Ajker Patrika

আমাদের ভাষার সংগ্রাম ও বর্তমান সময়

জাহীদ রেজা নূর
আমাদের ভাষার সংগ্রাম ও বর্তমান সময়

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কয়েক দিন যেতে না যেতেই অনেকে লক্ষ করেছিলেন পেশোয়ারের নামকিন মাংসের গল্পে সয়লাব হয়ে গিয়েছিল ফেসবুক আর ইউটিউবের পেজগুলো। পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তারা ঘন ঘন বাংলাদেশ ভ্রমণ করতে শুরু করেছিলেন। পাকিস্তানিদের দেখে মনে হচ্ছিল, মেলোড্রামায় ভরপুর বাংলা সিনেমার মতো দীর্ঘকাল পর তারা যেন যমজ ভাইকে ফিরে পেয়েছে। আমাদের দেশের একশ্রেণির মানুষও বলা শুরু করেছিল, পাকিস্তানের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝির অবসান হওয়া দরকার।

কারও সঙ্গেই শত্রুতা বজায় রাখা কোনো কাজের কথা নয়। বর্তমান সময়ে গ্লোবাল ভিলেজে কার কখন কী প্রয়োজন এবং কে সেই প্রয়োজন মেটাতে পারে, তা সহজেই জানা যায়। তাই অকারণে কারও সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতার মধ্যে থাকলে কারও জন্যই তা সুফল বয়ে আনে না। কিন্তু সে সম্পর্ক গড়ে ওঠে সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে। মিথ্যাকে যদি সত্য হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার মতলব কারও থাকে, তবে তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আর তখনই কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করার প্রশ্নটি বিচার করতে হয় কষ্টিপাথরে।

পাকিস্তান-প্রেমের এই আদিখ্যেতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতে চাই না। ভাষা আন্দোলনের মাসটিতে শুধু সেই কথাগুলো বলতে চাই, যা এই আদিখ্যেতার স্বরূপ উন্মোচন করবে। আলোচনা যতটা সম্ভব, ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক করা হবে। আজ শুধু প্রারম্ভিক আলোচনা হবে। এর বিকাশ ঘটবে পরবর্তী লেখাগুলোয়।

২.

সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, ভাষা নিয়ে গোল বেধেছিল কেন ও কীভাবে, চাইলেই সেটা নিয়ে কেউ মিথ্যাচার করতে পারবে না। এ ব্যাপারে সে সময়ের পত্রপত্রিকাগুলোকেই প্রমাণ হিসেবে হাজির করা যায়। তাই এই চ্যাটজিপিটির যুগে মিথ্যা তথ্যকে জায়েজ করার চেষ্টা যদি কেউ করেও থাকে, দিনের শেষে তা প্রমাণ করার কোনো সুযোগই তাদের থাকবে না। চ্যাটজিপিটি তো তথ্য তুলে আনে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ানো সত্য আর মিথ্যার সূত্র থেকে, তাই সত্যের সঙ্গে মিথ্যাও এসে যুক্ত হয় তাতে। ভাগ্যিস, অতীতকালের সে সময়ের ইতিহাস রয়েছে লিখিত, নইলে তা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে এমন রূপ দেওয়া যেত, যেন ইতিহাসের সত্যই বদলে যায়! এই তো কিছুদিন আগেই উত্তেজনার অবিশ্বাস্য জ্বলুনিতে যেমন জাতীয় সংগীত অগ্রাহ্য করতে চাওয়া হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধকে অপমানিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তেমনি ভাষা আন্দোলনকেও বাঙালিদের অসভ্যতার ফলে সৃষ্ট ঘটনা বলে জাহির করতে পারত এ কালের কুমতলবি ‘মহা বিজ্ঞজনেরা’।

ভাগ্য ভালো, সেটা ঘটেনি। তাই এখনো ভাষা ও ইতিহাসের ওপর আঘাত আসতে পারে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে বাঁচাতে পারে নির্মোহ সত্য ঘটনাগুলো। আর কিছু নয়। কেউ চাইলেই বলতে পারবে না, পাকিস্তানি শাসকেরা বাংলার প্রতি খুব ভালোবাসা দেখিয়েছিল, বাঙালিরাই শুধু তাদের সদিচ্ছা বুঝতে পারেনি, তাই ঘটেছে এসব ‘গন্ডগোল’।

নতুন যে প্রজন্ম উঠে আসছে, তারা ইতিহাস জানবে কোথা থেকে—এই প্রশ্ন এড়ানো যাবে না। আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম পেতে যাচ্ছি, যারা ১৯৫২ কিংবা ১৯৭১ সালকে মনে করে বহু দূরের কোনো ইতিহাস? সে ইতিহাসকে ঝেড়ে ফেলেই কি তারা এগিয়ে যেতে চায়? তারা কি মনে করে, সেই ইতিহাসের গভীরে কী আছে, তা জানার কোনো প্রয়োজন নেই?

৩.

কারা অতীতকে ভুলতে বলে? যারা অতীত নিয়ে গর্ব করতে পারে, তারা কি তাদের অতীত ভুলতে বলবে? নাকি যাদের অতীত গলদে ভর্তি, তারা অতীত ভুলতে বলবে? এ প্রশ্নের একটাই জবাব হয়। যাদের অতীত কলঙ্কিত, তারা অতীত-সম্পর্কিত প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চায়। আমাদের রাজনীতিতে সে রকম দল রয়েছে বিস্তর, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার শুধু পদলেহনই করেনি, সঙ্গে মুক্তিকামী বাঙালিদের শত্রু আখ্যা দিয়ে হত্যা করেছে এবং করিয়েছে। এখনো যখন একাত্তরে তাদের ভূমিকা নিয়ে কথা ওঠে, তারা পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। নির্দিষ্টভাবে মুক্তিযুদ্ধে তারা কী তাণ্ডব চালিয়েছে, তা লুকিয়ে রাখতে চায়।

এই সত্য মাথায় রেখেই ভাষা আন্দোলনকে দেখতে হবে। প্রথমেই বলে রাখতে হবে, রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গটি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হওয়ার পরে হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠেনি। বরং বহু আগে থেকেই হিন্দি-উর্দু নিয়ে যে বিতর্ক চলছিল, তারই একটা রেখা হয়ে রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গটি উঠে আসে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে। সেখান থেকেই আলাপটা শুরু করলে আপাতত পাকিস্তানিদের বৈরিতার মুখোশ উন্মোচন করা সহজ হবে।

৪.

দেশভাগ হলো ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। গঠিত হলো পাকিস্তান নামক দেশটি। ১৫ আগস্ট জন্ম নিল ভারত। একই দেশ ভেঙে দুটি দেশ হওয়ার বহু আগে থেকেই মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায় রাজনৈতিকভাবে আলাদা হয়ে গিয়ে পরস্পরকে বৈরী ভাবছিল। ধর্মীয় পরিচয়ই যে কেবলমাত্র পারস্পরিক মিলনক্ষেত্র হতে পারে না, বরং তাতেও লাগে অভিজাত-অনভিজাতের ছোঁয়া, সেটা পাকিস্তান আমলের ২৩টি বছর ভালো করেই বাঙালিকে বুঝিয়েছে।

১৯৪৭ সালের ১৭ মে হায়দরাবাদে উর্দু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান ঘোষণা করেন যে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হবে উর্দু। জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিয়াউদ্দিন আহমদকে দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু ভাষার প্রস্তাব করতে। তাহলে বুঝতে হবে, দেশের ক্ষমতা হাতে পাওয়ার আগে থেকেই উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা চলছিল। বাংলাভাষী শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখকেরা তাতে অবাক হন। ২৯ জুলাই আজাদ পত্রিকায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যে প্রবন্ধটি লেখেন, তাতে তিনি বলেন, ‘বাংলাই হওয়া উচিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। তবে যদি দুটি রাষ্ট্রভাষার কথা আসে তবে উর্দুকেও বিবেচনা করা যায়।’ এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকায় গঠিত হয় তমদ্দুন মজলিস। ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ শিরোনামে যে পুস্তিকা প্রকাশ করে, তাতে লেখেন কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ এবং অধ্যাপক আবুল কাশেম। তাঁরা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানান। ১৯৪৭ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবিতে প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। এই স্মারকলিপিতে যাঁরা স্বাক্ষর করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ আকরম খাঁ, আবদুল্লাহিল বাকী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, শামসুন্নাহার মাহমুদের মতো গণপরিষদ বা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, পুলিশের আইজি জাকির হোসেন ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক ও আইনজীবীরা।

বাংলার বুদ্ধিজীবীদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। হঠকারী এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ৬ ডিসেম্বর বেলা ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবাদ সভা। অধ্যাপক আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন মুনীর চৌধুরী, এ কে এম আহসান, কল্যাণ দাসগুপ্ত প্রমুখ। সভা শেষে এক বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।

৫.

গণপরিষদের অধিবেশন শুরু হয় করাচিতে ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সেখানে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ আরও কয়েকজন পরিষদ সদস্য পরিষদে ইংরেজি ও উর্দুর সঙ্গে বাংলায়ও বক্তব্য দেওয়ার দাবি তোলেন, কিন্তু তা পাস হয়নি।

লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, কংগ্রেস দলের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বাংলার মুসলিম লীগ সদস্যরাও দাঁড়িয়েছিলেন। মুসলিম লীগ যে অতি দ্রুত বাংলায় জনপ্রিয়তা হারাল, তার বীজ সেদিনই উপ্ত হয়েছিল বলা হলে খুব একটা ভুল হবে না।

এরপর ১১ মার্চের ধর্মঘট, দমনপীড়ন কিংবা ২১ ও ২৪ মার্চে যথাক্রমে ঢাকার রেসকোর্স ময়দান ও কার্জন হলে পাকিস্তানের কায়েদে আজম জিন্নাহ উর্দুর সপক্ষে নিজের মত দিলে পাকিস্তান সম্পর্কে বাঙালির মোহভঙ্গ হতে থাকে। সে বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন। সে আলোচনা হবে পরের লেখায়। জিন্নাহর ঢাকা সফর নিয়ে বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। কিংবা তারও আগে ১১ মার্চের মতো ঐতিহাসিক দিনটিতে কী ঘটেছিল, যা ভাষা আন্দোলনকে দিয়েছিল সঞ্জিবনী সুধা, সে কথাও বলতে হবে।

৬.

শেষ করি আরও আগের অতীত থেকে কিছু সাহিত্যিক তথ্য দিয়ে। ভাষা নিয়ে ভাবনার জন্ম যে আরও অনেক আগে, সে প্রসঙ্গটির উল্লেখ করছি নতুন প্রজন্মের মানুষদের জন্য। বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকেরা কীভাবে এই সমস্যাটি দেখেছেন, ইতিহাস থেকে সে অংশটিও আনা দরকার।

ক. আমাদের পূর্ব পুরুষগণ আরব, পারস্য, আফগানিস্তান অথবা তাতারের অধিবাসীই হোউন আর এতদ্দেশবাসী হিন্দুই হউন, আমরা এক্ষণে বাঙ্গালী, আমাদের মাতৃভাষা বাঙ্গালা। তাহারা (বাংলা ভাষার শত্রুরা) বাঙ্গালার বাঁশ বন ও আম্রকাননের মধ্যস্থিত পর্নকূটিরে নিদ্রা যাইয়াও এখনো বোগদাদ, বোখারা, কাবুল, কান্দাহারের স্বপ্ন দেখিয়া থাকেন। কেহ কেহ আবার বাঙ্গালার পরিবর্তে উর্দুকে মাতৃভাষা করিবার মোহে বিভোর। দুর্বল ব্যক্তিরা যেমন অলৌকিক স্বপ্নদর্শন করে, অধঃপতিত জাতিও তেমনি অস্বাভাবিক খেয়াল আটিয়া থাকে। (হামেদ আলী, বাসনা,২: ১,১৩১৬)

খ. বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা বাঙ্গালা। ইহা দিনের আলোর মতো সত্য। ভারতব্যাপী জাতীয়তা সৃষ্টির অনুরোধে বঙ্গদেশে উর্দু চালাইবার প্রয়োজন যতোই অভিপ্রেত হউক না কেন, সে চেষ্টা আকাশে ঘর বাঁধিবার ন্যায় নিষ্ফল। (মো. ইয়াকুব আলী চৌধুরী, কোহিনুর, মাঘ, ১৩২২)

গ. উর্দু-ভাষীরা যে বাংলাদেশের মুসলমানদিগের মধ্যে বাংলার পরিবর্তে উর্দু ভাষা চালাইবার চেষ্টা করেন, এইটা তাহাদের বড় অন্যায়;—অনধিকারচর্চাও বটে। এইরূপ অন্যায়ের চেষ্টা যাহারা করিয়া থাকেন, তাহাদের সঙ্গে আবার একদল ফেউ আছেন, এই “ফেউ’’রা প্রায়ই খাঁটি বাঙালি। ইহারা কলিকাতায় পশ্চিমা নারীর পাণি গ্রহণ করিয়া স্ত্রীর খাতিরে মাকে ছাড়িয়া শাশুড়িকে মা বলিয়া ডাকেন। আর একদল আছেন, যাহারা বক্রাক্ষর দেখিলেই আত্মহারা হইয়া যায়। (মোজাফফর আহমেদ, আল এসলাম, ৩: ৪, ১৯২৪)

ঘ. কেহ কেহ উর্দুর স্বপ্নে বিভোর হইলেও বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা যে বাঙ্গালা, এ বিষয়ে কোনো মতদ্বৈধ থাকা উচিৎ নহে।...আমার স্বজাতির ভাইয়েরা কেবল এই কথাই মনে রাখিবেন যে বর্তমান বাঙ্গালা ভাষা সংস্কৃত মূলকই হউক আর যাহাই হউক, উহা আমাদেরই মাতৃভাষা। (সৈয়দ এমদাদ আলী, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, ১; ২, ১৩২৫)

ওপরের উদ্ধৃতিগুলো স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে, তাঁরা বাংলা ভাষা সম্পর্কে কিছু মিথ্যাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে বর্জন করেছিলেন।

(প্রথম অংশ সমাপ্ত)

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত