Ajker Patrika

সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ারেও রাজি পুলিশ: আইজিপি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৪: ০৬
সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ারেও রাজি পুলিশ: আইজিপি
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। ছবি: সংগৃহীত

ক্রসফায়ারের প্রয়োজন হলে এবং সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ সেটাই করবে বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।

আইজিপি বলেছেন, ‘কে আসবে, কবে আসবে, কী হবে, ওইটা আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দেখার বিষয় না। আমাদের দায়িত্ব আইন সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেটাই আমরা করব। যেখানে ক্রসফায়ারের যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি এলাউ (অনুমতি) করে আমরা (পুলিশ) সেটাই করব।’

আজ সোমবার বেলা ১২টার দিকে চকবাজারে ‘কমিউনিটি ব্যাংক’-এর ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা চালুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইজিপি এসব কথা বলেন।

আইজিপি বলেন, ‘আমরা পুলিশকে যদি লাঠিপেটা করি, বলবেন আমরা ফ্যাসিস্ট পুলিশ। আর আমরা যদি নীরবে থাকি, তাহলে বলবেন দুর্বল পুলিশ। তাহলে আমাকে তো কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে, এমপাওয়ার করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যত বাহিনী বলি-না কেন, আপনারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে হলে এই পুলিশ, পুলিশের কোনো বিকল্প নাই। সেনাবাহিনী দেশ রক্ষা করবে, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে। আর ইন্টারনাল শৃঙ্খলা শান্তি সমৃদ্ধি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সবকিছু আপনার-আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব।’

আইন-শৃঙ্খলায় পুলিশ কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করেনি দাবি করে আইজিপি বলেন, ‘আমরা কোনো আনওয়ান্টেড ফোর্স অ্যাপ্লাই করি নাই। আপনারা দেখেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের যে পুলিশের অবস্থা ছিল, পুলিশ রাস্তায় ডিউটি করার জন্য ভয় পেত, তারা যেতে সাহস পেত না, সেই অবস্থা থেকে আমরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার পথে। আপনাদের (জনগণের) প্রকৃত স্বস্তি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেওয়ার জন্য, আপনার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই জায়গায় আপনারা সহযোগিতা করুন।’

ব্যাংকিং খাতে গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তদারকি ও জবাবদিহি, পুলিশের দায়িত্ব পালন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন আইজিপি। তিনি আরও বলেন, ‘আইন ও সংবিধান অনুযায়ী পুলিশকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।’

আইজিপি বলেন, ‘আপনারা পুলিশকেও ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করবেন না, নিজেরাও ব্ল্যাকমেলড হবেন না।’

গুজব ও মিথ্যা তথ্যে বিভ্রান্ত না হয়ে প্রকৃত ঘটনা চিহ্নিত করে প্রতিকারে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

পুলিশের ভেতরে অপরাধে জড়িত সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে আইজিপি বলেন, গত দুই মাসে প্রায় ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে অতীতে রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি।

আইজিপি বলেন, সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দিতে হবে। পুলিশকে অকার্যকর করে রেখে সব দায়িত্ব তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন—এটা স্বীকার করে নিয়ে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী আমাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন।’

তবে পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য পুলিশকে জবাবদিহি করতে হবে। আবার মিথ্যা অভিযোগ ও গুজবের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মূল্যায়ন করাও ঠিক নয়।

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদের ইলেকট্রনিক অর্থের বিপরীতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সংরক্ষিত আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আইজিপি। তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার কোটি টাকার ইলেকট্রনিক মানি থাকলে তার বিপরীতে সমপরিমাণ নগদ অর্থ জমা থাকার কথা। কিন্তু নগদের ক্ষেত্রে ৬৭৫ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

আইজিপি বলেন, কোনো কারণে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন গ্রাহকেরা। তাই আর্থিক খাতের তদারকি ও নজরদারির দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে গ্রাহকদের অর্থ নেওয়া হলে এবং পরে ব্যাংক সংকটে পড়লে তার দায় গ্রাহকদের ওপর বর্তায়। নিজেরও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিজ্ঞতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নামে উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল অর্থ সংগ্রহের পর ব্যাংকটি সংকটে পড়েছে।

ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও যথাযথ তদারকির ওপর গুরুত্ব দেন আইজিপি। তিনি বলেন, শুধু নিয়মকানুন তৈরি করলেই হবে না; সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক ও গ্রাহক—উভয় পক্ষেরই নৈতিকতার জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করা জরুরি।

আইজিপি আরও বলেন, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মূলনীতি বুঝতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকি ভাগাভাগি, বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং গ্রাহকের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

আইজিপি বলেন, দেশে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও ঋণখেলাপির কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটে পড়েছে। এর প্রভাব ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসংস্থানেও পড়ছে। তাই বিনিয়োগের আগে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সবার সহযোগিতা চান আইজিপি। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পকারখানা ও শ্রমিকদের বিভিন্ন সংকটের সময় পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।

আইজিপি বলেন, পুলিশকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যেমন আইন ও সংবিধান মেনে চলতে হবে, তেমনি নাগরিকদেরও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। স্বাধীনতার অর্থ যা ইচ্ছা তা করার অধিকার নয়; সমাজে বসবাস করতে হলে আইন ও নৈতিকতা মেনে চলতে হবে।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো না থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গঠনে পুলিশসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে আইজিপি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনুমান করা নয়; বরং আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করা। পুলিশের কাজের মূল্যায়ন করতে হলে প্রকৃত ঘটনা বিবেচনায় নিতে হবে এবং বাহিনীর সদস্যদের অপরাধের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত