ের অবদানও অনেক।’

লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে পাওয়া ৫০ হাজার টাকা প্রাইজমানি হাতে পাওয়ার পর সেটা পরিবারের হাতেই তুলে দিতে চান আলপি। তবে তাঁর স্বপ্ন এখন নীল সীমানার ওপারে। কোচ বিপুল তাঁকে ডাকেন ‘আগামী দিনের সাবিনা খাতুন’ বলে।

সাবিনা অবশ্য এখন আর জাতীয় দলের বৃত্তে নেই। তাঁকে বাইরে রেখে নতুনদের বড় অভিজ্ঞতার স্বাদ দিতে আগ্রহী কোচ পিটার বাটলার। তাই তো প্রথমবারের মতো জাতীয় দলে ডাক দিয়েছেন আলপিকে। আলপিও উন্মুখ হয়ে আছেন নিজের সেরাটা দিতে। ২০ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় যাবে বাংলাদেশ দল। এশিয়ান কাপের দলে থাকার নিশ্চয়তা পেয়ে আলপিও রোমাঞ্চিত, ‘সাবিনা আপুর মতো দেশের মানুষের মন জয় করতে চাই। জাতীয় দলে ডাক পেয়ে অনেক ভালো লাগছে। এশিয়ান কাপে যদি কোনো সুযোগ পাই মাঠে নিজের শতভাগ দেব।’

এশিয়ান কাপের সবুজ গালিচায় পা রাখার অপেক্ষায় থাকা আলপি যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন—জেদ আর পরিশ্রম থাকলে চায়ের দোকান থেকেও আকাশ ছোঁয়া সম্ভব।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত