Ajker Patrika

বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও জনশক্তিতে বাংলাদেশ-এস্তোনিয়া সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও জনশক্তিতে বাংলাদেশ-এস্তোনিয়া সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ
অনুষ্ঠিত দুই দেশের দ্বিতীয় ফরেন অফিস কনসালটেশনস বৈঠকে বাংলাদেশ ও এস্তোনিয়ার প্রতিনিধিদল। ছবি: এক্স

বাণিজ্য, বিনিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ-এস্তোনিয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এস্তোনিয়ার রাজধানী তাল্লিনে অনুষ্ঠিত দুই দেশের দ্বিতীয় ফরেন অফিস কনসালটেশনসে (এফওসি) পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও আইসিটি সহযোগিতা জোরদার, দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা, পর্যটন ও সংস্কৃতিতে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শেয়ার করা পোস্টে গতকাল স্থানীয় সময় সোমবার এস্তোনিয়ার রাজধানী তাল্লিনে দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ফরেন অফিস কনসালটেশনসে (এফওসি) এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন রাষ্ট্রদূত ড. এম. নজরুল ইসলাম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপক্ষীয় (পূর্ব ও পশ্চিম) অনুবিভাগের সচিব। অন্যদিকে এস্তোনিয়ার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক প্রধান মতি মুর্দ।

বৈঠকে উভয় পক্ষই পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার বিপুল অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনা রয়েছে বলে চিহ্নিত করে এবং বাংলাদেশ ও এস্তোনিয়ার মধ্যকার সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানো ও আরও বিস্তৃত করার ওপর উচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। দুই দেশ রাজনৈতিক সমন্বয় ও সংহতি আরও গভীর করার ওপর জোর দেয় এবং দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পারস্পরিক সফর আয়োজনের প্রস্তাব দেয়। নিয়মিত সংসদীয় যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ-এস্তোনিয়া পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ গঠনের সম্ভাবনাও তারা আলোচনায় তোলে।

বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা

দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনায় উভয় পক্ষই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও বেশি যোগাযোগ এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের পারস্পরিক সফর উৎসাহিত করার বিষয়ে একমত হয়। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল এস্তোনিয়ার প্রতিনিধিদের বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন খাতে বৈশ্বিক নেতৃত্বের বিষয়টি তুলে ধরে। এসব খাতের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক (আরএমজি), পাট ও পাটজাত পণ্য এবং ওষুধশিল্প।

বাংলাদেশ এস্তোনিয়ার বিনিয়োগকারীদের দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদ্যমান বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা পরিদর্শন ও যাচাই করে দেখার আমন্ত্রণ জানায়। পাশাপাশি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউসি) গঠন, দুই দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর এবং এস্তোনিয়ার বেসরকারি খাতের একটি অনুসন্ধানী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তাব দেয় ঢাকা।

দক্ষ জনশক্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ

দুই দেশ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করেছে বৈঠকে। বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান দক্ষ জনশক্তির কথা তুলে ধরে। এর মধ্যে আইটি পেশাজীবী, প্রকৌশলী, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার এবং স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা রয়েছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ থেকে এস্তোনিয়ায় দক্ষ জনশক্তির অভিবাসন আরও বাড়ানোর বিষয়ে উভয় পক্ষ আলোচনা করেছে। বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), কেয়ারগিভিং, নির্মাণ, আতিথেয়তা ও পর্যটন, কৃষি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে এস্তোনিয়া আশাবাদ ব্যক্ত করে।

আইসিটি, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা

বাংলাদেশ ও এস্তোনিয়া আইসিটি সহযোগিতা, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থার পারস্পরিক সমন্বয় বা ইন্টারঅপারেবিলিটি, ই-আইডি সিস্টেম, নিরাপদ তথ্য আদান-প্রদান, উদ্ভাবন এবং ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এস্তোনিয়া বাংলাদেশে ই-গভর্ন্যান্স খাতে সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানায়। দেশটি আরও জানায়, ডিজিটাল খাতে তাদের অনেক কোম্পানি ও বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশের অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতায় অত্যন্ত আগ্রহী।

উদীয়মান বিভিন্ন খাতে ব্যবসায়িক সুযোগ অনুসন্ধানের জন্য এস্তোনিয়ার কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়। পাশাপাশি ব্যবসা-টু-ব্যবসা (বিটুবি) যোগাযোগ বাড়ানো এবং উভয় দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শিক্ষা, ক্রীড়া ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ

দুই দেশ জনগণের মধ্যে আরও বেশি যোগাযোগ ও সেতুবন্ধন তৈরির বিষয়েও আলোচনা করে। এর মধ্যে শিক্ষা ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে সহযোগিতা, শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, গবেষণা সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থী, তরুণ, পর্যটক ও সাংস্কৃতিক দলের পারস্পরিক বিনিময়ের বিষয়গুলো ছিল। এ ছাড়া বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক সহযোগিতা, পর্যটন প্রসার, দ্বৈত কর পরিহার, বিনিয়োগের উন্নয়ন ও সুরক্ষা এবং শিল্প খাতে সহযোগিতাসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে আরও কিছু দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা সমঝোতা দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার বিষয়ে উভয় পক্ষ আলোচনা ও ঐকমত্যে পৌঁছায়।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সহযোগিতা

এস্তোনিয়া বাংলাদেশের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১ তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানায়। এস্তোনিয়া তাঁর সভাপতিত্বের সময় পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে এবং আশা প্রকাশ করে যে—তাঁর সভাপতিত্বকালে জাতিসংঘ সনদ সমুন্নত থাকবে।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতা বৈঠকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলোতে বাংলাদেশের অসাধারণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সবসময় আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সমতা এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্মানের নীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে সমন্বয় আরও গভীর করার বিষয়ে বাংলাদেশ ও এস্তোনিয়া একমত হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে, বিশেষ করে জাতিসংঘে, ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখা, পরস্পরের প্রার্থিতাকে বিভিন্ন নির্বাচনে সমর্থন করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়েও দুই দেশ সম্মতি জানায়।

এস্তোনিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেয়। বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও মতবিনিময় হয়। উভয় পক্ষই নিজেদের কৌশলগত অবস্থানকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগ বা সংযোগ বাড়ানোর একটি অনন্য সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত বিষয়েও আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেয় এস্তোনিয়া।

ন্যাটো ও ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ন্যাটো ও ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কবিষয়ক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত আন্ডার সেক্রেটারি কারিন মান্দির সঙ্গেও মধ্যাহ্নভোজের সময় বৈঠক করে। এ সময় দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।

তৃতীয় দফা এফওসি ঢাকায়

দুই দেশের প্রতিনিধিদল মনে করে, দ্বিতীয় দফার এই আনুষ্ঠানিক পরামর্শ বা ফরেন অফিস কনসালটেশনস ভবিষ্যতে দুই বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্পর্ক আরও জোরদার করবে এবং নতুন নতুন সম্পৃক্ততার পথ তৈরি করবে। উভয় পক্ষ পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়সূচি অনুযায়ী তৃতীয় দফার ফরেন অফিস কনসালটেশনস ঢাকায় অনুষ্ঠিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত