Ajker Patrika

সরিষা ও মধু: গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন স্বপ্ন

শাইখ সিরাজ
সরিষা ও মধু: গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন স্বপ্ন

শীত মৌসুমে চলনবিল মানেই এক বিস্ময়কর রূপকথা। দিগন্তজোড়া মাঠে ছড়িয়ে থাকা হলুদ সরিষা ফুল যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক বিশাল ক্যানভাস। হালকা শীতল বাতাসে ফুলের দোল, মৌমাছির গুঞ্জন আর সোনালি রোদের ঝিলিকে চলনবিল হয়ে ওঠে এক অনন্য সুন্দর প্রকৃতির। শুধু সৌন্দর্যের আবেশ নয়, এই হলুদ মাঠের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কৃষকের ভাগ্যবদলের গল্প, শ্রমের ইতিহাস আর গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা।

একসময় চলনবিলের কৃষিজীবন ছিল প্রায় একরৈখিক। বর্ষায় মাছ, শুষ্ক মৌসুমে একবার ধান। এই ছিল জীবনের সীমা। প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলো বছরের বড় একটি সময় কাটাত অভাব-অনটনে। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলে দিয়েছে ফসলের বৈচিত্র্য। পানি নেমে যাওয়ার পর ধান রোপণের আগের এই ছোট সময়টুকু যে এত বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে, তা ১০-১৫ বছর আগেও কেউ কল্পনা করেনি। আজ চলনবিলের মানুষের কাছে সরিষা হয়ে উঠেছে সচ্ছলতার সোপান।

চাটমোহর, তাড়াশ, গুরুদাসপুর, সিংড়া অঞ্চলের চলনবিলজুড়ে এ বছরও সরিষার হলুদ আভা চোখে পড়ার মতো। কৃষকেরা বারি-১৪, বারি-১৫, বারি-১৮ ও বিনা-৯সহ বিভিন্ন উন্নত জাতগুলো বেছে নিয়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায়, পোকামাকড় ও রোগবালাই কম হওয়ায় অধিকাংশ কৃষকই আশাবাদী ভালো ফলনের ব্যাপারে। গত বছরের ভালো ফলন ও বাজারমূল্য এ বছর আবাদ বাড়ানোর বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

পাকপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিমের কথাই ধরা যাক। চার বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করতে তাঁর খরচ হয়েছে মাত্র ৯ হাজার টাকা। ফলন ভালো হলে প্রায় ৫০ হাজার টাকার সরিষা বিক্রির আশা করছেন তিনি। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, সংসারের খরচ, ভবিষ্যতের একটু নিশ্চয়তা—সবকিছুর পেছনেই আছে এই সরিষার অবদান।

তবে চলনবিলের সরিষার গল্প এখানেই শেষ নয়। সরিষার সঙ্গে হাত ধরাধরি করে এসেছে আরেকটি সম্ভাবনাময় খাত—মধু। সরিষা ফুলের মিষ্টি সুবাসে আকৃষ্ট হয়ে মৌমাছিরা ছুটে আসে মাঠে মাঠে। আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মৌচাষিরা। চলনবিলজুড়ে এখন শত শত নয়, হাজার হাজার মৌবাক্স বসানো হয়েছে সরিষাখেতে। মৌমাছিরা একদিকে যেমন মধু দিচ্ছে, অন্যদিকে পরাগায়নের মাধ্যমে সরিষার ফলনও বাড়াচ্ছে। এটি এক অনন্য সহাবস্থানের উদাহরণ, যেখানে কৃষক ও মৌচাষি দুই পক্ষই লাভবান।

চ্যানেল আইয়ের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি ফেরদৌস রবিন জানিয়েছেন, এ মৌসুমে চলনবিল অঞ্চলে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় এক হাজার মৌচাষি এসেছেন। মৌবাক্সের সংখ্যা দেড় থেকে দুই লাখের কাছাকাছি। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর প্রায় তিন হাজার টন মধু উৎপাদিত হবে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৭০ কোটি টাকা। তাড়াশ উপজেলার মাকড়শোন গ্রামের কৃষক জালাল উদ্দিন এ বছর ৩৫ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করেছেন। যদিও বর্ষার পানি দেরিতে নামায় তাঁর আবাদ গত বছরের তুলনায় কমেছে। তবু বাজারদরের প্রতি তাঁর আস্থা আছে। একই গ্রামের কৃষক আজিজুর রহমান একসময় নিজের ৬০ বিঘা জমি থেকেও তেমন লাভ করতে পারতেন না। আজ তিনি সরিষা আবাদ করে গত ১০ বছরে বাড়তি আয় করেছেন। তাঁর কথায়, ‘মৌচাষ হওয়ার পর সরিষার ফলন আরও বেড়েছে। এখন সরিষাই আমাদের ভরসা।’

মধুচাষের ক্ষেত্রেও আছে অনুপ্রেরণামূলক গল্প। শহিদুল ইসলাম প্রায় ২০০টি মৌবাক্স বসিয়েছেন সরিষাখেতে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে তৈরি কাঠের বাক্সেই তিনি মধু সংগ্রহ করছেন। এ বছর তিনি অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশেষ ধরনের আধুনিক মৌবাক্স ব্যবহার করে আরও বেশি মুনাফা পাচ্ছেন। তবে তাঁর আক্ষেপ এক জায়গায়, দেশে এখনো আধুনিক মধু পরিশোধনব্যবস্থার অভাব। ফলে সম্ভাবনাময় এই শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে ঠিকভাবে জায়গা করে নিতে পারছে না।

আরেক তরুণ মৌচাষি শম্ভু কুমার মাত্র কয়েক বছরেই মধুচাষকে পেশা হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর কাছে আছে ১৫৪টি মৌবাক্স। মাসে গড়ে ৪০ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। শম্ভুর মতে, মাত্র তিন মাসের প্রশিক্ষণেই একজন তরুণ এই খাতে নিশ্চিত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। গ্রামীণ যুবকদের জন্য এটি হতে পারে একটি কার্যকর বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, আমদানিনির্ভর ভোজ্যতেলের বিকল্প হিসেবে ঔষধি গুণসমৃদ্ধ সরিষার তেলের চাহিদা বাড়ছে। এতে কৃষকের আগ্রহও বাড়ছে সরিষা আবাদে। পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে মৌচাষের মাধ্যমে মধু উৎপাদন বাড়ছে, যা কৃষক ও মৌচাষি উভয়ের জন্যই লাভজনক। কৃষি বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

তবে এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে আরও কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, মধু সংরক্ষণ ও পরিশোধনের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে দেশীয় মধু আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, সরিষার তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। আজও অনেক কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন শুধু বাজারব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে। সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ কিংবা কৃষক উদ্যোক্তা গড়ে উঠলে এই সমস্যা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। চলনবিল মূলত একটি জলাভূমি অঞ্চল। বর্ষার পানির ওঠানামা, খাল-বিলের স্বাভাবিক প্রবাহ—সবকিছুই কৃষির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো খরার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় পানি ব্যবস্থাপনা, খাল খনন ও সংরক্ষণে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, তরুণদের আগ্রহ। মধু চাষে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার তথ্য জানা, অনলাইনে বাজারদর খোঁজা, ইউটিউব দেখে আধুনিক চাষপদ্ধতি শেখা এখন গ্রামীণ বাস্তবতার অংশ। এই তরুণ শক্তিকে সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে চলনবিলের কৃষি আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

চলনবিলের মাঠে দিগন্তজোড়া হলুদ ফুল সম্ভাবনার এক বিস্তৃত আকাশ। সরিষার হলুদে মিশে আছে কৃষকের হাসি, মৌমাছির ডানায় ভর করে উড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন স্বপ্ন। পরিকল্পিত উদ্যোগ, সঠিক বাজারব্যবস্থা আর প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে চলনবিল শুধু বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি উন্নয়নের এক অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: গ্রেডিং করে ধাপে ধাপে হবে এমপিওভুক্তি

ভারতীয় পার্লামেন্টের দুই কক্ষেই খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকপ্রস্তাব

আজকের রাশিফল: প্রাক্তনের বিয়েতে গিফট বা ‘মিস ইউ’ মেসেজ পাঠাবেন না, দরজায় বিপদ

দেয়ালের ভাষা নিউজফিডে, পোস্টার থেকে পেজে

বেশি দামে কিনে কমে বিক্রি করে, দেউলিয়া হতে বসেছে পিডিবি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত