Ajker Patrika

খালেদা জিয়ার প্রস্থান ও আমাদের প্রত্যাশা

স্বপ্না রেজা
দেশের মানুষের প্রতি খালেদা জিয়ার যে অসীম টান ছিল, তা-ই যেন জনগণ ফেরত দিল তাঁকে। ছবি: আজকের পত্রিকা
দেশের মানুষের প্রতি খালেদা জিয়ার যে অসীম টান ছিল, তা-ই যেন জনগণ ফেরত দিল তাঁকে। ছবি: আজকের পত্রিকা

৩০ ডিসেম্বর রাতে বান্দরবান থেকে ফিরছিলাম। বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখি লোকে লোকারণ্য। সবার গন্তব্য ঢাকা। কেউ বলছে, ‘মায়ের জানাজায় অংশগ্রহণ করব’, কেউ বলছে, ‘নেত্রীকে এক ঝলক দেখব, শেষ দেখা’। সবার চোখ অশ্রুসিক্ত। ৩১ ডিসেম্বর সকালে নির্ধারিত সময়ে ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব হলো না। কারণ, রাস্তাজুড়ে গাড়ি আর গাড়ি। বছর শেষের দিনটি যেন শোকে ছেয়ে গেছে। বলা বাহুল্য যে বিগত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা, অস্থিতিশীলতা ও অজানা আশঙ্কায় কেটেছে। যখন মানুষ নানাবিধ কারণে কিছুটা সংশয় আর সংকটে দিনাতিপাত করছে, বিশেষত আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচন নিয়ে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি যখন মানুষকে বিভ্রান্ত করছে, ঠিক তখনই খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিলেন। বর্তমান রাজনীতি নিয়ে যখন মানুষ বিরক্ত, ঠিক তখনই খালেদা জিয়ার চলে যাওয়ায় যে পরিস্থিতির উদ্ভব দেখা গেল ৩১ ডিসেম্বর এবং বাংলাদেশের এক নারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি সাধারণ মানুষের যে অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বিষয় দৃশ্যমান হলো, তা যেন রাজনীতির দিকেই আবার সবাইকে ফিরিয়ে নিল।

বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর সর্বোচ্চ ক্ষমতায়নের দৃশ্যমান ব্যক্তি হলেন একজন খালেদা জিয়া। এতে দ্বিমত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই, তিনি নিজেই সেই সুযোগ রাখেননি। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দুইবারের বিরোধীদলীয় নেত্রী একজন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর সারা দেশে জনগণের যে শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শন দেখা গেল, তাতে প্রতীয়মান হয় যে তিনি জনগণের হৃদয়ের গভীরে ছিলেন এবং সেটা মর্যাদাকর অবস্থায়। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক দলের প্রধান হয়ে তিনবার একটি রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া, দুইবার বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার যাত্রাটা কিন্তু সহজ নয়, বিশাল অর্জন তো বটেই। সম্ভবত সেই কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একজন দলীয় প্রধানের জানাজায় এত বিশাল জনসমাগম এই প্রথম ঘটে। অনেকের মতে, দল-মতনির্বিশেষে জনসাধারণের এত বিপুল সমাগম অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। তাঁদের অভিমত, ইতিপূর্বে এমন নজির দেখা যায়নি। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে যেমন দেখা গিয়েছিল, ঠিক তেমনি দেখা গেল তাঁর মৃত্যুর পর। জনপ্রিয়তা ও সম্মান ধরে রাখার ক্ষেত্রে একজন খালেদা জিয়া যেন ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

একজন সাধারণ নারী থেকে অসামান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়ার পথটা কিন্তু খালেদা জিয়ার জন্য কণ্টকমুক্ত ছিল না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা নিয়ে দুই পুত্রসহ হানাদার বাহিনী কর্তৃক আটক থাকা, ১৯৮১ সালে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ড, যখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৬ বছর—এত দুঃসময় মুহূর্তগুলো তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে, অদম্য সাহসের সঙ্গে পাড়ি দিয়েছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি দুই পুত্র ও বিএনপির হাল ধরেছেন, ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে যা সহজ ছিল না।

বিড়ম্বনা, প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতার পুরো ইতিহাস হয়তো আমরা অনেকেই জানি না। জানাটা দরকার ইতিহাসের অংশ হিসেবে। খালেদা জিয়া অধ্যয়নের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছেন নিজ যোগ্যতায়। বিএনপির মতো একটা বড় দলকে সদ্য গৃহবধূর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা-ও এক মস্ত ইতিহাস। বিশেষত ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল আপসহীন ও প্রশংসনীয় এবং সর্বোপরি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চর্চার ফলক উন্মোচন। স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে তাঁর একক আপসহীন নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেতনাকে জাগ্রত করে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। নির্লোভ, নির্মোহ এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে কতটা অদম্য সাহসী হয়ে উঠতে পারেন, খালেদা জিয়া তাঁর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

কেউ কেউ মনে করেন, একজন খালেদা জিয়ার বিএনপির দলীয় প্রধান হিসেবে যতটা সুখ্যাতি অর্জন, তারচেয়েও বেশি সুখ্যাতি অর্জন হয়েছে সম্ভবত তাঁর ব্যক্তিত্বের কারণে। তাঁর আচার-আচরণে পরিমিতি বোধ, কথায় শালীনতা বোধ সব সময়ই তাঁকে অনন্য স্থানে পৌঁছে দিয়েছে, তারই প্রতিফলন দেখা গেছে তাঁর মৃত্যুর পর। রাজনৈতিক নানান নির্যাতন, নিপীড়নের পরও সবকিছুতেই তাঁর পরিমার্জিত মনোভাব দেখা গেছে, যা তাঁকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল, যথেষ্ট হয়ে থাকবেও হয়তো। তাঁর কাছ থেকে শেখার আছে অন্যদের। বারবার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েও তিনি কোনো অবস্থাতেই দেশ ছেড়ে যেতে চাননি। মানসিক দৃঢ়তা থেকে সরে আসেননি। উপরন্তু বলেছেন, দেশের বাইরে তাঁর কোনো ঘর নেই। তিনি এই দেশ ও মাটি ছেড়ে কোথাও যাবেন না। তাঁর মৃত্যু এই মাটিতেই হবে, হলোও তাই। দেশের প্রতি ও দেশের মানুষের প্রতি তাঁর অসীম টান, অনুভূতির শেষ ছিল না। সেটাই যেন জনগণ তাঁর মৃত্যুর পর ফেরত দিল পরিপূর্ণভাবে তাঁকে, তাঁর প্রতিও জনগণের টান ও অনুভূতি ছিল অপরিসীম। রাজনীতিতে নেতার সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক নিখুঁত ও নিখাদ হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটে।

যাহোক, বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বের প্রতি এত বিপুল আবেগ, ভালোবাসা, সম্মান প্রদর্শন বলে দেয় জনগণের হৃদয়ের প্রকৃত চেহারা। জনগণ আসলে কী চায়? নারীবিদ্বেষী গোষ্ঠী, নারীর ক্ষমতায়ন পরিপন্থী গোষ্ঠী এখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ইতিপূর্বে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির জানাজায় এত বিশাল জনসমুদ্র হয়নি, তেমন সংবাদই প্রচার করছে মিডিয়া। তার ওপর সেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেন একজন নারী—খালেদা জিয়া। যারা নারীর ক্ষমতায়নের পরিপন্থী, নারী নেতৃত্বকে অবমাননা করে এবং নারীর মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতাকে ছোট করে দেখার চেষ্টা করে, তাদের জন্য সমুচিত একটা জবাব হতে পারে খালেদা জিয়ার প্রস্থান ও তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা। খালেদা জিয়া ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধ ও নারীবিরোধী গোষ্ঠীর কাছে এই তথ্য নতুন কোনো ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি করবে কি না, বলা মুশকিল। তবে যখন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও নারীবিদ্বেষী তৎপরতা দেখে মনটা খারাপ হয়, তখন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী একজন নারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রস্থানে লক্ষ-কোটি মানুষের আবেগ আশান্বিত করে। সাধারণ মানুষের মনমানসিকতা প্রচলিত রাজনীতি দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়।

আবার সাধারণত আমরা দেখে থাকি, রাজনৈতিক সমাবেশে মাথাপিছু লোক ভাড়া করে আনা হয়। খালেদা জিয়ার জানাজায় সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রচলন ছিল না। খুব কম সময়ের মধ্যে তাঁর জানাজায় সারা দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ভিন্ন এক রাজনীতির কথা বলে, যেটা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাম্য এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য।

একজন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ও বর্ণাঢ্য বিদায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে নিঃসন্দেহে। শিক্ষণীয় কিছু বিষয় তিনি রেখে গেছেন, যা তাঁর উত্তরসূরিসহ রাজনৈতিক দলগুলো অনুসরণ করতে পারে। রাজনৈতিক সম্মান ও জনপ্রিয়তা কীভাবে অটুট রাখতে হয় একজন রাজনীতিবিদের, তিনি যেন তারই স্বাক্ষর রেখে গেছেন তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাচেতনায় ও কর্মকাণ্ডে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় দীর্ঘ দিন কারাভোগ করেও তিনি আপসনামায় নিজের নাম লেখাননি। এমনকি পাল্টা অভিযোগও করেননি। তিনি এতটা উচ্চতায় আসীন ছিলেন যে জনগণই তা অবলীলায় বলছে এবং তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের গল্পগুলো যেন আজ আবার নতুন করে বাংলাদেশের আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবনে এর থেকে বড় প্রাপ্তির আর কী হতে পারে? মনে হচ্ছে, তিনি যেন তাঁর সম্পর্কে দুটি নেতিবাচক কথা বলার সুযোগ রেখে যাননি। সবাই তাই তাঁকে হারানোর মাতম করছে। একটা কথা না বলে পারছি না যে খালেদা জিয়ার চিরবিদায়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে যে অভূতপূর্ব পরিবেশ ও পরিস্থিতির অবতারণা হলো, তা বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতির ধারাকে বদলে দিতে যথেষ্ট সহায়ক হতে পারে। অনেকেই সেটা ভাবছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীশিক্ষা, গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ও আপসহীন নেতৃত্ব, অবস্থান বাংলাদেশের আগামী রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।

রাজনীতিতে দোষারোপের সংস্কৃতি, প্রতিহিংসাপরায়ণতা কখনোই কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি, গোষ্ঠীকে স্মরণীয় করে রাখতে পারে না। দেশের কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায়, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এক অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চর্চার প্রচলন ঘটুক। নারী নেতৃত্বের আরও বিকাশ ঘটুক। প্রতিটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুক।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিলুপ্ত ৫ ব্যাংকের আমানতকারীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, টাকা তুলতে পারায় স্বস্তি

পিটিয়ে হত্যা করা আইনজীবী নাঈম উবারে গাড়ি চালাতেন—জানালেন সহকর্মীরা

বিএনপির সঙ্গে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা জামায়াতের, তারেক রহমানকে জানালেন আমির

সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার আরও কমল

নজরুল ইসলাম খানকে চেয়ারম্যান করে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত